Ajker Patrika

ইবির শিক্ষক-কর্মকর্তারা মাফ পেলেও ঝুলে আছে ৩৩ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ

ইবি সংবাদদাতা
ইবির শিক্ষক-কর্মকর্তারা মাফ পেলেও ঝুলে আছে ৩৩ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়। ছবি: আজকের পত্রিকা

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) জুলাই আন্দোলনবিরোধী ভূমিকার অভিযোগে বরখাস্ত হওয়া ১৯ শিক্ষক এবং ১১ কর্মকর্তা-কর্মচারীর শাস্তি মওকুফ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। গত ১৮ মার্চ অনুষ্ঠিত জরুরি সিন্ডিকেট সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তাঁদের শাস্তি মওকুফের এক মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও একই ইস্যুতে বহিষ্কার ও সনদ বাতিলের সিদ্ধান্ত হওয়া ৩৩ শিক্ষার্থী ও শাখা ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। এতে তাঁদের শিক্ষাজীবন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় রেজিস্ট্রার সূত্রে জানা গেছে, গত ৩০ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৭১তম সিন্ডিকেট সভায় জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানবিরোধী ভূমিকা থাকার অভিযোগে ইবির ১৯ জন শিক্ষক এবং ১১ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ মোট ৩০ জনকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের আওয়ামীপন্থী শিক্ষক সংগঠন ও কর্মকর্তা ইউনিটের সদস্য।

একই অপরাধে ৩৩ শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে—যাঁদের পড়াশোনা শেষ হয়েছে, তাঁদের সনদ বাতিল এবং অধ্যয়নরতদের বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরবর্তীকালে তাঁদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। এর মধ্যে অধিকাংশ শিক্ষার্থীই নোটিশের জবাব দিয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের বহিষ্কার ও সনদ বাতিল কার্যকর করা হয়নি।

সে কারণে তাঁরা নিয়মিত ক্লাস ও পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারবেন বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের মধ্যে কেউ কেউ বিভাগের একাডেমিক কার্যক্রম—ক্লাস ও পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন, আবার কোনো কোনো শিক্ষার্থীকে ক্লাস ও পরীক্ষায় অংশ নিতে দেওয়া হচ্ছে না। এদিকে গত ১৮ মার্চের জরুরি সিন্ডিকেট সভায় শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শাস্তি মওকুফ করা হলেও শিক্ষার্থীদের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। ফলে একই অপরাধে অভিযুক্ত হয়েও দুই পক্ষের প্রতি ভিন্ন ভিন্ন আচরণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযুক্ত শিক্ষার্থীরা বলেন, একই অপরাধে বরখাস্ত শিক্ষক-কর্মকর্তারা যদি নির্দোষ বিবেচনায় শাস্তি থেকে মওকুফ পেয়ে থাকেন, তাহলে শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সিদ্ধান্ত কেন প্রযোজ্য হচ্ছে না? তাঁরা বলেন, শাস্তি বহাল থাকায় তাঁরা একদিকে যেমন একাডেমিক ক্লাস থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে সনদ বাতিল হওয়ায় সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন চাকরির আবেদনও করতে পারছেন না। ফলে তাঁদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ছে। এ বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দাবি জানান তারা।

অভিযোগ রয়েছে, এই ৩৩ জনের মধ্যে অনেক নিরপরাধ শিক্ষার্থীও শাস্তির কোপে পড়েছেন। তানভীর হাসান নামে এক শিক্ষার্থীর দাবি, তিনি নিরপরাধ। একটি নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে দাঁড়ানোর কারণেই তাঁকে ফাঁসানো হয়েছে। তানভীর জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী তিনি। প্রায় ছয় মাস ধরে তিনি বহিষ্কৃত অবস্থায় আছেন। মাস্টার্সের প্রথম সেমিস্টার চলাকালীন তাঁর অনার্সের সনদ বাতিল করে তাঁকে বহিষ্কার করা হয়। তাঁর সহপাঠীরা মাস্টার্সের শেষ পর্যায়ে থাকলেও তিনি শিক্ষাজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছেন। সনদ বাতিলের কারণে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন চাকরির আবেদনও করতে পারছেন না বলে দাবি তানভীরের। তিনি বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনের পর ক্লাস শুরু হওয়ার পর থেকেই আমি নিয়মিতভাবে ক্যাম্পাসে ও ক্লাসে উপস্থিত ছিলাম। সবকিছু স্বাভাবিকই চলছিল। কিন্তু কিছুদিন পর অর্থনীতি ক্লাবের নির্বাচনে সেক্রেটারি পদে প্রার্থী হই। এ পদক্ষেপই আমার জন্য সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। নির্বাচনের আগের দিন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একটি পেজে আমার বিরুদ্ধে একটি পোস্ট করা হয়। এরপর আমার বিভাগের একজন সিনিয়র এবং সহসমন্বয়ক আমাকে ফোন করে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে বলেন এবং জানান, নির্বাচন করলে আমার জন্য সমস্যা হতে পারে। পরবর্তীকালে বাধ্য হয়ে আমি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াই। কিছুদিন পরই আমি বহিষ্কৃতদের তালিকায় আমার নাম দেখতে পাই। আমি মনে করি, শুধু এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই আমাকে ফাঁসানো হয়েছে। বহিষ্কৃতদের আমি একমাত্র ব্যক্তি, যার কোনো ছাত্রলীগে পদ-পদবি নেই।

তানভীর আরও বলেন, আমি জুলাই আন্দোলন বা ছাত্রলীগ—কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেই সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলাম না। জুলাইয়ের প্রতি মৌন সমর্থন ছিল। তবে প্রথম বর্ষে হলে সিট পাওয়ার জন্য ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। এখন আমার শিক্ষাজীবন হুমকিতে আছে। আমাকে মাস্টার্সে ক্লাস-পরীক্ষা দিতে সুযোগ দেওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষের অনুরোধ জানাচ্ছি।’

কেন তানভীর হাসানকে পরীক্ষায় অংশ নিতে দেওয়া হয়নি—এ বিষয়ে অর্থনীতি বিভাগের সভাপতি ড. পার্থ সারথি লস্কর বলেন, ‘এ মুহূর্তে কিছু বলা সম্ভব নয়। ডকুমেন্ট দেখেই বলতে হবে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ড. মনজুরুল হক বলেন, ‘তাদের বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তবে সেটি এখনো কার্যকর করা হয়নি। সিদ্ধান্তটি বর্তমানে ঝুলে আছে। পরবর্তীকালে সিন্ডিকেট সভায় এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া শিক্ষার্থীদেরও ভবিষ্যৎ রয়েছে। তাই আমরা বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখছি। তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো পুনরায় পর্যালোচনা করা হবে এবং অপরাধের মাত্রা বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত