Ajker Patrika

গ্যাসের উৎপাদন কমছে দেশে, বেড়ে চলেছে আমদানি

  • শিল্পে গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে।
  • চরম দুর্ভোগে গৃহস্থালি সংযোগের গ্রাহকেরাও।
  • সাগরে অনুসন্ধান কার্যক্রমে দীর্ঘদিনে প্রত্যাশিত অগ্রগতি নেই।
  • আমদানি বাজারে পরিণত করার চেষ্টার ফল: বিশেষজ্ঞ
ফয়সাল আতিক, ঢাকা
গ্যাসের উৎপাদন কমছে দেশে, বেড়ে চলেছে আমদানি
প্রতীকী ছবি

দেশে জ্বালানি গ্যাসের ক্রমবর্ধমান চাহিদার বিপরীতে দিনে দিনে কমছে দেশীয় উৎপাদন। ফলে এ খাতে আমদানি-নির্ভরতা বেড়েই চলছে। সরকার নতুন কূপ খনন এবং পুরোনো কূপ সংস্কারের (ওয়ার্কওভার) কিছু উদ্যোগ নিলেও তাতে উৎপাদন হ্রাস ঠেকানো যাচ্ছে না। এতে জরুরি শিল্প খাত যেমন ভুগছে, তেমনি চরম হয়রানির শিকার হচ্ছেন গৃহস্থালি গ্রাহকেরাও। মাসে মাসে বাধ্যতামূলক টাকা দিয়েও মিলছে না রান্নার গ্যাস। চড়া দামে কিনতে হচ্ছে খোলাবাজারের সিলিন্ডার।

পেট্রো-বাংলার কর্মকর্তারা বলছেন, দৈনিক সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ কোনোভাবেই ৩ হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি বাড়ানো যাচ্ছে না। কিছু কিছু কূপ সংস্কার করে উৎপাদন কিছুটা বাড়ানো যাচ্ছে। কিন্তু অন্যদিকে সচল কূপগুলোর উৎপাদন কমছে। ফলে ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে আমদানির দিকে ঝুঁকতে হচ্ছে।

পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) এ কে এম মিজানুর রহমান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ২০২৫ সালে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আলোকে জি-টু-জি ভিত্তিতে ৫৬ কার্গো এলএনজি আমদানি করা হয়। আন্তর্জাতিক বাজার থেকেও কেনা হয় ৫৩ কার্গো। সব মিলিয়ে মোট ১০৯ কার্গো এযাবৎকালের সর্বোচ্চ। চাহিদা বাড়তে থাকায় ২০২৬ সালে মোট ১১৫ কার্গো আমদানির প্রস্তুতি রয়েছে।

বাংলাদেশে আসা এলএনজিবাহী কার্গো জাহাজগুলোতে ৩৩ লাখ ৬০ হাজার এমএমবিটিইউ এলএনজি থাকে। প্রাকৃতিক গ্যাসে রূপান্তর করলে এক কার্গো থেকে কমবেশি ৩ হাজার ২৪০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যায়। অর্থাৎ এক কার্গো এলএনজি থেকে পাওয়া গ্যাসের পরিমাণ দেশের এখনকার এক দিনের সর্বোচ্চ চাহিদার চেয়ে কম।

দেশীয় উৎপাদনের হাল

পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌ. মো. রফিকুল ইসলাম জানান, সাম্প্রতিককালে দেশীয় কূপ থেকে গ্যাসের উৎপাদন সবচেয়ে বেশি ছিল ২০১৭ সালের দিকে। তখন কোনো কোনো দিন দৈনিক ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসও উৎপাদিত হয়েছে। এরপর ধীরে ধীরে উৎপাদন কমেছে। গত বছর দৈনিক গড়ে ১ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো উৎপাদিত হয়েছে। এর মধ্যে নতুন নতুন কূপ উৎপাদনে এলেও আবার পুরোনো কূপে উৎপাদন কমে যাওয়ায় এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।

পেট্রোবাংলার ২৬ জানুয়ারির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেদিন জাতীয় সঞ্চালন লাইনে ২ হাজার ৫৮৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৭৪৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস গেছে দেশীয় কূপ থেকে। আমদানি করা এলএনজি থেকে এসেছে বাকি ৮৪২ মিলিয়ন ঘনফুট। তার আগে ২৪ ও ১৭ জানুয়ারি দেশীয় কূপের উৎপাদন ছিল যথাক্রমে ১ হাজার ৭৪৮ মিলিয়ন এবং ১ হাজার ৭৫৬ মিলিয়ন ঘনফুট।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সুন্দলপুর, শ্রীকাইল, রূপগঞ্জ, ভোলা নর্থ, জকিগঞ্জ ও ইলিশা নামে মোট ৬টি নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। ভোলার শাহবাজপুর ইস্ট, টবগী-১, ইলিশা-১ ও ভোলা নর্থ-২ কূপ খননকাজ শেষ হয়েছে এবং বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য গ্যাস পাওয়া গেছে।

পেট্রোবাংলার সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা গড়পড়তা ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ঘাটতি প্রায় এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। ঘাটতি পূরণে পেট্রোবাংলা ২০২৬ সালের মধ্যে ৫০টি কূপ খনন/উন্নয়ন ও সংস্কারের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। এগুলোর মধ্যে ২২টি কূপের খনন শেষ এবং ৮টির খনন চলছে। ২২ কূপ খনন শেষে ২২৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সংস্থান হয়েছে। তবে এ পর্যন্ত সঞ্চালন লাইনে যুক্ত করা গেছে ১০৭ মিলিয়ন ঘনফুট।

অন্যদিকে ২০২৫-২৮ সময়ে স্থলভাগে ৬৯টি কূপ খনন এবং ৩১টি কূপ সংস্কারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এসব কূপ খনন ও সংস্কারের শেষে দৈনিক আরও ১ হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হবে বলে আশা করছে মন্ত্রণালয়। এতে তখন প্রত্যাশিত দৈনিক উৎপাদিত হবে ৩ হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের ওপরে। তবে জ্বালানি বিভাগের সাম্প্রতিক ভাষ্য হচ্ছে, ২০২৮ সালের মধ্যে দেশে গ্যাসের চাহিদা দৈনিক ৫ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট ছাড়িয়ে যাবে।

সমুদ্রে নেই অনুসন্ধান

তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় সাগরের গভীর অংশ ১৫টি এবং অগভীর অংশ ১১টি ব্লকে ভাগ করা হয়েছে। ১৯৯৮ সালে বঙ্গোপসাগরের সাঙ্গু গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস উত্তোলন শুরু হলেও কয়েক বছরের মধ্যে তা জটিলতায় পড়ে। ২০১৩ সালে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকে সাগরের আর কোনো গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ হয়নি।

মাঝে বেশ কয়েকবার গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক ঠিকাদারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলেও ঝুঁকি ও লাভালাভ বিবেচনায় কেউ এগিয়ে আসেনি। ২০১২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি কনোকোফিলিপস ও স্টেট অয়েল আগ্রহ দেখিয়েও পিছিয়ে যায়। ২০১৬ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার পসকো দাইয়ুর সঙ্গে চুক্তি হলেও শেষ মুহূর্তে তারা ফিরে যায়। ২০১৯ সালে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য আরও অনুকূল নতুন পিএসসি বা উৎপাদন বণ্টন চুক্তি প্রস্তুত করা হয়। তাতেও কোনো কোম্পানির সাড়া মেলেনি। সর্বশেষ ২০২৪ সালের শুরুতে আন্তর্জাতিক টেন্ডারে সাতটি কোম্পানি আগ্রহ দেখালেও শেষ পর্যন্ত কেউ দরপত্র জমা দেয়নি।

পেট্রোবাংলার পরিচালক (পিএসসি) প্রকৌশলী মো. শোয়েব আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানে সর্বশেষ পিএসসি অনুযায়ী কোম্পানিগুলো আগ্রহ দেখিয়েও আর সাড়া দিল না। সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ার ব্যাপার। অন্তর্বর্তী সরকারের মতো একটি স্বল্পমেয়াদি সরকার তাই এ বিষয়ে আর আগায়নি। নির্বাচনের পর নতুন সরকার এলে হয়তো নতুন করে আলাপ শুরু হবে।’

সুতরাং এলএনজি আমদানি বাড়ছেই

সরকারি সংস্থা রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কর্তৃপক্ষ বা আরপিজিসিএলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো কাতার এবং ওমান থেকে জি-টু-জি চুক্তির আলোকে ৪১ কার্গো এলএনজি আমদানি করা হয়েছিল। পরের অর্থবছরে আমদানি হয় ৬৬ কার্গো। ২০২০-২১ অর্থবছর থেকে সরকারি চুক্তির পাশাপাশি খোলাবাজার থেকেও এলএনজি কিনতে শুরু করে সরকার। তখন থেকে সাময়িক ব্যতিক্রম ছাড়া আমদানি বছর বছর বেড়ে চলেছে। সর্বশেষ অর্থবছরে খোলাবাজার থেকে ৪০সহ মোট ৮৩ কার্গো আমদানি হয়েছিল। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ের মধ্যেই খোলাবাজার থেকে ২৩ কার্গো এলএনজি কেনা হয়েছে।

নিয়মিত আমদানি, বিশেষ করে অস্থিতিশীল খোলাবাজার থেকে তুলনামূলক চড়া দামে ক্রয় বৈদেশিক মুদ্রার মজুতের ওপর চাপ সৃষ্টি করে যাচ্ছে। সময়মতো চুক্তির অর্থ পরিশোধে সমস্যার কারণে অতীতে বিদেশ থেকে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

বিশেষজ্ঞ যা বলেন

ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম মনে করেন, বাংলাদেশকে জ্বালানি আমদানি বাজারে পরিণত করার অব্যাহত প্রচেষ্টার ফলেই আজকের এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন, ‘২০১০ সালের দিকেও সরকার গ্যাস রপ্তানি করতে উদ্যত হয়েছিল। আর ১৫ বছরের মাথায় এখন আমদানি চাহিদা বাড়ছে। এখন মানুষও ভোগান্তির মধ্যে পড়ছে। বর্তমান সরকারও আগের সরকারের নীতিতে রয়েছে। তারা বাংলাদেশকে গ্যাসের আমদানি বাজারে রূপান্তর করতে চেয়েছিল, সেটাই করেছে।’

সরকারের কূপ খনন উদ্যোগ প্রসঙ্গে ক্যাবের উপদেষ্টা বলেন, ‘সরকার কূপ খননের যে কথা বলছে, সেটা কার্যত কথার কথা। স্থলভাগের গ্যাস অনুসন্ধানে বাপেক্সকে কাজে লাগানোর কথা, কিন্তু তা-ও সেভাবে হয়নি। গ্যাস উন্নয়ন তহবিলের অর্থও খরচ করা হচ্ছে না। বিদেশিরা এসে আমাদের দেশে গ্যাস উত্তোলন করতে পারছে। কিন্তু আমরা পারছি না কেন? এসবের মধ্যে ভয়ংকর দুরভিসন্ধি রয়েছে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত