Ajker Patrika

‘জুলাই যোদ্ধা’ সুরভীর মায়ের করা মামলায় ব্যবস্থা নেয়নি পুলিশ, লুকিয়েছে বয়স

গাজীপুর প্রতিনিধি
আপডেট : ০৬ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮: ৫৩
নাইমুর রহমান দুর্জয়। ছবি: সংগৃহীত
নাইমুর রহমান দুর্জয়। ছবি: সংগৃহীত

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী ও ‘জুলাই যোদ্ধা’ সুরভী পুলিশের কাছ থেকে সুবিচার পাননি বলে অভিযোগ উঠেছে। সুরভীকে যাঁর মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে, সুরভীর মা ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে কালিয়াকৈর থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১০ ধারায় একটি মামলা করেছিলেন। কিন্তু পুলিশ এই মামলায় কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। উল্টো সুরভীকেই গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠায় এবং আদালতে ৫ দিনের রিমান্ড চায়। আর আদালত ২ দিনের রিমান্ড মঞ্জুরও করেন।

সোমবার রাতে সুরভী কারাগার থেকে জামিনে মুক্তিলাভের পর চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, গত ২৬ নভেম্বর কালিয়াকৈর থানায় সুরভীর পক্ষে ও বিপেক্ষ দুটি মামলা রেকর্ড করা হয়। একটি মামলা করেন নাইমুর রহমান দুর্জয়। মামলা নম্বর ৩৮। দুর্জয়ের মামলায় সুরভীসহ আসামি ৪ জন। অপর মামলাটি দায়ের করেন সুরভীর মা মোসা. ছামিতুন আক্তার। মামলা নম্বর ৪০। এ মামলায় নাইমুর রহমান দুর্জয়কে একমাত্র আসামি করা হয়।

সুরভীর আইনজীবী ও গাজীপুর আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান কামাল অভিযোগ করেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১০ ধারায় দায়ের করা মামলায় সুরভীর মা সুরভীর বয়স ১৭ বছর উল্লেখ করেছিলেন। একই তারিখে একই থানায় দুটি মামলা করা হয়। যেখানে সুরভীর বয়স নাইমুর রহমান দুর্জয়ের করা মামলায় ২১ বছর এবং সুরভীর মায়ের করা মামলায় ১৭ বছর উল্লেখ করা হয়েছে। দুটি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নিযুক্ত করা হয় কালিয়াকৈর থানার উপপুলিশ পরিদর্শক ওমর ফারুককে। অর্থাৎ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সুরভীর বয়সের বিষয়টি আগেই জানতেন।

মোস্তাফিজুর রহমান কামাল আরও বলেন, একই তারিখে দুটি মামলা হলেও পুলিশ প্রায় এক মাস পর সুরভীর বয়স ১৮ বছরের নিচে অর্থাৎ অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও পুলিশ নাইমুর রহমান দুর্জয়ের করা মামলায় সুরভীকে গ্রেপ্তার করে। কিন্তু সুরভীর মায়ের করা মামলায় কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

মোস্তাফিজুর রহমান কামাল বলেন, শুধু তা-ই নয়, অপ্রাপ্তবয়স্ক সুরভীকে গভীর রাতে বাড়ি থেকে অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠায়। গ্রেপ্তার করে আদালতের সোপর্দ করার সময় পুলিশ তাঁর বয়স সম্পর্কে আদালতকে সঠিক তথ্য দেয়নি। এমনকি তাঁর রিমান্ড আবেদনেও সুরভীর বয়স ২১ উল্লেখ করা হয়েছে, যা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে হচ্ছে।

মোস্তাফিজুর রহমান কামাল বলেন, ‘এসব কারণে আমাদের অভিযোগের আলোকে বিজ্ঞ আদালত মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে শোকজ করেছেন। আশা করি, ন্যায়বিচার পাব।’

সুরভীর মায়ের মামলার অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গত জুলাই-আগস্টের ছাত্র আন্দোলনে সরাসরি অংশগ্রহণ করেছিলেন ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজের একাদশ শ্রেণির ওই ছাত্রী। সেই সুবাদেই পরিচয় হয় সাংবাদিক নাইমুর রহমান দুর্জয়ের সঙ্গে। পরিচয়ের পর থেকেই দুর্জয় ওই ছাত্রীকে হোয়াটসঅ্যাপে কুপ্রস্তাব ও কক্সবাজার ভ্রমণের প্রস্তাব দিয়ে আসছিলেন। ছাত্রীটি এতে অসম্মতি জানালে দুর্জয় ক্ষমা চান।

গত ১৮ নভেম্বর সকালে দুর্জয় ওই ছাত্রীকে ফোন করে জানান, তাঁর একটি ইন্টারভিউ নেওয়া হবে এবং তাঁকে ঢাকার বিমানবন্দর এলাকায় থাকতে বলেন। সরল বিশ্বাসে সেখানে গেলে দুর্জয় তাঁকে মোটরসাইকেলে তুলে গাজীপুরের চান্দরা এলাকায় ইন্টারভিউ নেওয়া হবে বলে রওনা দেন। তবে চান্দরার দিকে না গিয়ে তিনি কৌশলে ছাত্রীকে সফিপুর বাজারের পাশে একটি নির্জন স্থানে নিয়ে যান। সেখানে দুর্জয় ওই ছাত্রীকে শ্লীলতাহানি ও যৌন নিপীড়ন করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়, নিপীড়নের শিকার হয়ে ছাত্রীটি কৌশলে পানি কেনার কথা বলে সেখান থেকে সরে যান এবং তাঁর কলেজের বড় ভাইদের বিষয়টি জানান। খবর পেয়ে তাঁরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে ছাত্রীকে উদ্ধার করে স্থানীয় একটি বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে দুর্জয় তাঁর কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চান এবং তাঁর কাছে থাকা কুপ্রস্তাবের অডিও ক্লিপগুলো ডিলিট করার জন্য কান্নাকাটি ও আত্মহত্যার হুমকি দেন।

পরে ১৯ নভেম্বর সকালে সফিপুরের একটি রেস্টুরেন্টে বসে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেল ও হুমকির মাধ্যমে কিছু অডিও ক্লিপ জোরপূর্বক ডিলিট করিয়ে দুর্জয় সেখান থেকে চলে যান বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

এজাহারে বাদী ছামিতুন আক্তার আরও জানান, ‘আমার মেয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। আমরা মান-সম্মানের ভয়ে এবং পারিবারিকভাবে আলোচনার কারণে থানায় অভিযোগ দিতে কিছুটা দেরি করেছি। আমরা এই ন্যক্কারজনক ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।’

নাইমুর রহমান দুর্জয় কিশোরগঞ্জ জেলার মিঠামইন থানার বৈশর গ্রামের সাজ্জাদ হোসাইনের ছেলে। বর্তমানে তিনি ঢাকার সবুজবাগ এলাকায় বসবাস করেন।

এদিকে গাজীপুরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী ও জুলাই যোদ্ধা তাহরিমা জান্নাত সুরভীকে (১৭) গত ২৪ ডিসেম্বর দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে টঙ্গীর নিজ বাসা থেকে যৌথ বাহিনী গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের সময়ের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়।

পরে তাঁকে কারাগারে পাঠান আদালত। আজ সোমবার দুপুরে গাজীপুরের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-২-এর বিচারকের আদালতে পুলিশ তাঁকে হাজির করে ৫ দিনের রিমান্ড চায়। শুনানি শেষে বিচারক সৈয়দ ফজলুল মাহাদী ২ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

দিনভর জুলাই যোদ্ধাদের আন্দোলন ও সন্ধ্যায় রিভিশন আবেদনের শুনানি শেষে জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক তাঁর রিমান্ড বাতিল করে জামিন মঞ্জুরের পর আজ সোমবার রাত সন্ধ্যা ৭টার দিকে গাজীপুর জেলা কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন সুরভী।

কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাসির উদ্দিন বলেন, ‘একই তারিখে পক্ষে-বিপক্ষে দুটি মামলা দায়ের হয়েছে। বিষয়টা আজকে জেনেছি।’

একটি মামলায় সুরভীর বয়স ১৭ দেখানো হয়েছে। দুটি মামলা তদন্ত কর্মকর্তা একই ব্যক্তি। তাহলে বয়সের বিষয়টি মীমাংসা না করে তাঁকে গ্রেপ্তার এবং অন্য মামলায় কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি বলেন, ‘মামলাসংক্রান্ত বিষয়ে আদালত তদন্ত কর্মকর্তাকে শোকজ করেছে। তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে জবাব দিক। তারপরে বিষয়গুলো দেখব।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

বাংলাদেশিদের যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে দিতে হবে ভিসা বন্ড, নতুন মার্কিন নিয়ম

শরিয়তি ফারায়েজ অনুযায়ী মেয়ের সন্তান নানার সম্পত্তির সরাসরি ওয়ারিশ হয় না

‘চাইলে বাংলাদেশে ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পের আচরণ অনুসরণ করুন, কিন্তু খেলোয়াড় কেন বলির পাঁঠা’

উত্তরবঙ্গ সফরে যাচ্ছেন তারেক রহমান, যা থাকছে সফরসূচিতে

যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ, আটলান্টিকে তেলের ট্যাংকার পাহারা দেবে রাশিয়ার যুদ্ধজাহাজ

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত