Ajker Patrika

মা-বাবার ফিরে আসার অপেক্ষায় ছিল দেবাশীষের মেয়ে মহিমা

দৌলতপুর (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি
আপডেট : ২০ আগস্ট ২০২৬, ০০: ০৮
মা-বাবার ফিরে আসার অপেক্ষায় ছিল দেবাশীষের মেয়ে মহিমা
দেবাশীষ দত্ত ও তাঁর স্ত্রী আফসানা শারমীন। ছবি: সংগৃহীত

বাবা দেবাশীষ দত্তের সঙ্গে গতকাল মঙ্গলবার রাত ১০টার দিকে কথা হয়েছিল সাত বছরের মহিমা দত্তের। বাবা বলেছিলেন, তার জন্য জামা ও চকলেট কিনেছেন। আজ বুধবার দুপুরের মধ্যে দেশে ফিরবেন। মা-বাবা ও ছোট ভাই বুধবার না এলেও দু-এক দিন পর দেশে ফিরবেন ঠিকই, তবে জীবিত নয়—কফিনবন্দী হয়ে।

গতকাল মঙ্গলবার দিবাগত রাত ৩টার দিকে কলকাতার মির্জা গালিব স্ট্রিটের হোটেল শিখা ইনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত, তাঁর স্ত্রী আফসানা শারমীন, তিন বছরের ছেলে স্বর্ণশীষ দত্ত এবং শ্বশুর আকরাম হোসেন নিহত হওয়ার পর কুষ্টিয়ার আড়ুয়াপাড়ার ভাড়া বাসায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া।

গতকাল মঙ্গলবার রাতে আত্মীয়স্বজনের জন্য কেনাকাটা শেষ করে বুধবার দেশে ফেরার কথা ছিল দেবাশীষসহ পরিবারের চার সদস্যের। এর আগে গতকাল মঙ্গলবার রাত ১০টার দিকে বাড়িতে থাকা বড় মেয়ে ও বাবার সঙ্গে শেষবারের মতো কথা বলেন দেবাশীষ দত্ত।

কুষ্টিয়া শহরের এডুকেয়ার স্কুলের কেজি শ্রেণির শিক্ষার্থী ছোট মহিমা এখনো বুঝে উঠতে পারেনি, তার আপন বলতে মা-বাবা ও ছোট ভাই আর কেউ জীবিত নেই। বুধবার বিকেলে আড়ুয়াপাড়ায় দেবাশীষের বাড়িতে গিয়ে কথা হয় মহিমার সঙ্গে। শোকের গভীরতা বোঝার মতো বয়স এখনো হয়নি তার। শুধু জানে, বাবা তার জন্য জামা ও চকলেট কিনেছেন। সকালে দেশে ফিরেই তাকে সেগুলো দেবেন।

দেবাশীষের বাবা দিলীপ দত্ত জানান, চলতি মাসের ৩ তারিখ ছেলে, পুত্রবধূ ও ছোট নাতিকে নিয়ে চিকিৎসার জন্য ভারতে যান তিনি। পরদিন ৪ আগস্ট তাঁরা বেঙ্গালুরুতে চিকিৎসা নিতে যান। সেখানে চিকিৎসা শেষে সোমবার রাতে কলকাতায় ফেরেন। আজ বুধবার সকালে তাঁদের দেশে ফেরার কথা ছিল। এর মধ্যেই ঘটে যায় মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ড।

দিলীপ দত্ত আরও জানান, তাঁদের ভারতে যাওয়ার কয়েক দিন পর দেবাশীষের শ্বশুরও চিকিৎসার জন্য ভারতে যান। তাঁরও একই সঙ্গে দেশে ফেরার কথা ছিল।

আড়ুয়াপাড়ার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, স্বজন ও প্রতিবেশীদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। ছেলে, পুত্রবধূ ও নাতিকে হারিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন দেবাশীষের মা স্বপ্না দত্ত। শোকাবহ পরিবেশে নির্বাক হয়ে পড়েছেন পরিবারের সদস্য ও স্বজনেরা।

দেবাশীষ ছিলেন পরিবারের একমাত্র ছেলে। তাঁর ওপরই নির্ভরশীল ছিল পুরো পরিবার। কর্মজীবনে সাংবাদিকতার পাশাপাশি পরিবারের দায়িত্বও সামলাতেন তিনি।

কুষ্টিয়ার এনএস রোডের আলো ভবনে দেবাশীষের অফিসে গিয়ে দেখা যায়, তাঁর ব্যবহৃত চশমাটি ঠিক আগের মতোই পড়ে আছে। পাশে রয়েছে তাঁর ল্যাপটপ—যে ল্যাপটপে প্রতিদিন লেখা হতো কুষ্টিয়ার মানুষের অসহায়ত্ব, সম্ভাবনা, সংকট ও স্বপ্নের গল্প। যে চেয়ারটিতে বসে তিনি দিনের পর দিন মানুষের কথা লিখেছেন, সেই চেয়ারটিই আজ শূন্য।

শুধু অফিসের চেয়ারটি নয়, শূন্য হয়ে গেছে একটি পরিবারও। আর বাবার ফেরার অপেক্ষায় থাকা ছোট্ট মহিমার কাছে সেই শূন্যতা হয়তো ধীরে ধীরে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

মা-বাবা ও ছোট ভাই হয়তো ফিরবেন—কিন্তু মহিমাকে আর কখনো জড়িয়ে ধরে বলবেন না, ‘তোমার জন্য জামা আর চকলেট এনেছি।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত