Ajker Patrika

রাবিতে সেশনজট: চার বছরের স্নাতক শেষ করতে লাগছে ৬ বছর

  • বর্তমানে ছয়টি শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের পাঠদান চলছে।
  • ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের চলতি বছর স্নাতক শেষ হওয়ার কথা থাকলেও হয়নি।
দীন ইসলাম, রাবি
রাবিতে সেশনজট: চার বছরের স্নাতক শেষ করতে লাগছে ৬ বছর
ছবি: সংগৃহীত

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) চার বছর মেয়াদি স্নাতক শেষ করতে শিক্ষার্থীদের লাগছে পাঁচ থেকে ছয় বছর। নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষা না হওয়া, ফল প্রকাশে বিলম্ব, একাডেমিক কার্যক্রমে দীর্ঘসূত্রতা এবং শিক্ষক ও শ্রেণিকক্ষের সংকটসহ নানা কারণে সেশনজটে আটকে থাকছেন শিক্ষার্থীরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে ১২টি অনুষদের অধীনে ৫৯টি বিভাগ রয়েছে। অধিকাংশ বিভাগেই নির্ধারিত ব্যাচের তুলনায় বেশি ব্যাচের শিক্ষার্থী একাডেমিক কার্যক্রমে রয়েছেন। কোনো কোনো বিভাগে ছয়টি, আবার কোনো বিভাগে সাতটি ব্যাচের শিক্ষার্থীরা পাঠ নিচ্ছেন।

সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাতটি বিভাগের মধ্যে অর্থনীতি, সমাজকর্ম, সমাজবিজ্ঞান, নৃবিজ্ঞান এবং ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগে সাতটি করে ব্যাচ চলছে। গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা, পপুলেশন সায়েন্সেস এবং শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়া বিজ্ঞান বিভাগে রয়েছে ছয়টি করে ব্যাচ। কলা অনুষদের ইংরেজি, ফোকলোর, ইতিহাস, সংস্কৃত এবং ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগে ছয়টি করে ব্যাচ রয়েছে। উর্দু বিভাগে ছয় থেকে সাতটি এবং নাট্যকলা ও সংগীত বিভাগে সাতটি করে ব্যাচ চলছে।

ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগে সাতটি এবং মার্কেটিং ও ফাইন্যান্স বিভাগে ছয়টি করে ব্যাচ রয়েছে। বিজ্ঞান অনুষদের পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও গণিত বিভাগে ছয়টি করে ব্যাচ চলছে। আইন অনুষদের আইন এবং আইন ও ভূমি প্রশাসন বিভাগেও রয়েছে ছয়টি করে ব্যাচ।

জীববিজ্ঞান অনুষদের ফার্মেসি বিভাগে ছয়টি এবং জিওলজি অ্যান্ড মাইনিং, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি ও মনোবিজ্ঞান বিভাগে সাতটি করে ব্যাচ রয়েছে। এ ছাড়া শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে (আইইআর) সাতটি, কৃষি অনুষদের ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্স বিভাগে সাতটি এবং মাইক্রোবায়োলজি বিভাগে ছয়টি ব্যাচ চলছে।

অন্যদিকে চারুকলা অনুষদের চিত্রকলা, প্রাচ্যকলা ও ছাপচিত্র; মৃৎশিল্প ও ভাস্কর্য এবং গ্রাফিক ডিজাইন, কারুশিল্প ও শিল্পের ইতিহাস বিভাগে সাতটি করে ব্যাচ রয়েছে।

বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২২-২৩, ২০২৩-২৪, ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের পাঠ নেওয়ার কথা। এর আগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের চলতি বছরের শেষ নাগাদ স্নাতকোত্তর শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু অধিকাংশ বিভাগে তাঁরা মাত্র স্নাতকোত্তর পর্যায়ে রয়েছেন। এমনকি কয়েকটি বিভাগে ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরাও এখনো স্নাতকোত্তর পর্যায়ে অধ্যয়নরত। একইভাবে ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের চলতি বছর স্নাতক পর্যায়ের পড়াশোনা শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু অধিকাংশ বিভাগে তাঁরা চতুর্থ বর্ষে রয়েছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থী আসাদ সাদিক রাফি বলেন, ‘চার বছর মেয়াদি অনার্স শেষ করতে আমার ছয় বছর লেগেছে। এখন দুই বছর মেয়াদি মাস্টার্সে প্রায় বছর পার হলেও এখনো প্রথম সেমিস্টার শেষ হয়নি।’

এর পেছনে সময়মতো কারিকুলাম প্রণয়ন না করা, কার্যকর একাডেমিক ক্যালেন্ডার না থাকা, অবকাঠামো ও শিক্ষকসংকট এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়হীনতার পাশাপাশি সেমিস্টার পদ্ধতিকেও বড় কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদের বিভাগে প্রায় এক দশক আগে সেমিস্টার পদ্ধতি চালু করা হয়। এই পদ্ধতিতে একটি সেমিস্টারের ক্লাস, পরীক্ষা ও ফল প্রকাশের জন্য নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে অনেক বিভাগেই সেই সময়সূচি অনুসরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।

শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক ড. আক্তার বানু বলেন, সেমিস্টার পদ্ধতির কারণে ছয় মাসের মধ্যে একটি সেমিস্টার শেষ করে পরীক্ষা নেওয়া এবং ফল প্রকাশ করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। একটি পরীক্ষা শেষ হওয়ার আগেই পরবর্তী পরীক্ষার সময় চলে আসে। ফলে শিক্ষকদের নিয়মিত ক্লাস নেওয়া ও পরীক্ষা গ্রহণ—দুই কাজই অত্যন্ত চাপের মধ্যে করতে হয়।

সেমিস্টার পদ্ধতিতে নির্ধারিত সময়ে শিক্ষা কার্যক্রম শেষ করতে পর্যাপ্ত শিক্ষক ও শ্রেণিকক্ষ থাকাও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে ৩০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক রয়েছেন প্রায় ১ হাজার ২০০ জন। এ হিসাবে প্রতি ২৫ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক রয়েছেন; যা বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশনজটে বিশেষ প্রভাব ফেলছে।

মার্কেটিং বিভাগের সভাপতি ড. এম বোরাক আলী বলেন, বর্তমানে বিভাগে ছয়টি ব্যাচে গড়ে ১১৫ জন করে শিক্ষার্থী রয়েছেন। কিন্তু ছয়টি ব্যাচের জন্য শ্রেণিকক্ষ রয়েছে মাত্র চারটি। প্রতিটি কক্ষে মাত্র ৩৩টি বেঞ্চ রয়েছে, যা পর্যাপ্ত নয়। এতে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে, শিক্ষার্থীদেরও ভোগান্তিতে পোহাতে হচ্ছে।

তবে বর্তমান প্রশাসন দায়িত্ব নিয়েই সেশনজট শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক মামুনুর রশীদ। তিনি বলেন, ‘সেশনজট নিরসনে একাডেমিক শাখা-১ ও উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) দপ্তরের সমন্বয়ে কাজ চলছে। ২০২৪ সালের অপ্রকাশিত ফল প্রকাশে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। আমরা সেশনজটকে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে চাই।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত