Ajker Patrika

ময়মনসিংহে হাম উপসর্গে আরেক শিশুর মৃত্যু: অতিরিক্ত ব্যয়, ভোগান্তি ও আতঙ্কে স্বজনেরা

ময়মনসিংহ প্রতিনিধি
ময়মনসিংহে হাম উপসর্গে আরেক শিশুর মৃত্যু: অতিরিক্ত ব্যয়, ভোগান্তি ও আতঙ্কে স্বজনেরা
হামে আক্রান্ত শিশুকে নিয়ে আতঙ্ক কাটছে না পারভেজ ও রুপা আক্তার দম্পতির। গতকাল ময়মনসিংহ মেডিকেলে। ছবি: আজকের পত্রিকা

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে হাসপাতালটিতে ২৮ শিশুর মৃত্যু হলো। সাত মাস বয়সী মারা যাওয়া শিশুটিকে ৮ মে ভর্তি করা হয়েছিল। আজ সোমবার (১১ মে) ভোর ৬টার দিকে তার মৃত্যু হয়।

ময়মনসিংহের হাম পরিস্থিতি প্রতিনিয়ত উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়াচ্ছে শিশুর অভিভাবক ও স্বজনদের। যার ফলে অতিরিক্ত ব্যয়ের পাশাপাশি তাদের পোহাতে হচ্ছে ভোগান্তি। আদরের শিশুটির শারীরিক অবস্থা একটু খারাপ হলেই অভিভাবকেরা ছুটছেন এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে। সংক্রমণ ব্যাধি হাম কেড়ে নিচ্ছে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন।

কিশোরগঞ্জের কটিয়ার ভবানীপুর গ্রামে গত বছরের ২৪ মে জন্ম নেওয়া মেহেদী হাসান দেড় মাস আগে জ্বর-সর্দিতে আক্রান্ত হয়। এরপর শরীরে হামের উপসর্গ পায় চিকিৎসকেরা। তারপর তাকে ভর্তি করা হয় কিশোরগঞ্জের জহিরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে নেওয়া হয় সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানেও আশানুরূপ চিকিৎসা না মেলায় গত শনিবার ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয় শিশুটিকে। এতে অতিরিক্ত ব্যয়ের পাশাপাশি একমাত্র সন্তানকে সারিয়ে তুলতে ভোগান্তির কথা জানান রাজমিস্ত্রি মনোয়ার হোসেন ও তাঁর স্ত্রী বৃষ্টি আক্তার।

শিশুটির বাবা মনোয়ার হোসেন বলেন, ‘সন্তান অসুস্থ হলে টাকা মুখ্য হয়ে দাঁড়ায় না। সে জন্মের পর থেকেই নানা রোগে আক্রান্ত। হামে তার অবস্থা আরও খারাপ করে দিছে। সারাক্ষণ সে অস্থিরতার মধ্যে কাটায়। কিশোরগঞ্জের দুই মেডিকেলে যখন তাকে ভর্তি করিয়েছিলাম তখন সমস্ত ওষুধ বাইর থেকে আমাদের কিনতে হয়েছে। তবে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল আসার পর থেকে শুধু দুটি ওষুধ বাইর থেকে কিনতে হয়েছে। বাকিগুলো এখান থেকেই পাওয়া যাচ্ছে। গত দেড় মাসে তার পেছনে ৪০ হাজার টাকার মতো খরচ হয়েছে।’

শিশুটির মা বৃষ্টি আক্তার বলেন, ‘আমরার স্বামী-স্ত্রীর বয়স কিছুটা কম। তাই শিশু জন্মের পর থেকেই তার খিঁচুনি। এখন হামে অবস্থা আরও খারাপ। দেড় মাস আগে প্রথমে জ্বর, পরে চোখ ওঠে। সুস্থ হওয়ার পাঁচ দিন পর হয় নিউমোনিয়া। তারপর ধরা পড়ে হাম। শিশুকে নিয়ে দৌড়ঝাঁপে ভোগান্তির পাশাপাশি টাকাও খরচ হচ্ছে। এতে আমাদের মতো পরিবার হাঁপিয়ে উঠছি।’

আদরের সন্তানকে সারিয়ে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন মনোয়ার ও বৃষ্টি। ছবি: আজকের পত্রিকা
আদরের সন্তানকে সারিয়ে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন মনোয়ার ও বৃষ্টি। ছবি: আজকের পত্রিকা

তাঁদের মতো গাজীপুরের শ্রীপুরের গড়গড়িয়া মাস্টার বাড়ির দোকানি পারভেজ মোশাররফ ও তাঁর স্ত্রী রুপা আক্তার তাঁদের একমাত্র সন্তান দেড় বছরের রাফসান আয়ারের জীবন রক্ষায় নাওয়াখাওয়া বাদ দিয়ে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে অবিরাম ছুটছেন। সবশেষ ৫ মে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে রাফসানকে ভর্তি করানো হয়।

শিশুটির বাবা পারভেজ মোশারফ বলেন, ‘গত মাসের মাঝামাঝি সময়ে রাফসান জ্বর থেকে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়। তখন তাকে নিয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঁচ দিন ভর্তি ছিলাম। তারপর ২৬ এপ্রিল ছেলেকে হামের টিকা দেওয়া হয়। পরে জ্বর আসলে মাওনা আল হেরা হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে দুই দিন থাকলে পরে বাড়িতে নেওয়া হয়। বাড়িতে নেওয়ার তিন দিন পর আবার জ্বর আসে। আবারও আল হেরা হসপিটালে তিন দিন থাকি। পরে তার অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকেরা ময়মনসিংহে স্থানান্তর করে। এখনো তার কাঁপন দিয়ে জ্বর আসে। তবে আগের চেয়ে একটু ভালো মনে হচ্ছে। আমাদের সন্তানটা শুধু সুস্থ হোক—এটাই আল্লাহর কাছে চাওয়া।’

শিশুটির মা রুপা আক্তার বলেন, ‘সন্তান অসুস্থ থাকলে মায়ের অবস্থা শুধু মায়ই বলতে পারে কেমন লাগে। গত এক দেড় মাস ধরে সবকিছু বাদ দিয়ে ছেলের পেছনেই পড়ে আছি। সন্তান সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত কোনো শান্তি আসবে না।’

কিছুটা ভোগান্তির কথা স্বীকার করে আইসিইউ না থাকায় শিশু মৃত্যু বাড়ছে বলে জানান হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডের ফোকালপারসন শিশু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহা. গোলাম মাওলা। তিনি বলেন, ওষুধ যতটুকু সম্ভব হাসপাতাল থেকে দেওয়া হচ্ছে। খুব বেশি ওষুধ বাইর থেকে কিনতে হচ্ছে না। এই সময়ে আইসিইউ খুব বেশি প্রয়োজন ছিল। তাহলে হয়তো এত শিশুর মৃত্যু না-ও হতে পারত। তবে শিশুদের আইসিইউ স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে। সেটি হলে এই অঞ্চলের শিশুরা আরও সুরক্ষিত থাকবে।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান বলেন, গত ১৭ মার্চ থেকে ১১ মে সকাল ৮টা পর্যন্ত হামের লক্ষণ নিয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেলে ভর্তি হয় ১ হাজার ২৪৪ শিশু। এর মধ্যে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পায় ১ হাজার ১২৭ শিশু, মৃত্যু হয়েছে ২৮ শিশুর। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ভর্তি হয়েছে ২৪ শিশু, হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছে ৩৫ শিশু। ৬৪ শয্যার ওয়ার্ডে ভর্তি রয়েছে ৮৯ শিশু।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

বিজয়ের শপথ অনুষ্ঠানে অনুপস্থিত স্ত্রী-সন্তানেরা, অভিনেত্রী তৃষাকে নিয়ে জল্পনা

পুলিশি তদন্তে সরকারি প্রাথমিকে নির্বাচিত ১৪ হাজার শিক্ষক

পুলিশ সদস্যদের ওভারটাইম ভাতা দেওয়ার পরিকল্পনা সরকারের

চট্টগ্রামে পীরের দরবারের দৃশ্যকে ভারতে মসজিদে নামাজে ব্যাঘাত সৃষ্টি দাবিতে প্রচার

মরুভূমিতে গোপনে ঘাঁটি করেছে ইসরায়েল—জানে না ইরাক

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত