Ajker Patrika

রাজশাহী সিটি করপোরেশন: ঠিকাদারকে বাঁচাতে কর্তাদের ‘বলির পাঁঠা’ বানায় রাসিক

  • মেয়রের ঘনিষ্ঠ হওয়ায় বিদ্যুতের সব কাজ পেতে হ্যারো ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন
  • অর্থ আত্মসাতে যুক্ত ছিলেন তৎকালীন মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন
  • মামলায় আসামি করা হয় বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের
রিমন রহমান, রাজশাহী
রাজশাহী সিটি করপোরেশন: ঠিকাদারকে বাঁচাতে কর্তাদের ‘বলির পাঁঠা’ বানায় রাসিক

আওয়ামী লীগের আমলে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) বিদ্যুতের প্রায় সব কাজই পেত হ্যারো ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন। প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী আশরাফুল হুদা টিটোর সঙ্গে তৎকালীন মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটনের ঘনিষ্ঠ হওয়ায় একচ্ছত্র প্রভাব ছিল তাঁর। নিম্নমানের সড়কবাতি সরবরাহের অভিযোগ উঠলেও দায় ঠিকাদারের ঘাড়ে না গিয়ে চাপানো হয় বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর।

২০২০ সালের ১৯ মে এই ঘটনায় রাসিক মামলা করে। ঠিকাদারকে না জড়িয়ে এতে বিদ্যুৎ বিভাগের তিন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে আসামি করা হয়। পরে ফাঁসানো হয় বিদ্যুৎ বিভাগের তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী গোলাম মুর্শেদকে। আলোচিত এই মামলার সব আসামিকে গত ১৩ মার্চ আদালত খালাস দেন। ওই সময়ে ভয়ে মুখ খুলতে না পারলেও গোলাম মুর্শেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি মামলার পেছনের কারণ জানান।

গোলাম মুর্শেদ জানান, লিটনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকায় একচেটিয়া বিদ্যুৎ বিভাগের কাজ পেতেন টিটো। একবার তিনি চায়না থেকে আনা কিছু সড়কবাতির নমুনা এনে লিটনকে দেখান। তিনি তখন এই সড়কবাতি কেনার জন্য দরপত্র আহ্বান করতে বলেন। দরপত্র আহ্বান করা হলে হ্যারো ইঞ্জিনিয়ারিংই কাজ পায় এবং দেড় হাজার বাতি সরবরাহ করে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এই সড়কবাতিগুলো দেখতে সুন্দর। আলোও ভালো। কিন্তু ব্যালাস্ট ছিল অত্যন্ত দুর্বল। প্রতিরাতেই বেশ কিছু বাতির ব্যালাস্ট পুড়ে যাচ্ছিল। এ অবস্থায় তিনি ঠিকাদারের বিল আটকে দেন। তখনই ঠিকাদারকে বাঁচাতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃতভাবে অতিরিক্ত ভোল্টে দিয়ে সড়কবাতি পুড়িয়ে দেওয়ার মামলা করা হয়।

রাসিকের তৎকালীন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও আইন কর্মকর্তা সমর কুমার পাল বাদী হয়ে মামলাটি করেন। এজাহারে উল্লেখ করা হয়, ২০১৯ সালের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সড়কের বাতি ১০ থেকে ১২ বার পর্যন্ত পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে করপোরেশনের ১ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। মামলায় নিম্নমানের বাতি সরবরাহের বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হয়। পরে ১২ কোটি টাকা বিল তুলে নিয়ে ভাগ-বাঁটোয়ারা করা হয়।

ভুগছেন আট কর্মকর্তা-কর্মচারী

প্রথমে মামলাটি করা হয়েছিল করপোরেশনের স্ট্রিট লাইট মিস্ত্রি মিজানুর রহমান শাহিন, উপসহকারী প্রকৌশলী শফিকুল হাসান ও দৈনিক মজুরিভিত্তিক মিস্ত্রি ইব্রাহিম হোসেনকে আসামি করে। পরে বিল আটকে রাখা প্রকৌশলী গোলাম মুর্শেদকেও অভিযোগপত্রে আসামি করা হয়। মামলাটি প্রথমে থানার পুলিশ এবং পরে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তদন্ত করে। মামলার পর আসামিদের সহযোগিতা করার অভিযোগে চাকরিচ্যুত করা হয় দৈনিক মজুরিভিত্তিক হেলপার শফিকুল ইসলাম, কাজিম উদ্দিন ও মো. মাসুম ও গিয়াস উদ্দিনকে।

যোগাযোগ করা হলে চাকরিচ্যুত অস্থায়ী কর্মচারী শফিকুল ইসলাম ও কাজিম উদ্দিন জানান, ওই সময় দফায় দফায় তাঁদের পিবিআই অফিসে ডাকা হয়েছে। লাইট পোড়ানোর সঙ্গে নির্বাহী প্রকৌশলী গোলাম মুর্শেদ জড়িত বলে তাঁদের সাক্ষী দিতে বলা হয়। কিন্তু তাঁরা মিথ্যা জবানবন্দি দিতে রাজি হননি। এ কারণে তাঁদের নির্যাতন করা হয়। আবার মিথ্যা সাক্ষ্য দিলে চাকরিতে বহাল করারও প্রলোভন দেখানো হয়। কিন্তু তাতেও তাঁরা রাজি হননি। এখন তাঁরা বিনা দোষে চাকরিচ্যুত অবস্থায় আছেন। পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।

আত্মসাতে যুক্ত ছিলেন লিটন

অনুসন্ধানে জানা গেছে, নিম্নমানের সড়কবাতি কিনে বিপুল টাকা আত্মসাতের এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন তৎকালীন মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন, তাঁর এপিএস আব্দুল ওয়াহেদ খান টিটু, তৎকালীন ম্যাজিস্ট্রেট ও মামলার বাদী সমর কুমার পাল, বিদ্যুৎ বিভাগের প্রকৌশলী এ বি এম আসাদুজ্জামান সুইট ও ঠিকাদার টিটো। গণ-অভ্যুত্থানের পর লিটন সপরিবারে ভারতে চলে গেছেন। টিটু এখন কারাগারে। সমর এখন সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব)। এ বি এম আসাদুজ্জামান সুইট রয়েছেন রাসিকের বিদ্যুৎ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে। আর ঠিকাদার টিটো কোথায় তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তাঁর মোবাইল নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সংযোগ পাওয়া যায়নি।

নির্বাহী প্রকৌশলী এ বি এম আসাদুজ্জামান সুইট এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘এসব সত্য না। আমি এখন মিটিংয়ে। পরে কথা বলব।’ মিথ্যা মামলার বাদী সমর কুমার পাল বলেন, ‘সবকিছু বিদ্যুৎ বিভাগের লোকজনই করেছিল। আমি কিছুই জানি না। শুধু আইন কর্মকর্তার পদে থাকার কারণে আমাকে বাদী হতে হয়েছিল।’

রাসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল করিম বলেন, ‘এ বিষয়টা আমরা দেখছি। রায়ের কথা আমরা জেনেছি। পর্যালোচনা করে আমরা এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত