Ajker Patrika

আগামীকাল দেশে ফিরছে নওগাঁর ৫ প্রবাসীর মরদেহ, শোকের মাঝেও ঋণের চাপ

নওগাঁ প্রতিনিধি
আগামীকাল দেশে ফিরছে নওগাঁর ৫ প্রবাসীর মরদেহ, শোকের মাঝেও ঋণের চাপ
সৌদি আরবের রিয়াদে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারানো নওগাঁর পাঁচ যুবক। ছবি: সংগৃহীত

অবশেষে শেষ হচ্ছে দীর্ঘ অপেক্ষা ও অনিশ্চয়তার প্রহর। সৌদি আরবের রিয়াদে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারানো নওগাঁর বাকি পাঁচ প্রবাসীর মরদেহ আগামীকাল শনিবার (৩১ অক্টোবর) দেশে ফিরছে। আড়াই মাস পর প্রিয়জনের নিথর দেহ ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় স্বজনদের মধ্যে যেমন শোকের ছায়া ঘনীভূত হয়েছে, তেমনি মহাজন ও এনজিওর ঋণের চাপে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন নিহতদের অসহায় পরিবারগুলো। প্রিয়জন হারানোর শোকের সঙ্গে এখন তাঁদের সামনে বড় হয়ে উঠেছে দেনা পরিশোধের অনিশ্চয়তা।

রিয়াদে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত হওয়া বাকি পাঁচ প্রবাসীর মরদেহ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বিজি-৩৩৬ নম্বর ফ্লাইটে শনিবার সকাল ৮টা ৫ মিনিটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।

মোবাইলে ছেলের ছবির দিকে তাকিয়ে কাঁদছেন মধ্যবোয়ালিয়া গ্রামের নিহত মিনহাজের মা পারুল আক্তার। ছবি: আজকের পত্রিকা
মোবাইলে ছেলের ছবির দিকে তাকিয়ে কাঁদছেন মধ্যবোয়ালিয়া গ্রামের নিহত মিনহাজের মা পারুল আক্তার। ছবি: আজকের পত্রিকা

দেশে ফিরতে যাওয়া পাঁচ প্রবাসী হলেন—নওগাঁ পৌর এলাকার পার-নওগাঁ মহল্লার শাহিন, আত্রাই উপজেলার ডুবাই গ্রামের হাসিবুল হাসান শুভ, মধ্যবোয়ালিয়া গ্রামের মিনহাজ প্রামাণিক, মাধবপুর গ্রামের মাসিদুল সরদার সজিব এবং সাধনগর গ্রামের সাগর আলী।

গত ৯ আগস্ট সৌদি আরবের রিয়াদে একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১৬ জন বাংলাদেশি প্রবাসী প্রাণ হারান। তাঁদের মধ্যে ১২ জনই ছিলেন নওগাঁ জেলার বাসিন্দা। গত ২৭ আগস্ট প্রথম দফায় সাতজনের মরদেহ দেশে আনা হলেও আইনি প্রক্রিয়া ও পরিচয় শনাক্তকরণ জটিলতায় বাকি পাঁচজনের মরদেহ সৌদির হিমঘরে পড়ে ছিল।

প্রিয়জনের মুখটি শেষবারের মতো দেখার আকুতি নিয়ে এতদিন প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন স্বজনেরা। আত্রাইয়ের সত্তরোর্ধ্ব মজনু সরদার ও ছাইদা বেগম দম্পতি ছেলে মাসিদুল সরদারের মরদেহের খোঁজে প্রতি সপ্তাহে লাঠিতে ভর দিয়ে ছুটে যেতেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে। অশ্রুসিক্ত চোখে মজনু সরদারের আকুতি ছিল, মৃত্যুর আগে অন্তত ছেলের মুখটি শেষবারের মতো দেখতে চান। অবশেষে তাঁদের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হতে যাচ্ছে।

আত্রাইয়ের সাধনগর গ্রামে নিহত সাগর আলীর পরিবার। ছবি: আজকের পত্রিকা
আত্রাইয়ের সাধনগর গ্রামে নিহত সাগর আলীর পরিবার। ছবি: আজকের পত্রিকা

অন্যদিকে, মধ্যবোয়ালিয়া গ্রামের পারুল আক্তার ফোনে ছেলের মিনহাজের ছবি দেখে অশ্রু ঝরিয়েছেন এতদিন। সন্তান হারানোর বেদনায় তাঁর বুকজুড়ে এখন শুধুই শূন্যতা।

ভিটেমাটি বন্ধক, ঋণের বোঝায় অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

মরদেহ দেশে ফেরার খবরে স্বজনদের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটলেও পরিবারগুলোর সামনে দেখা দিয়েছে নতুন সংকট। বিদেশে ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় ভিটেমাটি বন্ধক রেখে কিংবা চড়া সুদে ঋণ নিয়ে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন নিহত প্রবাসীরা। তাঁদের স্বপ্ন অগ্নিকাণ্ডে শেষ হলেও দেশে রয়ে গেছে ঋণের বিশাল বোঝা।

আত্রাই উপজেলার সাধনগর গ্রামের নিহত সাগর আলীর স্ত্রী পারভীন খাতুন জানান, মাত্র ছয় মাস আগে স্বামীকে সাড়ে ছয় লাখ টাকা ঋণ করে সৌদি আরবে পাঠিয়েছিলেন। পরিবারের একমাত্র সম্বল ভিটেবাড়িটিও মহাজনের কাছে বন্ধক রয়েছে। এরই মধ্যে ঋণের এক লাখ টাকাও পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি। দুই অবুঝ সন্তানকে নিয়ে এখন পাওনাদারদের তাগাদায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তিনি।

এ বিষয়ে আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মনিরুজ্জামান জানান, আইনি প্রক্রিয়া ও ডিএনএ পরীক্ষা সম্পন্ন হওয়ার পর প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের সমন্বয়ে দ্রুত মরদেহগুলো দেশে আনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সরকারি আর্থিক সহায়তা দেওয়ার প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত