যশোর কারাগার: সাজা শেষ, তবু ফেরা হচ্ছে না ৪৩ ভারতীয়র
• প্রত্যাবাসন জটিলতায় মর্গে পড়ে আছে দুই ভারতীয়র মরদেহ।
• স্বল্পমেয়াদি সাজা শেষে অনেককে ৮ থেকে ১৫ বছর কারাগারে থাকতে হচ্ছে।
• দীর্ঘ বন্দিত্বে শারীরিক ও মানসিক সমস্যায় ভুগছেন অনেক বন্দী।

ভারতের উত্তর প্রদেশের চিতামারী জেলার মেজরগঞ্জ থানার কাঁকড়ারা গ্রামের বাসিন্দা বাছুল মাঝি। ২০১৩ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি খাগড়াছড়ির রামগড় সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে প্রবেশের দায়ে আটক হন তিনি। পরদিন আদালত তাঁকে ছয় মাসের বিনা শ্রম কারাদণ্ড দেন। সাজা শেষ হওয়ার পর দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ২০১৮ সালের ২০ নভেম্বর তাঁকে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। এরপর দীর্ঘদিন সেখানেই বন্দী ছিলেন বাছুল।
কারাগারে থাকা অবস্থায় সিজোফ্রেনিয়াসহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হন তিনি। ৯ অক্টোবর বুকে ব্যথা শুরু হলে তাঁকে যশোর জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। সাজা শেষ হওয়ার পরও দীর্ঘদিন বন্দী থাকা এই ভারতীয় নাগরিকের স্বদেশে ফেরার আকুতি শেষ হয়েছে মৃত্যুর মধ্য দিয়ে।
একই হাসপাতালের মর্গে পড়ে আছে আরেক ভারতীয় গাজী মণ্ডলের মরদেহ। পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার বাসিন্দা গাজী অস্ত্র আইনের একটি মামলায় যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদি ছিলেন। ১৯ অক্টোবর তিনি মারা যান।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক হুসাইন শাফায়াত বলেন, ‘হাসপাতালের মর্গে মরদেহ রাখার চারটি চেম্বার রয়েছে। এর মধ্যে একটি দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট। দুটিতে ভারতীয় বন্দীদের মরদেহ। ফলে অন্য মরদেহ রাখার ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে।’
বাছুল ও গাজীর মতো যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে সাজা শেষ হওয়ার পরও দেশে ফিরতে পারছেন না দেশটির আরও ৪৩ নাগরিক। কারা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, কারাগারে মোট ৫২ ভারতীয় নাগরিক বন্দী। ৪৩ জনের সাজার মেয়াদ শেষ হয়েছে। কারও ১৫ দিন থেকে দুই বছরের সাজা হলেও প্রত্যাবাসন না হওয়ায় তাঁদের ৮ থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত থাকতে হচ্ছে।
বন্দীদের মধ্যে সাতজন নারী এবং ২৪ জনের বয়স ৫০ বছরের বেশি। দীর্ঘদিন বন্দী থাকায় তাঁদের অনেকে শারীরিক ও মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, সাজা শেষ হওয়ার পরও বন্দী রাখা মানবাধিকারের লঙ্ঘন।
যশোরের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আমিনুর রহমান হিরু বলেন, ‘সাজা শেষ হওয়ার পরও বছরের পর বছর বিপুলসংখ্যক ভারতীয় নাগরিকের কারাগারে থাকা দুঃখজনক। এদের স্বজনদের কাছে পৌঁছে দিতে দুই দেশের সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে।’
যশোর জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু বলেন, ‘৪৫ জনের সাজার মেয়াদ শেষ হলেও বন্দী হস্তান্তরের জটিলতায় তাঁরা মুক্তি পাননি। দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে এ সমস্যার দ্রুত সমাধান হতে পারে। সাজা শেষে মুক্তি পাওয়া তাঁদের মানবাধিকার।’
দীর্ঘদিন ধরে দেশে ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন চারল দেবী (৪৮) ও গোবিন্দ বিহারী (৪৭)। ভারতের বিহারের বাসিন্দা চারল দেবী ২০২৪ সালের ১২ জানুয়ারি শরীয়তপুরে আটক হন। আদালত তাঁকে ৮ মাসের কারাদণ্ড দেন। ওই বছরের ২ সেপ্টেম্বর সাজা শেষ হলেও মুক্তি মেলেনি তাঁর। কারা কর্তৃপক্ষ জানায়, চারল দেবী দিনের বেশির ভাগ সময় কান্নাকাটি করেন।
গোবিন্দ বিহারী ২০১১ সালে অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশের দায়ে ১ বছরের কারাদণ্ড পান। সাজা শেষ হওয়ার পরও প্রায় ১৪ বছর দেশে ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন তিনি।
মানবাধিকার সংগঠন রাইটস যশোরের নির্বাহী পরিচালক বিনয় কৃষ্ণ মল্লিক বলেন, ‘আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া যত জটিলই হোক, মানবিক বিবেচনায় এমন ঘটনার দ্রুত নিষ্পত্তি হওয়া জরুরি। মৃত্যুর পর মর্গে পড়ে থাকা মরদেহগুলোর মর্যাদাপূর্ণ শেষকৃত্য সম্পন্ন হওয়ার অধিকারও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতিমালার সঙ্গে সম্পর্কিত।’
যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান বলেন, অধিকাংশ বন্দী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগ থেকে প্রত্যাবাসনের অনুমোদন পেয়েছেন। তবে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের অনুমোদন না মেলায় তাঁদের দেশে ফেরত পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। ভারতীয় হাইকমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। সেখান থেকে সাড়া না পেলে আদালতের মাধ্যমে ফেরত পাঠানোর বিকল্প নিয়েও ভাবা হচ্ছে বলে জানান তিনি।









