Ajker Patrika

কাঁচা চামড়া নিয়ে পুরোনো শঙ্কা

শাহ আলম খান, ঢাকা 
আপডেট : ২৬ মে ২০২৬, ০২: ৫৫
কাঁচা চামড়া নিয়ে পুরোনো শঙ্কা
গ্রাফিক্স: আজকের পত্রিকা

কোরবানির পশুর চামড়া দেশের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সম্পদ। এই চামড়াকে ঘিরেই টিকে আছে ট্যানারিশিল্পের বড় অংশ, আয় হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা, পূরণ হচ্ছে অভ্যন্তরীণ চাহিদা। এর ওপর ভর করেই খাতটিতে অটুট রয়েছে বিপুল কর্মসংস্থান। পাশাপাশি কোরবানির মৌসুমে মসজিদ-মাদ্রাসা, এতিমখানা ও লিল্লাহ বোর্ডিংগুলোর অন্যতম আয়ের উৎসও এটি। কিন্তু স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও মাঠপর্যায় থেকে বিপুল পরিমাণ চামড়া সংগ্রহ ও পরবর্তী ব্যবস্থাপনায় গড়ে ওঠেনি সমন্বিত চেইন ব্যবস্থা। ফলে মৌসুম এলেই ফিরে আসে পুরোনো চিত্র—যেনতেনভাবে চামড়া ছাড়ানো, সময়মতো লবণ প্রয়োগ না করা, খোলা জায়গায় দীর্ঘ সময় ফেলে রাখা আর অপরিকল্পিত সংগ্রহ ব্যবস্থার উদ্বেগজনক বাস্তবতা। মূলত মৌসুমি এই সরবরাহব্যবস্থায় অদক্ষতা, অসচেতনতা, ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তাদের সমন্বয়হীনতা এবং কার্যকর নজরদারির ঘাটতিই প্রতিবছর একই পরিস্থিতি ডেকে আনছে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে এবার কোরবানিযোগ্য পশু রয়েছে ১ কোটি ২৩ লাখের বেশি, যা চাহিদার তুলনায় ২২ লাখ বেশি। এত বিপুলসংখ্যক পশুর কোরবানিতে সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না হলে জাতীয় সম্পদ চামড়ার বড় অংশ আবারও নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) হিসাবে, সঠিকভাবে ছাড়ানো ও সংরক্ষণের অভাবে প্রতিবছর ১৫-৩০ শতাংশ কোরবানির পশুর চামড়া নষ্ট হয়। গত বছরও একই কারণে প্রায় ৩০ শতাংশ চামড়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে অনেক চামড়ার দাম অর্ধেকেরও নিচে নেমে আসে।

চামড়াসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংকটের শুরু কোরবানির পরপরই। প্রায় সব এলাকাতেই অদক্ষ লোক দিয়ে পশুর শরীর থেকে চামড়া ছাড়ানো হয়। অসাবধানতায় ধারালো ছুরির কাটায় চামড়ার মান নষ্ট হয়। এরপর সংগ্রহকারীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা চামড়া স্তূপ করে রাখেন। অথচ গরুর চামড়ায় জবাইয়ের আট ঘণ্টার মধ্যে ৮-১০ কেজি এবং ছাগলের চামড়ায় ৩-৪ কেজি লবণ প্রয়োগ জরুরি।

কিন্তু বাস্তবে অনেক এলাকায় চামড়া রাতভর পড়ে থাকে। এতে পচন ধরে। আবার মৌসুমি ব্যবসায়ীরা লবণ ছাড়াই চামড়া নিয়ে যান আড়তে। পথে যানজট বা দেরির কারণে অনেকেই সময়মতো পৌঁছাতে পারেন না। কেউ লবণ দিলেও তা অনেক সময় চামড়ার ভাঁজে ঠিকমতো পৌঁছায় না। ফলে গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পচন শুরু হয়।

রাজধানীর পোস্তা, টঙ্গী, আমিনবাজার, যশোরের রাজারহাট কিংবা চট্টগ্রামের আতুরা ডিপো—প্রায় সব বড় আড়তেই প্রতিবছর একই চিত্র দেখা যায়। কোথাও খোলা রাস্তায় চামড়া পড়ে থাকে, কোথাও আবার পর্যাপ্ত লবণের অভাবে সংরক্ষণ ব্যাহত হয়।

এ অবস্থায় এবার আগাম প্রস্তুতিতে জোর দিয়েছে সরকার। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জানিয়েছেন, একটি চামড়াও যেন নষ্ট না হয়, সে বিষয়ে সরকার এটিকে জাতীয় দায়িত্ব হিসেবে নিয়েছে। ঈদের আগে দেশের মসজিদগুলোতে জুমার খুতবায় চামড়া সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে মাদ্রাসা, এতিমখানা ও সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ‘অধিকাংশ চামড়া নষ্ট হয় ভুলভাবে চামড়া ছাড়ানো এবং পরে সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করার কারণে’—প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদের এই মন্তব্যেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে খাতটির দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। তিনি জানান, অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার সারা দেশে ২২ হাজার মানুষকে চামড়া ছাড়ানো ও সংরক্ষণের সঠিক পদ্ধতি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। মাঠপর্যায়ে দক্ষতা বাড়ানো গেলে অপচয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে বলে আশা তাঁর।

সরকারের পক্ষ থেকে এবারও প্রায় ২০ কোটি টাকার লবণ বিনা মূল্যে বিতরণ করা হচ্ছে মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানাগুলোয়। বিসিক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে জেলা-উপজেলায় প্রশিক্ষণ কার্যক্রমও চলছে। পশুর হাটসংলগ্ন এলাকাগুলোয় লবণ বিক্রির বিশেষ ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে, যাতে সংকট বা কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধি না হয়।

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান মো. সাখাওয়াত উল্লাহ আজকের পত্রিকাকে বলেন, অনেক মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীরাই রাত পর্যন্ত চামড়া সংগ্রহ করে, পরে তারাই লবণ দেয়। কিন্তু এ কাজে তাদের অভিজ্ঞতা নেই। ফলে সময়মতো সঠিকভাবে লবণ প্রয়োগ হয় না। তাই চামড়া সংগ্রহের পাশাপাশি আলাদা প্রশিক্ষিত সংরক্ষণ টিম গঠন জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত