Ajker Patrika

নারী দিবস: অনুপ্রেরণার নাম হয়ে উঠেছেন অনুজা

­­শাহীন রহমান, পাবনা
নারী দিবস: অনুপ্রেরণার নাম হয়ে উঠেছেন অনুজা
অনুজা সাহা এ্যানি। ছবি: আজকের পত্রিকা

এমএসসি পাস করে বিভিন্ন স্থানে ঘুরেছেন একটি চাকরির আশায়। কিন্তু ভাগ্য সদয় হয়নি। এরপর চাকরির আশা ছেড়ে নিজেই কিছু করার সিদ্ধান্ত নেন। মাত্র ১ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে শুরু করেন বাড়িতে তৈরি করা খাবার বিক্রি। আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। আজ তিনি একজন সফল নারী উদ্যোক্তা। আত্মনির্ভরশীল হয়ে ওঠার এমন অনুকরণীয় দৃষ্টান্তের গল্প পাবনার অনুজা সাহা এ্যানির (৩৫)। নিজের কাজের মাধ্যমে নিজে যেমন সংসারে সচ্ছলতা এনেছেন, তেমনি অনেক নারীর কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়েছেন তিনি। অনেক নারীর জন্য হয়েছেন এক অনুপ্রেরণার নাম। তাঁর দেখানো পথ ধরে আজ পাবনার অনেকেই উদ্যোক্তা হয়ে স্বাবলম্বী হয়েছেন।

পাবনা শহরের গোপালপুর মহল্লার অমূল্য কুমার সাহা ও অঞ্জনা সাহার একমাত্র সন্তান অনুজা সাহা এ্যানি। ২০০৪ সালে এইচএসসি পাস করার পর বিয়ে হয়ে যায় তাঁর। একসময় কোলজুড়ে আসে সন্তান। স্বামী বিল্পব কুমারের ব্যবসা ভালো চলছিল না। সংসারজীবনে আর্থিক চাপে পড়েন অনুজা সাহা। এর মধ্যেই ২০০৬ সালে এইচএসসি এবং ২০১২ সালে এমএসসি পাস করেন তিনি। এরপর বিভিন্ন স্থানে চেষ্টা করেও চাকরি হয়নি।

পত্রিকায় দেশের বিভিন্ন স্থানের নারী উদ্যোক্তার গল্প পড়ে উদ্ধুদ্ধ হন অনুজা। চাকরির আশা ছেড়ে দিয়ে ব্যবসা শুরুর পরিকল্পনা করেন তিনি। মায়ের সহযোগিতায় এক হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে ক্ষুদ্র পরিসরে খাবারের হোম ডেলিভারি সার্ভিস চালু করেন তিনি। তারপরই ঘুরতে থাকে ভাগ্যের চাকা। ধীরে ধীরে তাঁর ব্যবসার প্রসার ঘটেছে। পুঁজির পরিমাণও বেড়েছে। ১৪ বছরে আজ তিনি একজন সফল ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তা। এই সময়ে তিনি আরও ৪০ থেকে ৫০ জন নারীকে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছেন।

বর্তমানে সংসারের খরচ চালিয়ে, কর্মচারীদের বেতন দিয়ে মাস শেষে ভালো আয় করছেন তিনি। এখানেই থেমে নেই অনুজা। বিসিক, যুব উন্নয়ন, মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর থেকে ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তা হিসেবে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। এর মধ্যে ‘মায়ের পরশ নামের একটি রেস্টুরেন্ট করেছেন অনুজা। দরিদ্র মানুষের স্বল্পমূল্যে খাবার বিক্রি করে সবার কাছে পরিচিত মুখ তিনি।

আলাপকালে অনুজা বলেন, ‘মা প্রথমে ব্যবসা করার ব্যাপারে অনাগ্রহী ছিলেন। সংসারজীবনের নির্মম বাস্তবতার কশাঘাতে মেয়ে যখন জর্জরিত, মা তখন সম্মতি দেন ব্যবসা করার। মা ছিলেন সুদক্ষ একজন রাঁধুনি। তাঁর কাছে রান্না শিখে খাবারের হোম ডেলিভারি সার্ভিস চালু করে বেশ পরিচিতি পাই। হোম ডেলিভারি সার্ভিস থেকে নানা ধরনের পিঠা, কেক, মিষ্টি, বেকারি আইটেম, সাদা ভাত, বিরিয়ানি সরবরাহ শুরু হয় পাবনার নানা স্থানে।’

অনুজা বলেন, ‘গত ১৪ বছর নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে সবার দোয়া ও ভালোবাসায় ব্যবসা করে যাচ্ছি। উদ্যোক্তা মেলা করেছি। নিজে যেমন স্বাবলম্বী হয়েছি, তেমনি আমার সাথে এখন কাজ করা অন্তত ১০ জন শ্রমিকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে। ভবিষ্যতে ব্যবসাটাকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যেতে চাই। আরও অনেক মানুষের কর্মসংস্থান দিতে চাই। আর মেয়েদের বলব, কোনো কাজই ছোট নয়, ভয় পেয়ে বসে থাকলে চলবে না। পরিশ্রম করতে হবে, লেগে থাকতে হবে। সফলতা আসবেই।’

অনুজার স্বামী বিপ্লব কুমার বলেন, ‘আমার ব্যবসার অবস্থা খারাপ হয়ে যাওয়ায় দুজন দিশেহারা হয়ে পড়েছিলাম। কী করব ভেবে পাইনি। তখন অনুজা সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যবসা শুরু করে। প্রথম দিকে আমি ভয় পেয়েছিলাম, পারবে তো? ধীরে ধীরে ব্যবসা ভালো চলায় তার পাশে থেকে সহযোগিতা করে যাচ্ছি। ভবিষ্যতে পাবনাবাসীকে আরও ভালো মানের খাবার সরবরাহ করতে চাই।’

অনুজার বিষয়ে পাবনার মানবাধিকারকর্মী কামাল সিদ্দিকী বলেন, ‘অনুজা সাহা এ্যানির লড়াই শুরু থেকে দেখছি। তাঁর বাবা অবসরপ্রাপ্ত স্বনামধন্য শিক্ষক। মেয়েকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। কিন্তু তাঁর স্বপ্ন পূরণ না হলেও অনুজা আজ তাঁদের মুখ উজ্জ্বল করেছেন। বৃদ্ধ বাবা-মাকে দেখভাল করছেন। সমাজে আর দশজন নারীর জন্য অনুকরণীয় হয়ে উঠেছেন। বিন্দু থেকে সিন্ধু হয়েছেন তিনি। তাঁর জন্য আরও সাফল্য কামনা করি।’

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ পাবনা শাখার সভাপতি অ্যাডভোকেট কামরুন্নাহার জলি বলেন, ‘অনুজা সাহা এ্যানি একজন খুবই সফল নারী উদ্যোক্তা। তাঁকে দেখে পাবনার অনেক নারী উদ্যোক্তা হয়েছেন। তাঁর পাশে থেকে বাবা-মা, স্বামীও সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে তিনি একজন অনুসরণীয়। নারীরা আর পিছিয়ে নেই। অনুজার মতো অন্যান্য নারীরাও সমাজে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করুক, এই প্রত্যাশা করি।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত