Ajker Patrika

গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট: লোডশেডিংয়ে তাঁতশিল্পে ধস

  • বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৩৭০ মেগাওয়াট; সরবরাহ মিলছে মাত্র ২২৩ মেগাওয়াট।
  • লোডশেডিংয়ের কারণে সুতার রঙে প্রভাব পড়ছে। নষ্ট হচ্ছে সুতা।
  • দুর্গাপূজায় ভারতের চাহিদামতো শাড়ি সরবরাহ দিতে না পারার শঙ্কা।
আনোয়ার সাদাৎ ইমরান, টাঙ্গাইল 
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট: লোডশেডিংয়ে তাঁতশিল্পে ধস
লোডশেডিংয়ের কারণে তাঁত কারখানার উৎপাদন বন্ধ। গতকাল টাঙ্গাইলের পাথরাইল এলাকায়। ছবি: আজকের পত্রিকা

সারা দেশে চলমান লোডশেডিংয়ের প্রভাব পড়েছে টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্পেও। বিদ্যুৎ না থাকায় দিনের বেশির ভাগ সময় তাঁত বন্ধ থাকছে। এতে উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে গেছে। সময়মতো অর্ডার সরবরাহ করতে না পারায় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, জেলায় বিদ্যুতের মোট চাহিদা প্রায় ৩৭০ মেগাওয়াট; সরবরাহ মিলছে মাত্র ২২৩ মেগাওয়াট। এর মধ্যে টাঙ্গাইল বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) চাহিদা ১৭০ মেগাওয়াট; সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১১০ মেগাওয়াট। অপর দিকে পল্লী বিদ্যুতের চাহিদা ২০০ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ মিলছে মাত্র ১১৩ মেগাওয়াট। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অর্ধেকে নেমে আসায় শহর ও গ্রামাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১ বা ২ ঘণ্টা পরপর লোডশেডিং দেওয়া হচ্ছে। তাঁতসংশ্লিষ্টরা জানান, মেরুন কালার করার জন্য এক শ কেজি সুতা দেওয়া হলো ডায়িংয়ে, হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল। তখন ওই সুতার রং মেরুন না হয়ে কালো অথবা সবুজ হয়ে যায়। অপর দিকে লোডশেডিংয়ের সময় পাওয়ার লুমে শাড়ি বুনন সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে। হ্যান্ডলুমেও কারিগরেরা গরমের কারণে শাড়ি বুনতে পারেন না। ফলে উৎপাদন কমে যাওয়ায় সময়মতো অর্ডার সরবরাহ করা যাচ্ছে না।

এই লোডশেডিংয়ের কারণে চলতি বছর দুর্গাপূজার সময় ভারতে শাড়ির চাহিদাও পূরণ করা সম্ভব হবে না বলে মনে করছেন পাথরাইল তাঁত শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি রঘুনাথ বসাক। তিনি বলেন, তীব্র লোডশেডিংয়ের কারণে তাঁতশিল্পে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

হরিপদ অ্যান্ড সন্স তাঁতের স্বত্বাধিকারী কালাচাঁদ বসাক বলেন, ‘দফায় দফায় ক্ষতিগ্রস্ত হতে হতে আমি আমার হ্যান্ডলুম কারখানা বন্ধ করে দিয়েছি। কারখানার শ্রমিকেরা দিনে চারটি শাড়ি উৎপাদন করে প্রতিটি ১৫০ টাকা হারে ৬০০ টাকা মজুরি পেত। লোডশেডিংয়ের কারণে দুটি শাড়ি উৎপাদন করাও কষ্ট হয়ে যায়। দিনে ৩০০ টাকায় সংসার না চলায় পেশা ছেড়ে অনেকেই অটো ও সিএনজি চালাচ্ছে।’

কালাচাঁদ বসাক আরও বলেন, ‘আকন্দপাড়ায় ২৮টি পাওয়ারলুম মেশিনযুক্ত কারখানা ছিল। সেগুলো বাধ্য হয়ে বিক্রি করে দিয়েছি। দুলাল ঘোষ, সমীর চন্দ্রের মতো অনেকেই তাঁত বিক্রি করে দিয়েছেন। কারিগর সুশীল চন্দ, সুনীল সূত্রধরসহ অনেকেই পেশা ছেড়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন।’

এটিএম লুঙ্গি ফ্যাব্রিকস ইন্ডাস্ট্রিজ ব্যবস্থাপনা পরিচালক দীলিপ কুমার বলেন, বিদ্যুৎ না থাকলে উৎপাদন বন্ধ আর উৎপাদন বন্ধ মানে লোকসান। দিনে ৫-৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। দ্রুত নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে সরকারের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

টাঙ্গাইল পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার মো. ছানোয়ার হোসেন বলেন, পল্লী বিদ্যুতের আওতায় জেলায় বিদ্যুৎ চাহিদা ২০০ মেগাওয়াটের স্থলে সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে ১১৩ মেগাওয়াট। ঘাটতির কারণে ঘন ঘন লোডশেডিং দেওয়া হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার কাজ করে যাচ্ছে।

এ বিষয়ে টাঙ্গাইল বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিউবো) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ওবাইদুল ইসলাম বলেন, জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম পাওয়ায় সাময়িক লোডশেডিং করতে হচ্ছে। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার এবং দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করার আপ্রাণ চেষ্টা চলছে।

বিদ্যুৎ-সংকটে সবচেয়ে বেশি ধস নেমেছে বড় বড় কলকারখানাগুলোতে। নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন চালু রাখতে অনেক বড় প্রতিষ্ঠান বাধ্য হয়ে ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করছে। এতে জ্বালানি খরচ জ্যামিতিক হারে বেড়ে যাওয়ায় সামগ্রিক ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। বাড়তি জেনারেটর খরচ বহন করতে না পেরে লোকসানের মুখে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ছোট ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো।

প্রচণ্ড গরমের মধ্যে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছে শিশু ও বয়স্করা। বাসাবাড়িতে ফ্যান ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্র চালাতে না পারায় গরমে দিনভর চরম অস্বস্তিতে থাকতে হচ্ছে সব বয়সী মানুষকে। লোডশেডিংয়ের কারণে সাধারণ মানুষ ঘুমাতে পারছে না। পানি সরবরাহ, পড়াশোনা ও দৈনন্দিন কাজকর্মও ব্যাহত হচ্ছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত