Ajker Patrika

ভবিষ্য তহবিলে টাকা দিচ্ছেন না ৫৮ মালিক

  • ৫৮টি বাগানের প্রায় ৫০ হাজার শ্রমিকের অংশ কেটে নেওয়া হলেও জমা পড়েনি ব্যাংকে
  • শ্রমিক ও মালিকপক্ষের মিলিয়ে তহবিলে শতকোটি জমা হওয়ার কথা ছিল
  • ২ থেকে ১০ মাস পর্যন্ত তহবিলের টাকা বকেয়া
মৌলভীবাজার প্রতিনিধি
আপডেট : ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৮: ০৪
ভবিষ্য তহবিলে টাকা দিচ্ছেন না ৫৮ মালিক
প্রতীকী ছবি

প্রভিডেন্ট ফান্ড বা ভবিষ্য তহবিলে চা-শ্রমিকদের মজুরি থেকে নির্ধারিত অংশ কেটে নেওয়া হলেও অনেক বাগানমালিক ওই টাকাসহ তাঁদের অংশ তহবিলে জমা করছেন না। ৩ থেকে ১০ মাস পর্যন্ত জমা না পড়ায় বাকি পড়েছে প্রায় শতকোটি টাকা। এতে চরম অনিশ্চয়তায় রয়েছেন এসব চা-বাগানের প্রায় ৫০ হাজার শ্রমিক।

চা-শ্রমিক সংগঠন সূত্রে জানা গেছে, সারা দেশে ১৬৭টির মতো বাগানে নিয়মিত-অনিয়মিত মিলে প্রায় দেড় লাখ চা-শ্রমিক কাজ করেন। এর মধ্যে প্রায় ৫৮টি বাগানমালিক ভবিষ্য তহবিলের টাকা জমা দিচ্ছেন না। ফলে অবসরের পর কিংবা জরুরি প্রয়োজনে নিজেদের জমা করা টাকা পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে চা-শ্রমিকদের মধ্যে।

শ্রমিকনেতারা জানান, চা-শ্রমিকদের টাকা মাসের শেষে ঠিকই কেটে নেওয়া হয়। অথচ বাগানমালিকেরা তাঁদের অংশের টাকা নিয়মিত ব্যাংকে জমা করেননি। শ্রমিকের টাকা দিয়ে মালিকেরা ব্যবসা করেন আবার শ্রমিকেরা সময়মতো টাকা পান না।

চা শ্রমিক ভবিষ্য তহবিল নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, নিয়মিত চা-শ্রমিকদের বেতনের ৭.৫ শতাংশ কেটে নেওয়া হয়। বাগান কর্তৃপক্ষ আরও ৭.৫ শতাংশ দিলে মোট ১৫ শতাংশ অর্থ তহবিলে জমা হওয়ার কথা। শ্রমিক ও মালিকপক্ষের দেওয়া ১৫ শতাংশ জমা টাকার ওপর আরও ১৫ শতাংশ অর্থ বাগান কর্তৃপক্ষকে প্রশাসনিক ব্যয় হিসেবে একত্রে জমা দিতে হয়।

ওই সূত্রে আরও জানা যায়, শ্রম অধিদপ্তরের অতিরিক্ত সচিবকে চেয়ারম্যান করে গঠিত একটি ট্রাস্টি বোর্ড এই ভবিষ্য তহবিল পরিচালনা করে। বোর্ডে চা-বাগান মালিকপক্ষের তিনজন, চা স্টাফ অ্যাসোসিয়েশন থেকে একজন, চা শ্রমিক ইউনিয়ন থেকে দুজন প্রতিনিধি এবং চা-শিল্পবহির্ভূত দুজন স্বতন্ত্র বিশিষ্ট ব্যক্তি অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।

নিয়ন্ত্রক কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, শ্রমিকদের পক্ষে বোর্ড অনাদায়ি বকেয়া আদায়ে বাগানমালিকদের সঙ্গে দেনদরবার ও মামলা বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। ভবিষ্য তহবিল নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের ২৮ ফেব্রুয়ারির হালনাগাদ তথ্যে দেখা গেছে, ৫৮টি চা-বাগানের মালিকপক্ষ ভবিষ্য তহবিলে টাকা জমা দেয়নি।

শ্রমিক ইউনিয়ন ও চা-বাগান স্টাফ অ্যাসোসিয়েশনের সূত্র বলছে, এই বকেয়ার পরিমাণ শতকোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। চা-শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলেছেন, কিছু বাগানে আর্থিক সংকটের কারণে ভবিষ্য তহবিলের টাকা সময়মতো জমা হয়নি। আবার কোথাও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও তদারকির অভাবও দায়ী বলে মনে করছেন শ্রমিকনেতারা।

চা-শ্রমিক ইউনিয়নের সহসভাপতি পঙ্কজ কুন্দ বলেন, ‘চা-শ্রমিকদের আয় এমনিতেই কম। তার মধ্যেও সামান্য টাকা প্রভিডেন্ট ফান্ডে জমা রাখা হয়, সেটিও পাওয়া যদি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তবে শ্রমিকদের জীবনে বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি করবে। এ নিয়ে আমরা মালিকপক্ষ ও তহবিল নিয়ন্ত্রকের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে যাচ্ছি।’

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রামভজন কৈরি বলেন, ‘নিয়ম হলো ভবিষ্য তহবিলের টাকা প্রতি মাসে মাসে জমা করা। অথচ শ্রমিকের অংশের টাকা ঠিকই কেটে নেওয়া হয়। এই টাকা ও মালিকপক্ষের টাকা ফান্ডে জমা হওয়ার কথা থাকলেও কোনো কর্তৃপক্ষ দু-তিন মাস, আবার কেউ ১০ মাসেও টাকা জমা দেয়নি। এই টাকা সময়মতো জমা হলে ইন্টারেস্টের টাকাও বৃদ্ধি হতো। তবে দুঃখের বিষয় সময়মতো শ্রমিকেরা টাকা পায় না আবার টাকা জমাও হয় না।’

বকেয়া তালিকায় থাকা সাতগাঁও চা-বাগানের ব্যবস্থাপক সিদ্দিকুর রহমান বলেন, নানা কারণে দীর্ঘদিন ধরে বাগানে লোকসান গুনতে হচ্ছে। উৎপাদন খরচ থেকে চায়ের দাম কম। তবে শিগগির শ্রমিকদের ভবিষ্য তহবিলের বকেয়া জমা দিতে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

এ বিষয়ে ভবিষ্য তহবিল নিয়ন্ত্রক মহব্বত হোসাইন বলেন, চলতি বছরের শুরুতে ট্রাস্টি বোর্ডের সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অনাদায়ি অর্থ আদায়ে তাগিদপত্র প্রেরণ ও বাগানের আর্থিক পরিস্থিতি সরেজমিন পরিদর্শন করা হয়েছিল। এর ফলে সর্বশেষ ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অনাদায়ি ১০ কোটি টাকা আদায় সম্ভব হয়েছে। তিনি বলেন, ‘কিছু বাগান লোকসানের মুখে পড়েছে, অন্যদিকে শ্রমিকদের স্বার্থও দেখা হচ্ছে। সবকিছু বিবেচনায় রেখে আমরা অনাদায়ি আদায়ে কাজ করে যাচ্ছি।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত