Ajker Patrika

সিলেট বিভাগ: কোন্দল, বিদ্রোহীর চাপে বিএনপি, জোটে ‘দুর্বল’ জামায়াত

  • আরিফুল-জয়নালের শক্ত লড়াই, চাপে মুক্তাদিরও।
  • মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জামায়াত-জোটের ১৪ প্রার্থী।
  • ১১টিতে চাপে রয়েছেন বিএনপি-জোটের প্রার্থীরা।
ইয়াহ্ইয়া মারুফ, সিলেট 
সিলেট বিভাগ: কোন্দল, বিদ্রোহীর চাপে বিএনপি, জোটে ‘দুর্বল’ জামায়াত
ফাইল ছবি

সিলেট বিভাগের ১৯টি আসনের মধ্যে ৫টিতে এবারের ভোটের লড়াই দলগুলোর মধ্যে যতটা, তার চেয়ে বেশি আলোচনায় বিএনপির ভেতরের টানাপোড়েন। বিএনপির দলীয় প্রার্থীর বিপরীতে বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থীরা শক্ত অবস্থান গড়ে তোলায় একদিকে ভোটব্যাংক ভাগ হচ্ছে, অন্যদিকে পাল্টে যাচ্ছে জয়ের হিসাব-নিকাশ।

এদিকে জামায়াতে ইসলামীও রয়েছে বিপাকে। সিলেট বিভাগের ১৯টি আসনের মধ্যে ৮টিই জোটের শরিকদের ছেড়ে দিয়েছে দলটি। বাকি ১১ আসনে প্রার্থী রয়েছে দলটির। দলটির নেতারা মনে করছেন, জোটের শরিকদের ছেড়ে দেওয়া কিছু আসনে নিজেরা ভোট করলে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। এখন জোটের প্রার্থীদের দিয়ে সেই ফলাফল পাওয়া কঠিন হবে।

কোন্দল, বিদ্রোহী-স্বতন্ত্রে চাপে বিএনপি

বিএনপির নেতা-কর্মী, সমর্থক ও ভোটাররা বলছেন, দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সিলেট সফরের সময় দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব আপাতত কিছুটা মিটেছে। তবে ভেতরে ভেতরে যে দূরত্ব রয়ে গেছে, তার প্রভাব পড়তে পারে ভোটে। পরিস্থিতি যে অনুকূলে নয়, এটাও বিএনপির মোটামুটি জানা। নিয়ন্ত্রণে বিদ্রোহী ও শরিক দলের প্রার্থীদের আসনে প্রায় ৪০ জন নেতাকে বহিষ্কার করেছে দলটি।

সুনামগঞ্জ-১ (তাহিরপুর, জামালগঞ্জ, ধর্মপাশা ও মধ্যনগর) আসনে বিএনপি প্রথমে মনোনয়ন দিয়েছিল তাহিরপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আনিসুল হককে। পরে তাঁকে বাদ দিয়ে মনোনয়ন দেওয়া হয় উপজেলার আরেক সাবেক চেয়ারম্যান কামরুজ্জামানকে। দুজনকে মনোনয়নের চিঠি দেওয়ায় বঞ্চিত প্রার্থী বিদ্রোহী হওয়ার সুযোগ পাননি। কিন্তু আনিসুল হকের সমর্থকেরা এখনো মেনে নিতে পারেননি কামরুজ্জামানকে।

‎সুনামগঞ্জ-৩ (জগন্নাথপুর-শান্তিগঞ্জ) আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন সাতজন প্রার্থী। এখন পর্যন্ত বেশ ভালো অবস্থানে বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিস্টার মো. আনোয়ার হোসেন। তাঁর সঙ্গে লড়াই হবে বিএনপির দলীয় প্রার্থী যুক্তরাজ্য বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মোহাম্মদ কয়ছর আহমদের। সুনামগঞ্জ-৪ (সদর) আসনে জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি দেওয়ান জয়নুল জাকেরীন মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন। তিনি সদর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান। এই আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন নুরুল ইসলাম।

স্থানীয়রা বলছেন, দুটি আসনেই বিএনপিকে বেকায়দায় ফেলতে পারেন বিদ্রোহী প্রার্থীরা। এ ছাড়া সুনামগঞ্জ-৩ আসনে ১১ দলের জোটের প্রার্থী না থাকায় জামায়াতের ভোটও যেতে পারে আনোয়ারের বাক্সে।

সিলেট-২ (বিশ্বনাথ-ওসমানীনগর) আসনে বিএনপির প্রার্থী নিখোঁজ এম ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদির লুনা। এখানে মনোনয়ন চেয়েছিলেন দলটির যুগ্ম মহাসচিব হুমায়ুন কবির। প্রচার-প্রচারণার সময় তিনি নিষ্ক্রিয়ই ছিলেন বলা যায়। আর জামায়াত জোটের প্রার্থী বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব মুহাম্মদ মুনতাসির আলীও হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে চলে এসেছেন।

সিলেট-৩ (দক্ষিণ সুরমা, ফেঞ্চুগঞ্জ ও বালাগঞ্জ) আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন যুক্তরাজ্য বিএনপির সদ্য সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ আব্দুল মালিক। তিনি দীর্ঘ ১৯ বছর যুক্তরাজ্যে ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তিনি দেশে ফেরেন। এখানে বিএনপির শক্তিশালী মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী। এ ছাড়া বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক এম এ সালাম, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক আবদুল আহাদ খান জামালসহ আরও কয়েকজন মনোনয়ন চেয়েছিলেন।

স্থানীয় বিএনপির নেতারা জানান, কাইয়ুম, সালাম, আহাদসহ অন্য মনোনয়নপ্রত্যাশীরা আব্দুল মালিকের পক্ষে মাঠে নেমেছেন। তবে প্রবাসে থাকার কারণে অনেকটা ‘বিচ্ছিন্ন’ আব্দুল মালিককে অন্য মনোনয়নপ্রত্যাশীর সমর্থকেরা কতটা মেনে নিতে পারছেন, তা নিয়ে আলোচনা আছে। প্রকাশ্যে কেউ কিছু না বললেও ভেতরে-ভেতরে দলের একটা অংশ ক্ষুব্ধ বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

তবে জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, ‘বড় দলে একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী থাকাই স্বাভাবিক। জেলায় বিএনপি ও বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীর বিজয় নিশ্চিত করতে আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে মাঠে আছি।’

সিলেট-৫ (কানাইঘাট-জকিগঞ্জ) আসনটি বিএনপি ছেড়ে দিয়েছে জোটের শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সভাপতি উবায়দুল্লাহ ফারুককে। এখানে জেলা বিএনপির সহসভাপতি মামুনুর রশীদ (চাকসু মামুন) ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হয়েছেন। বিএনপি তাঁকে বহিষ্কার করলেও স্থানীয় নেতা-কর্মীদের অনেকে তাঁর পক্ষে কাজ করছেন। আর খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মুফতি মোহাম্মদ আবুল হাসানকে সমর্থন দিয়েছে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট।

সিলেট-৬ (বিয়ানীবাজার-গোলাপগঞ্জ) আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এমরান আহমদ চৌধুরী। এখানে বিএনপির বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। সবাই প্রকাশ্যে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে আছেন, তবে আড়ালে ‘বিভেদ’ আছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, এই আসনে ঢাকা মহানগর উত্তর জামায়াতের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন ১১-দলীয় জোটের প্রার্থী। বিএনপির সব কর্মী-সমর্থককে ঐক্যবদ্ধ করতে না পারলে বেকায়দায় পড়তে পারেন দলটির প্রার্থী। সিলেট জেলার মধ্যে একমাত্র এই আসনেই বিএনপি ও জামায়াতের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

হবিগঞ্জ-১ (নবীগঞ্জ-বাহুবল) আসনে শেষ সময়ে বিএনপিতে যোগ দিয়ে মনোনয়ন পেয়েছেন আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়ার ছেলে রেজা কিবরিয়া। কিন্তু এটি মেনে নিতে পারেননি বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য শেখ সুজাত মিয়া। তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে রেজা কিবরিয়াকে চ্যালেঞ্জে ফেলে দিয়েছেন। ১১ দলীর জোট থেকে খেলাফত মজলিসের সিরাজুল ইসলাম মিরপুরীকে প্রার্থী ঘোষণা করায় লড়াইটা গড়িয়েছে রেজা কিবরিয়া ও শেখ সুজাতের মধ্যে।

মৌলভীবাজার-৪ (শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ) আসনে বিএনপির প্রার্থী কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মুজিবুর রহমান। এখানে বিএনপির মাথাব্যথা হয়ে দাঁড়িয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী শ্রীমঙ্গল পৌরসভার সাবেক মেয়র মহসিন মিয়া (মধু)। জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির পদ থেকে মহসিন মিয়াকে বহিষ্কার করলেও দলে বিভক্তি রয়ে গেছে। ১১ দলীয় নির্বাচনী জোটের জটও রয়েছে। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় সদস্য সচিব প্রীতম দাশ এবং একই জোটের শরিক দল বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মৌলভীবাজার জেলা কমিটির উপদেষ্টা মাওলানা শেখ নূরে আলম হামিদী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন। দুজনই ১১ দলীয় নির্বাচনী জোটের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে দাবি করে প্রচারণা চালাচ্ছেন।

সিলেট-১ (মহানগর ও সদর) আসনে বিএনপি নেতা খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর ও আরিফুল হক চৌধুরী মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। এখানে মনোনয়ন পেয়েছেন মুক্তাদীর। আরিফুলকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে সিলেট-৪ (কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুর) আসনে।

স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীরা বলছেন, দুইবারের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর সদরে শক্ত অবস্থান। তিনি এখানে প্রার্থী হলে অনায়াসে বিএনপি জিতে যেত। কিন্তু তাঁকে যেখানে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে, সেটি তাঁর জন্য নতুন। সিলেট-৪ আসনকে জামায়াতের জন্যও সম্ভাবনাময় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে আরিফুল হককে কঠিন লড়াইয়ে পড়তে হচ্ছে।

সিলেট সদরে আরিফুল হক মনোনয়ন না পাওয়ায় তাঁর সমর্থকেরা হতাশ, ক্ষুব্ধ বলে জানান দলীয় নেতারা। অবশ্য দল এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতারা মুক্তাদীরের পক্ষে মাঠে তৎপর আছেন। যদিও আরিফুল ঘরানার লোকজন মুক্তাদীরের পক্ষে খোলা মনে কাজ করবেন কি না, সেই আশঙ্কা অনেকের।

সিলেট-৪ আসনে জামায়াতের প্রার্থী জৈন্তাপুর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি জয়নাল আবেদিন। জামায়াত আরিফুল হককে স্থানীয় প্রার্থী নয় বলে প্রচার চালাচ্ছে। তবে স্থানীয়রা বলছেন, আরিফুল সদরের মানুষ হলেও শক্তিশালী প্রার্থী। ফলে জামায়াতের সম্ভাবনাময় আসনটি কঠিন চ্যালেঞ্জে পড়েছে। আবার আরিফুল হককেও সহজ আসন ছেড়ে কঠিন আসনে লড়তে হচ্ছে।

আরিফুল হক মনোনয়নপ্রত্যাশী অন্যদের এক কাতারে নিয়ে আসতে পেরেছেন বলে দলটির নেতা-কর্মীরা দাবি করেছেন। তবে এই আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী কেন্দ্রীয় বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ্ সিদ্দিকীকে এখনো আরিফুলের পক্ষে মাঠে নামতে দেখা যায়নি। তবে সিলেট-১ আসনে মুক্তাদিরের পক্ষে রয়েছেন সরব।

এদিকে, ভোটের সময় যত ঘনিয়ে আসছে, খন্দকার মুক্তাদিরের জন্য হিসাব-নিকাশ কঠিন হয়ে উঠছে। শেষ সময়ে এসে টানা দুদিন জামায়াত প্রার্থীর বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন, অভিযোগের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। মুক্তাদিরের বিশাল ব্যাংকঋণের বিষয়টিও সামনে আনছে জামায়াত।

জোটে দুর্বল জামায়াত

সিলেট-৩ (দক্ষিণ সুরমা, বালাগঞ্জ, ফেঞ্চুগঞ্জ) আসনে জামায়াত প্রার্থী করেছিল দক্ষিণ সুরমা উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান লোকমান আহমদকে। তবে জোটের কারণে শেষ মুহূর্তে ভোট থেকে সরে দাঁড়াতে হয় তাঁকে। ১১-দলীয় জোটের প্রার্থী করা হয় বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মুসলেহ উদ্দীন রাজুকে।

জামায়াতের নেতা-কর্মীদের ভাষ্য, এই আসনে জামায়াতের ভালো ভোট রয়েছে। বিপরীতে বিএনপির প্রার্থী তুলনামূলক নতুন, প্রবাস থেকে এসে ভোট করছেন। তাই জামায়াতের প্রার্থী থাকলে আসনটিতে জয় পাওয়ার ভালো সম্ভাবনা ছিল। তবে শেষ মুহূর্তে এসে লোকমান মাঠে নামায় পাল্টে যাচ্ছে ভোটের হিসাব।

হবিগঞ্জ-১ আসনে সিলেট মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি মোহাম্মদ শাহজাহান আলী জোটের স্বার্থে শেষ মুহূর্তে সরে দাঁড়ান। এখানে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মুফতি সিরাজুল ইসলাম মিরপুরীকে সমর্থন দিয়েছে জামায়াত। তবে দলটির সমর্থকেরা বলছেন, আসনটিতে খেলাফত মজলিসের তুলনায় জামায়াত অনেক শক্তিশালী। এ ছাড়া বিএনপিতে বিভেদ ও বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় জামায়াতের জেতার সম্ভাবনা ছিল। এখন জোটের প্রার্থী কতটা সুবিধা করতে পারবেন, তা নিশ্চিত নয়।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত