Ajker Patrika

জাগের পানির সংকটে দুর্গাপুরের পাটচাষিদের দুর্ভোগ

দুর্গাপুর (রাজশাহী) প্রতিনিধি
জাগের পানির সংকটে দুর্গাপুরের পাটচাষিদের দুর্ভোগ
পানির অভাবে পাট কেটে জমিতে রেখেছেন চাষিরা। রাজশাহী দুর্গাপুর পৌর এলাকার দেবীপুর গ্রামে। ছবি: আজকের পত্রিকা

রাজশাহীর দুর্গাপুরে পাট কাটার কাজ শুরু হলেও জাগ দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় জলাশয়ের সংকটে পড়েছেন চাষিরা। উপজেলার অধিকাংশ পুকুর, ডোবা-নালা ও বদ্ধ জলাশয়ে মাছ চাষ হওয়ায় ভাড়া করে পাট জাগ দিতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দুশ্চিন্তায় রয়েছেন পাটচাষিরা।

উপজেলা মৎস্য অধিদপ্তর জানায়, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় খাস বিল ও জলমহাল রয়েছে প্রায় ৪৭০টি। সেগুলো ইজারা নিয়ে মাছ চাষ করেন ইজারাদারেরা। পদ্মায় পানি বাড়লেও খাল, বিল ও বদ্ধ জলাশয়ে পানি বাড়ে না। কারণ, পদ্মার সঙ্গে উপজেলার খাল, বিল ও বদ্ধ জলাশয়ের কোনো সংযোগ নেই। এ ছাড়া এই উপজেলায় কোনো নদী নেই। এবার ভরা মৌসুমে পর্যাপ্ত বৃষ্টি হয়নি। তা ছাড়া পুকুর, ডোবা-নালা, খাল-বিল ও বদ্ধ জলাশয়গুলোতে মাছ চাষ হচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার সবখানে এখন পাট কেটে আমন ধান রোপণে ব্যস্ত চাষিরা। উপযুক্ত সময়ের মধ্যে ধান লাগাতে না পারলে আমন আবাদ ব্যাহত হতে পারে, এই আশঙ্কায় চাষিরা এখন পাট কেটে জমি খালি করছেন। কিন্তু পাট কাটার পর স্থান ও পানির অভাবে তাঁরা জাগ দিতে পারছেন না। অনেক এলাকায় কাটা পাট পানির অভাবে জমিতেই গাদা গাদা পড়ে থাকতে দেখা গেছে। কিছু কিছু এলাকায় আবার ভ্যানগাড়ি, ভটভটি, নছিমন, করিমনযোগে পাট নিয়ে দূরদূরান্তে পানির খোঁজে ছুটে যেতে দেখা গেছে চাষিদের। ফলে পাট জাগ নিয়ে সীমাহীন দুর্ভোগে পড়েছেন চাষিরা।

দুর্গাপুর কৃষি অধিদপ্তর জানায়, উপজেলায় এবার ২ হাজার ৫২০ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে। যা গত বছর ছিল ১ হাজার ৮৮০ হেক্টর জমিতে। কৃষকেরা জমিতে পেঁয়াজ, আলু ও ভুট্টার পর এবার সবচেয়ে বেশি পাট চাষ করেছেন। প্রথম দিকে অনাবৃষ্টি ও খরার ফলে পাট নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন চাষিরা। তবে পরে কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টি হওয়ায় সবখানের পাটের আবাদ ভালো হয়েছে।

উপজেলার শানপুকুরিয়া গ্রামের পাটচাষি লুৎফর রহমান জানান, বাড়ির পাশে প্রায় ৭টি গ্রাম নিয়ে ডাহারবিল নামের একটি বিল রয়েছে। সেখানে বিগত বছরগুলোতে সব গ্রামের চাষিরা বাধাহীনভাবে পাট জাগ দিতেন। বর্তমানে ওই ডাহারবিলে বিপুলসংখ্যক পুকুর খনন এবং খাস জায়গাটুকু লিজ দেওয়ায় পাট জাগের আর কোনো জায়গা নেই। ফলে ৭টি গ্রামের পাটচাষিরা পাট জাগ নিয়ে বিপাকে রয়েছেন বলে জানালেন তিনি।

দেবীপুর গ্রামের আইয়ুব আলী বলেন, ‘আমাদের মরাবিলে পুকুর খনন করার ফলে অবশিষ্ট জায়গা নেই। তা ছাড়া এখান থেকে বিলটি অনেক দূরে হওয়ায় বাধ্য হয়ে প্রায় ১ বিঘা জমির পাট ৩০০ টাকা দিয়ে পানি ভাড়া নিয়ে জাগ দিয়েছি।’

একই গ্রামের শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘মাছ চাষের পুকুরে পাট জাগ দিলে পানির গুণগত মান নষ্ট হয়। ফলে মাছের খাদ্যসংকট দেখা দেয়। এ জন্য আমরা মাছের খাদ্যের দাম হিসেবে কিছু টাকা নিয়ে থাকি।’

পাঁচুবাড়ী গ্রামের মোহাম্মদ আলী জানান, ২ বিঘা ৮ কাঠা জমিতে তিনি পাট বোপণ করেছেন। তাঁর নিজস্ব কোনো পুকুর নেই। এলাকায় ফাঁকা ডোবা-নালাও নেই। পাট জাগের জন্য অন্যের পুকুরে চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন। এতে তাঁর ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা বাড়তি খরচ গুনতে হবে।

হাটকানপাড়া এলাকার বাবর আলী বলেন, ‘পাট চাষ করে লাভের আশা করেছিলাম। কিন্তু লাভের মুখ দেখার আগেই দুর্ভোগ নেমে এসেছে। পানির অভাবে পাট কেটে জমি থেকে ২-৩ কিলোমিটার দূরে জাগ দেওয়ার জন্য গাড়িবহরে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এতে পাট চাষ করে যে লাভ হতো, তার অর্ধেক টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে পাট জাগ দেওয়ার কাজে।’

এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাহানা পারভীন লাবণী বলেন, ‘চাষিরা পাট কাটতে শুরু করেছেন। কিন্তু অধিক মাত্রায় পুকুর খনন ও পড়ে থাকা ডোবাগুলোতে মাছ চাষ করায় পাট জাগে জায়গা সংকটের অভিযোগ শুনেছি।’ অল্প পানিতে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পাট জাগ সম্পর্কে চাষিদের কৃষি অফিসের পরামর্শ গ্রহণের আহ্বান জানান এই কর্মকর্তা।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত