Ajker Patrika

বিআইডব্লিউটিসি: ফেরির ই-টিকিটিং আটকে দরপত্রে

  • ঠিকাদার নিয়োগে প্রথম দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল ১৫ মাস আগে।
  • একাধিকবার দরপত্র স্থগিত, নতুন দরপত্র আহ্বান, পরে তা-ও বাতিল।
  • ৮ ফেরিঘাটে এখনো যানবাহন ও যাত্রীদের জন্য হাতে লেখা টিকিট।
  • ফেরিঘাটে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়সহ নানান অনিয়মের অভিযোগ।
তৌফিকুল ইসলাম, ঢাকা 
বিআইডব্লিউটিসি: ফেরির ই-টিকিটিং আটকে দরপত্রে
ফাইল ছবি

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) ফেরি ও যাত্রীসেবায় ই-টিকিটিং ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ প্রায় ১৫ মাসেও বাস্তবায়িত হয়নি।

দরপত্র নিয়ে নানা জটিলতার কারণে এই সেবা চালুর জন্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বা ঠিকাদারও এখনো নিয়োগ হয়নি।

বিআইডব্লিউটিসির সূত্র জানায়, ফেরিঘাটে যানবাহন ও ফেরির দীর্ঘ সারি নিয়ন্ত্রণ, ডিজিটালাইজেশন এবং যাত্রীদের অপেক্ষার সময় কমানোর লক্ষ্যে ই-টিকিটিং চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু দরপত্র জটিলতায় আটকে আছে বাস্তবায়ন। ই-টিকিটিং চালুর জন্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের প্রথম দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল ২০২৪ সালের অক্টোবরে। পরে দরপত্র একাধিকবার স্থগিত হয়। আবার দরপত্র আহ্বান করা হলেও ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হয়নি। সর্বশেষ ২২ জানুয়ারি বিআইডব্লিউটিসির এক নোটিশে ‘কর্তৃপক্ষের নির্দেশক্রমে অনিবার্য কারণবশত’ দরপত্র বাতিল করা হয়। শিগগির নতুন করে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে বলে ওই নোটিশে জানানো হয়। মূলত ঠিকাদার নিয়োগ না হওয়ায় ই-টিকিটিং চালু করা যাচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়।

জানতে চাইলে বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান মো. সলিম উল্লাহ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘শুরুতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের আদেশে দরপত্র প্রক্রিয়া বাতিল হয়েছিল। ওই দরপত্রে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিট (সিপিটিইউ) আপিল করেছিল। সিপিটিইউ থেকে আমাদের আবার নেগোশিয়েট করতে বলেছিল। সেটা করে আমরা সিপিটিইউকে জানিয়েছি। আইনবহির্ভূত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই। যেহেতু দরপত্র বাতিলের সিদ্ধান্ত মন্ত্রণালয় থেকে এসেছে, তাই এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিসির করার কিছু নেই।’

বিআইডব্লিউটিসির একটি সূত্র বলেছে, ফেরি ও যাত্রীসেবা ব্যবস্থাপনার সঙ্গে শ্রমিক সংগঠন, বিআইডব্লিউটিএ, উপজেলা প্রশাসন, বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসহ আরও অংশীজন যুক্ত থাকে। দীর্ঘদিন ধরেই ফেরিঘাটে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, দালালের দৌরাত্ম্য, টাকার বিনিময়ে সিরিয়াল ভাঙা, আগে পারাপারের সুযোগ নেওয়া এবং হাতে লেখা টিকিট ব্যবস্থার নানান অভিযোগ রয়েছে। ই-টিকিটিং চালু হলে এসব ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ফিরবে, দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা বন্ধ হবে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করা পক্ষ হয়তো ই-টিকিটিং চালুর বিরোধিতা করছে।

বিআইডব্লিউটিসির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ৮টি ফেরিঘাট রয়েছে, যেখানে কোনো ই-টিকিটিং ব্যবস্থা নেই। ভবিষ্যতে ফেরিঘাটের সংখ্যা বাড়তে পারে। বর্তমানে বিআইডব্লিউটিসির অধীনে ৫৪টি ফেরি চলাচল করছে। পাশাপাশি সীমিত আকারে যাত্রীসেবাও দেওয়া হয়। যানবাহনের পাশাপাশি কিছু যাত্রী ফেরিতে যাতায়াত করেন। এ ছাড়া হাতিয়া-মনপুরা, কুতুবদিয়া-কক্সবাজার, ভোলা-লক্ষ্মীপুর রুটে সি-ট্রাকের মাধ্যমে যাত্রী পরিবহন করা হয়। সম্প্রতি ঢাকা-চাঁদপুর-বরিশাল রুটে প্যাডেল স্টিমার চালু হয়েছে।

সূত্র বলছে, ফেরি ও যাত্রীসেবায় ই-টিকিটিং চালু হলে মোবাইল অ্যাপ ও ওয়েবসাইটের মাধ্যমে অনলাইন ও অফলাইনে টিকিট কেনার সুযোগ মিলবে। এতে যুক্ত থাকবে পেমেন্ট গেটওয়ে, উন্নত নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং এসএমএসের (খুদে বার্তা) মাধ্যমে টিকিট যাচাই ও ক্রয় নিশ্চিত করার সুবিধা। যাত্রীরা সময়সূচি, আবহাওয়ার তথ্য এবং প্রয়োজনীয় নোটিফিকেশনও পাবে।

বিআইডব্লিউটিসির একাধিক কর্মকর্তা জানান, ঈদের সময় ট্রাক, লরি ও কাভার্ড ভ্যানের দীর্ঘ সারি নিয়ন্ত্রণ করা খুব কঠিন হয়ে পড়ে। ডিজিটাল রূপান্তরের মূল লক্ষ্য হলো নাগরিকদের হাতের নাগালে সেবা পৌঁছে দেওয়া। এতে জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় কমবে, অপেক্ষার সময় কমবে এবং সময়মতো পণ্য পরিবহন সম্ভব হবে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী আজকের পত্রিকাকে বলেন, ফেরিঘাটে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, দালাল চক্র, সিরিয়াল ভাঙা এবং হাতে লেখা টিকিটের সুযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চালক ও যাত্রীদের হয়রানি করা হচ্ছে। স্বচ্ছ ডিজিটাল ব্যবস্থার অভাবই এসব অনিয়মের মূল কারণ। ই-টিকিটিং চালু হলে দালাল চক্র স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রণে আসবে এবং যাত্রীরা সরাসরি সেবা পাবে। কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠীর চাপেই এই ব্যবস্থা চালু হচ্ছে না। সরকারের উচিত যাত্রীস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত ই-টিকিটিং বাস্তবায়ন করা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ই-টিকিটিং চালু হলে ফেরিঘাটকেন্দ্রিক যানজট কমত, সামগ্রিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা উন্নত হতো এবং সব সেবার তথ্য নিয়ে একটি কেন্দ্রীয় ডেটাবেইস তৈরি করা যেত। দেশের সব ফেরি, সি-ট্রাক ও যাত্রীবাহী নৌযানের জন্য একটি সমন্বিত কেন্দ্রীয় ই-টিকিটিং ব্যবস্থা গড়ে উঠত; যা প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং বিআইডব্লিউটিসির সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হতো।

বিআইডব্লিউটিসির ই-টিকিটিংয়ের জন্য ঠিকাদার নিয়োগের দরপত্রের নথিতে উল্লেখ ছিল, বিদ্যমান ফেরি ও যাত্রীসেবাকে ধাপে ধাপে ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল ওজন মেশিনের ডিজিটাল হিসাব, জাহাজ ট্র্যাকিং ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনা, যানবাহনের কিউ ব্যবস্থাপনা, নেভিগেশন ম্যাপ, অনলাইন ও অফলাইন টিকিট বিক্রি, পেমেন্ট গেটওয়ে এবং সময়সূচি ব্যবস্থাপনা করা।

বিআইডব্লিউটিসির ই-টিকিটিং চালুর উদ্যোগের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেন, এ ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর প্রকল্পে বারবার দরপত্র স্থগিত হওয়া সাধারণত প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, সমন্বয়ের ঘাটতি এবং স্বার্থের সংঘাতের ইঙ্গিত দেয়। ই-টিকিটিং চালু করতে হলে বিআইডব্লিউটিসিকে আগে একটি স্পষ্ট রোডম্যাপ ঠিক করতে হবে এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনাকে পেশাদার কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে। প্রয়োজনে স্বচ্ছ আন্তর্জাতিক দরপত্র পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। তা না হলে এই উদ্যোগ বারবার কাগজেই আটকে যাবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত