Ajker Patrika

মৌলভীবাজার জেনারেল হাসপাতাল: চিকিৎসক অর্ধেক, বন্ধ আইসিইউ

  • ৮৪ জন চিকিৎসকের পদ থাকলেও কর্মরত আছেন অর্ধেক।
  • এক যুগেও চালু হয়নি আইসিইউ ও সিসিইউ।
  • এক্স-রে ও আলট্রাসনোগ্রাফি সপ্তাহের নির্দিষ্ট কয়েক দিন ছাড়া বন্ধ থাকছে।
  • কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিস সংকটও তীব্র, বন্ধ রয়েছে এমআরআই সেবা।
মাহিদুল ইসলাম, মৌলভীবাজার
মৌলভীবাজার জেনারেল হাসপাতাল: চিকিৎসক অর্ধেক, বন্ধ আইসিইউ
ছবি: আজকের পত্রিকা

মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল চিকিৎসকসহ জনবল এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্র ও সরঞ্জামসংকটে খুঁড়িয়ে চলছে। ৮৪ জন চিকিৎসকের পদ থাকলেও কর্মরত আছেন অর্ধেক।

২৫০ শয্যায় উন্নীত হওয়ার পর নতুন ভবনে চিকিৎসাসেবার কার্যক্রম শুরুর এক যুগেও নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) ও সিসিইউ চালু হয়নি। টেকনোলজিস্টের অভাবে রোগনির্ণয়ের বিভিন্ন পরীক্ষা, এক্স-রে ও আলট্রাসনোগ্রাফি সপ্তাহের নির্দিষ্ট কয়েক দিন ছাড়া বন্ধ থাকছে। কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিস সংকটও তীব্র আকার ধারণ করেছে। বন্ধ রয়েছে এমআরআই সেবা।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ২১ লাখ মানুষের বসবাস করা জেলাটির সর্বোচ্চ হাসপাতালটিতে ২৫০ শয্যার হলেও প্রতিদিন ৪৫০ থেকে ৫০০ রোগী ভর্তি থাকছে। ফলে বিভিন্ন বিভাগের মেঝেতে বিছানা পেতে এসব রোগীকে চিকিৎসাসেবা নিতে হচ্ছে। এ ছাড়া বহির্বিভাগে প্রতিদিন অন্তত ১ হাজার ৬০০ রোগী চিকিৎসা নিতে আসে। মাত্র ৪২ জন চিকিৎসক দিয়ে এতসংখ্যক রোগীর সেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ১০০ শয্যা থেকে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করার পর ২০১২ সালে নির্মিত নতুন ভবনে কার্যক্রম শুরু হয়। বর্তমানে হাসপাতালে ৮৪ জন চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও ৭ জন সিনিয়র কনসালট্যান্টসহ ৪২ জন চিকিৎসকের পদ ফাঁকা রয়েছে। একই সঙ্গে টেকনোলজিস্ট ও নার্সেরও সংকট রয়েছে। ১৪ জন টেকনোলজিস্টের মধ্যে কর্মরত আছেন ৯ জন। সব মিলিয়ে ৪০৮টি পদের বিপরীতে চিকিৎসকসহ বিভিন্ন ক্যাটাগরির ১০৩টি পদ শূন্য আছে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ২০১২ সালে নতুন ভবন নির্মাণের সময় আইসিইউ ও সিসিইউ চালুর জন্য ২০ শয্যা রাখলেও চিকিৎসক ও সরঞ্জামের অভাবে তা চালু করা হয়নি। এগুলো চালু করার জন্য কোনো ধরনের সরঞ্জাম নেই এখনো। ২০২১ সাল থেকে এমআরআই মেশিন নষ্ট হওয়ায় এই সেবা পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।

প্যাথলজিক্যাল মাত্র ১২টি পরীক্ষা নিয়মিত করা হয়। কনসালট্যান্ট ও টেকনোলজিস্টের অভাবে সপ্তাহে তিন দিন এক্স-রে, দুই দিন সিটি স্ক্যান এবং চার দিন আলট্রাসনোগ্রাফি সেবা চালু থাকে। এই কাজে নিয়োজিত একজন কনসালট্যান্ট না থাকায় পুরো সপ্তাহ এসব সেবা দেওয়া যাচ্ছে না।

সম্প্রতি সরেজমিনে রোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় অর্ধেক চিকিৎসক থাকায় বহির্বিভাগে প্রতিদিনই রোগীদের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সারিতে দাঁড়িয়েও অনেক সময় চিকিৎসকের দেখা মিলছে না। কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিসের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় রাসায়নিক দ্রব্যের সংকট রয়েছে। পর্যাপ্ত মেশিন না থাকায় প্রায় ২০০ জন ডায়ালাইসিস রোগী অপেক্ষায় থাকছেন।

হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিতে আসা পারুল বেগম বলেন, ‘মেডিসিনের অভাব থাকায় আমার ব্লাড টেস্ট করা হয়নি। এই হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা ছাড়া আর কোনো চিকিৎসা নেই। সামান্য কিছু হলেই সিলেটে রেফার করা হয়। আমরা চিকিৎসাসেবা থেকে চরম বঞ্চিত হচ্ছি। টাকা দিয়েও ভালো চিকিৎসা পাচ্ছি না।’

আলতা মিয়া নামের একজন কিডনি রোগী বলেন, ‘ডায়ালাইসিসের জন্য যোগাযোগ করেছিলাম। তবে এখানে শিডিউল পাইনি। এখানে এমআরআই, সিসিইউ, আইসিইউ সেবা একেবারে নেই।’

আরেক রোগীর স্বজন ইয়ামিন মিয়া বলেন, ‘আমার শাশুড়িকে নিয়ে হাসপাতালে গিয়েছিলাম। তাঁর আলট্রাসনোগ্রাফির প্রয়োজন ছিল, কিন্তু এই সেবা এসে বন্ধ পেয়েছি। পরে বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিতে হয়েছে।’

শাকের আহমেদ নামের এক রোগীর স্বজন বলেন, ‘আমার খালার কিডনির সমস্যার কারণে ডায়ালাইসিস করাতে হয়েছে। ঢাকায় এক মাস ডায়ালাইসিস করানোর পর মৌলভীবাজার হাসপাতালে এসে বারবার যোগাযোগ করেছি, তবে সিরিয়াল পাইনি। পরে টাকার অভাবে অনিয়মিত প্রাইভেট হাসপাতালে কিছুদিন ডায়ালাইসিস করিয়েছি। শেষমেশ ডায়ালাইসিস নিয়মিত করাতে না পারায় তিনি মারা গেছেন।’

মৌলভীবাজার জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক প্রণয় কান্তি দাস আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘হাসপাতালে নানা সংকট থাকলেও আমরা সেগুলোর সমাধানে কাজ করছি। একই সঙ্গে বিষয়গুলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাচ্ছি। তবে ২৫০ শয্যার হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০০ জন রোগী ভর্তি থাকে। জনবলসংকট নিয়ে এসব রোগীর চাপ সামাল দেওয়া অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত