Ajker Patrika

৭০০ বছর ধরে গণ-ইফতারের ঐতিহ্য শাহজালাল (রহ.) দরগাহে

লবীব আহমদ, সিলেট 
৭০০ বছর ধরে গণ-ইফতারের ঐতিহ্য শাহজালাল (রহ.) দরগাহে
শাহজালাল (রহ.) দরগাহে গণ-ইফতারে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা। গতকাল বৃহস্পতিবার তোলা। ছবি: আজকের পত্রিকা

সিলেটের হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর দরগাহ শুধু আধ্যাত্মিক কেন্দ্র হিসেবেই নয়, বরং শতাব্দীপ্রাচীন মানবিক ও সাম্যের এক অনন্য ঐতিহ্যের জন্যও পরিচিত। প্রায় ৭০৭ বছর ধরে পবিত্র রমজান মাসজুড়ে এখানে আয়োজন করা হচ্ছে গণ-ইফতার, যেখানে ধনী-গরিব, দেশি-বিদেশি কিংবা ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সবাই একই দস্তরখানে বসে ইফতার করেন।

ইতিহাসবিদদের মতে, ১৩০৩ খ্রিষ্টাব্দে (৭০৩ হিজরি) হজরত শাহজালাল (রহ.) ৩৬০ জন আউলিয়াকে সঙ্গে নিয়ে সিলেটে আগমন করেন এবং ইসলাম প্রচারের পাশাপাশি আতিথেয়তা ও দরিদ্রদের খাদ্য সহায়তার যে সংস্কৃতি চালু করেছিলেন, তারই ধারাবাহিকতায় এই গণ-ইফতার প্রথার সূচনা। সময়ের পরিবর্তন হলেও শতাব্দীপ্রাচীন এই আয়োজন আজও সমানভাবে অব্যাহত রয়েছে।

প্রতিদিন বসে মিলনমেলা

রমজান মাসজুড়ে প্রতিদিন আসরের নামাজের পর থেকে দরগাহ প্রাঙ্গণে ইফতার করতে আসা মানুষদের ভিড় জমতে শুরু করে। আগে এলে আগে বসার ভিত্তিতে সবাই জায়গা পান। অনেক সময় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে যায়। সমাজের বিত্তশালী ব্যক্তি থেকে শুরু করে ছিন্নমূল মানুষ—সবাই একই দস্তরখানে বসে ইফতার করেন, যা সাম্যের এক বিরল দৃশ্য তৈরি করে।

কী থাকে ইফতারে

সাধারণত বড় ডেকচিতে রান্না করা খিচুড়ি, ছোলা, পেঁয়াজু, মুড়ি ও খেজুর এবং মাজারের নিজস্ব কূপের ‘আবে জমজমসদৃশ’ পানি পরিবেশন করা হয়। আবার অনেক সময় গরুর আখনি বা পোলাওয়ের সঙ্গে গরু-খাসির মাংসের তরকারি দেওয়া হয়।

প্রায় ৭০৭ বছর ধরে শাহজালাল (রহ.) দরগাহে ইফতার আয়োজন করা হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার তোলা। ছবি: আজকের পত্রিকা
প্রায় ৭০৭ বছর ধরে শাহজালাল (রহ.) দরগাহে ইফতার আয়োজন করা হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার তোলা। ছবি: আজকের পত্রিকা

সাত শ বছরের ধারাবাহিকতা

ইতিহাসবিদদের মতে, ১৩০৩ খ্রিষ্টাব্দে হজরত শাহজালাল (রহ.) সিলেটে আসার পর থেকে মেহমানদারি ও গরিব-মিসকিনদের খাওয়ানোর এই প্রথা শুরু হয়। মাজার কর্তৃপক্ষ ও ভক্তদের অনুদানে এই বিশাল আয়োজন চলে। বর্তমানে আধুনিক যুগেও এই প্রথা বিন্দুমাত্র ম্লান হয়নি।

ভক্তদের বিশ্বাস ও প্রশান্তি

অনেকে মনে করেন, দরগাহর এই ইফতারে অংশ নিলে আত্মিক প্রশান্তি পাওয়া যায়। দূরদূরান্ত থেকে পর্যটকেরা সিলেটে আসেন শুধু এই গণ-ইফতারের দৃশ্য দেখতে এবং এতে শরিক হতে।

দরগাহে ইফতার আসে কোথা থেকে

দরগাহ কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে ভক্তদের মানত (শিরনি), স্থানীয় ব্যবসায়ী ও প্রবাসীদের অনুদানে এই বৃহৎ আয়োজন পরিচালিত হয়। ইফতারের আগে সম্মিলিত মোনাজাতে দেশ ও জাতির কল্যাণ কামনা করা হয়। এ ছাড়া দরগাহ পুকুরের মাছগুলোকেও ইফতারের সময় খাবার দেওয়া হয়, যা দেখতে দর্শনার্থীদের আগ্রহ লক্ষ করা যায়।

অংশগ্রহণকারীদের অনুভূতি

অনিক নামের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসা এক শিক্ষার্থী দরগাহে বসে ইফতার করছিলেন। তখন তিনি বলেন, ‘আমার অনেক দিনের ইচ্ছা ছিল এখানে সবার সঙ্গে বসে ইফতার করব। ওপরে গেলাম, মাজারে জিয়ারত করলাম। এখন সবাই মিলে ইফতার করছে, খুব ভালো লাগছে। সব ধরনের মানুষ একসঙ্গে বসেছে, সবাই মিলে ইফতার করছে। ইফতারের মানে এমনই হওয়া উচিত ছিল।’

ইফতার করতে আসা রহিম উদ্দিন নামের একজন বলেন, রমজান মাসজুড়েই এখানে ইফতার করানো হয়। রাতেও খাবারের ব্যবস্থা আছে। অনেক মানুষ এখানে আসেন। সিলেটের মানুষ এমনিতে আপ্যায়নপ্রিয়, তাঁরা এই সুযোগটা করে দেন।

শামীম আহমদ নামের একজন বলেন, ‘এখানে কোনো ভেদাভেদ নেই। সবাই আসেন—হিন্দু বলেন, মুসলিম বলেন। মুসলিম তো আসেই, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান—সবাই আসেন। আমরা সবাইকেই একই কাতারে ইফতার করাই।’

প্রায় ৭০৭ বছর ধরে শাহজালাল (রহ.) দরগাহে ইফতার আয়োজন করা হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার তোলা। ছবি: আজকের পত্রিকা
প্রায় ৭০৭ বছর ধরে শাহজালাল (রহ.) দরগাহে ইফতার আয়োজন করা হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার তোলা। ছবি: আজকের পত্রিকা

স্বেচ্ছাসেবকদের নিরলস শ্রম

দরগাহের ইফতারে হাজার হাজার মানুষ বসা সত্ত্বেও কোনো বিশৃঙ্খলা ছাড়াই অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে স্বেচ্ছাসেবকেরা খাবার পরিবেশন করেন। এখানে বেশ কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবক কাজ করে থাকেন। তেমনই একজন নুরুল ইসলাম। তিনি জানান, প্রায় ২৫ বছর ধরে তিনি এই সেবার সঙ্গে যুক্ত। প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৪৫০ জন মানুষের জন্য ইফতার প্রস্তুত করা হয় এবং ৪০ থেকে ৫০ জন স্বেচ্ছাসেবক এতে কাজ করেন।

নুরুল ইসলাম আরও বলেন, ‘আমাদের খুব আনন্দ লাগে, আমরা সবাই মিলে খুব খুশিতে এই কাজটা করি। তবে ঈদের দিন আসরের নামাজের পর যখন আসি, তখন মনটা খুব খারাপ হয়ে যায়। কারণ, পুরো এক মাস আমরা মানুষকে ইফতার করিয়েছি, মাঠে অনেক মানুষ থাকত। কিন্তু ঈদের দিন আসরের পর সেই পরিবেশটা আর থাকে না, মানুষকে ইফতার করাতে পারি না—তাই মনটা একটু খারাপ লাগে।’

দরগাহ মাজারের প্রধান খাদেম সামুন মাহমুদ খান জানান, শাহজালাল (র.)-এর মাজারে সব ধরনের মানুষ আসেন। তাঁদের জন্য সব সময় ইফতারের ব্যবস্থা করা হয়। এখানে বেশির ভাগই ছিন্নমূল মানুষ থাকেন। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষজন আসেন। এটি ৭০০ বছরের বেশি সময় ধরে চলে আসছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

দেশে ৫.৪ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত, উৎপত্তিস্থল সাতক্ষীরা

পুলিশ হত্যার তদন্ত হয়েছে, প্রয়োজন হলে আরও তদন্ত হবে: মির্জা ফখরুল

আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধ’ ঘোষণা পাকিস্তানের, কাবুলে বিমান হামলা

নরসিংদীতে কিশোরীকে অপহরণের পর হত্যায় বিএনপি নেতাসহ গ্রেপ্তার ৫

ফের কেন আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল পাকিস্তান

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত