Ajker Patrika

গণমাধ্যমে জন-আস্থা ‘তলানিতে’, আইন সংস্কার ও জবাবদিহির তাগিদ

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
আপডেট : ০৩ মে ২০২৬, ১৫: ১৫
গণমাধ্যমে জন-আস্থা ‘তলানিতে’, আইন সংস্কার ও জবাবদিহির তাগিদ
রাজধানীতে টিআইবি আয়োজিত ‘জনআস্থা পুনর্নির্মাণ: বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহি’ শীর্ষক আলোচনা সভা। ছবি: আজকের পত্রিকা

গণমাধ্যমের প্রতি জন-আস্থা ও স্বাধীনতা বর্তমানে তলানিতে পৌঁছেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে কণ্ঠরোধ, নিয়ন্ত্রণমূলক আইন, রাজনৈতিক ও করপোরেটের প্রভাব, অপপ্রচার এবং সাংবাদিকদের ওপর নিপীড়নের কারণে স্বাধীন সাংবাদিকতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে নিবর্তনমূলক আইন বাতিল, গণমাধ্যমবান্ধব নীতিমালা প্রণয়ন এবং সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন বক্তারা।

আজ রোববার বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস উপলক্ষে রাজধানীর ধানমন্ডিতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) আয়োজিত ‘জন-আস্থা পুনর্নির্মাণ: বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহি’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এসব বিষয় উঠে আসে। অনুষ্ঠানে গণমাধ্যম, সুশীল সমাজ, কূটনৈতিক মহল এবং শিক্ষাঙ্গনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

আলোচনায় প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ড. জাহেদ উর রহমান। এ ছাড়া বক্তব্য দেন গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সাবেক প্রধান কামাল আহমেদ, ইউনেসকোর কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ সুজান ভাইজ, সুইডেন দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি পাউলো কাস্ত্রো, ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদক রিয়াজ আহমেদ, বিজিসির আহ্বায়ক ফাহিম আহমেদ, সিনিয়র সাংবাদিক শাহানাজ মুন্নী প্রমুখ। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. জাহেদ উর রহমান বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর মাত্র দুই মাস পার হয়েছে। তবে সরকার গণমাধ্যমের বর্তমান সংকট সম্পর্কে সচেতন এবং পরিস্থিতির উন্নয়নে কাজ করছে। তিনি বলেন, ‘আগামী বছর বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে আমরা আশা করছি দেশের গণমাধ্যমের অবস্থার দৃশ্যমান উন্নতি হবে। বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের কাম্য নয়, এটি পরিবর্তন করতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’

সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলা ও হয়রানির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়সহ দীর্ঘদিন ধরে কিছু সাংবাদিক মিথ্যা মামলায় কারাবন্দী রয়েছেন। বিষয়টি ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর নজরে আনা হয়েছে এবং দ্রুতই ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

জাহেদ উর রহমান জানান, সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হচ্ছে। নারী নির্যাতন ও সহিংসতার প্রসঙ্গ টেনে ড. জাহেদ উর রহমান বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে নারী হয়রানি ও সহিংসতার ঘটনা উদ্বেগজনক। এই সমস্যা মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে একটি বিশেষ সেল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা দ্রুত অভিযোগ গ্রহণ ও সমাধানে কাজ করবে।

রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম বিটিভির আর্থিক কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন তোলেন জাহেদ উর রহমান। তাঁর ভাষায়, ‘বিটিভির বছরে ব্যয় প্রায় ৩০০ কোটি টাকা, অথচ আয় মাত্র ১৫ কোটি টাকা। অতীতে বাধ্যতামূলকভাবে প্রচারিত সংবাদও সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি।’ তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে গণমাধ্যমের কাঠামোগত সংস্কার জরুরি।

গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সাবেক প্রধান কামাল আহমেদ বলেন, বর্তমানে অপপ্রচার, ভুয়া তথ্য ও বিভ্রান্তিকর বয়ান গণমাধ্যমের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে রাজনৈতিক, গোষ্ঠীগত ও ব্যবসায়িক স্বার্থে পরিকল্পিতভাবে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে, যা গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

কামাল আহমেদ বলেন, ‘গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা তলানিতে নেমে গেছে। কারণ, তারা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না। অর্থনৈতিক চাপ, মালিকপক্ষের প্রভাব এবং করপোরেট স্বার্থ এখনো বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে।’ সরকারের পক্ষ থেকে সরাসরি চাপ কিছুটা কমলেও মালিকানার প্রভাব ও বাজারনির্ভরতা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সীমিত করে রাখছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

ইউনেসকোর কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ সুজান ভাইজ বলেন, বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা চাপে রয়েছে এবং বাংলাদেশও একই চ্যালেঞ্জের মুখে। তিনি বলেন, ‘গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এমন নীতিমালা প্রয়োজন, যা সাংবাদিকতার বিকাশে সহায়ক হবে, দমনমূলক নয়।’

সুজান আরও বলেন, সাম্প্রতিক বৈশ্বিক সূচকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান পিছিয়ে গেছে, যা উদ্বেগজনক। তবে নতুন সরকারের অধীনে এই পরিস্থিতিতে উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলেও তিনি মনে করেন। জনগণের আস্থা পুনর্গঠনে তথ্যের নির্ভুলতা, নিরপেক্ষতা ও পূর্ণতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন তিনি।

সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনে কোনো সাংবাদিক নিহত না হওয়াকে ইতিবাচক দিক হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভবিষ্যতের স্থানীয় নির্বাচনগুলোতেও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে পেশাগত মান ও নৈতিকতা আরও জোরদার করার আহ্বান জানান তিনি।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অতীত সরকারের রেখে যাওয়া নানা সমস্যার পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সময়েও গণমাধ্যমের ওপর চাপ, মামলা ও হয়রানি অব্যাহত ছিল। তিনি বলেন, ‘যদি কেউ প্রকৃতপক্ষে অপরাধী হন, তাহলে আইন অনুযায়ী বিচার হবে। কিন্তু বিচারবহির্ভূতভাবে সাংবাদিকদের কারাবন্দী রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’

আলোচনা সভায় বক্তারা আরও বলেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও জবাবদিহি গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি। তাই জন-আস্থা পুনরুদ্ধারে রাষ্ট্র, গণমাধ্যমের মালিকপক্ষ, সাংবাদিক সমাজ ও নাগরিকদের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তাঁরা মনে করেন, স্বাধীন, দায়িত্বশীল ও পেশাদার গণমাধ্যম ছাড়া একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

আইন অনুযায়ী নিয়মিত শিক্ষার্থীদের ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভর্সিটিতে যুক্ত করা হবে

মাছ ধরতে গিয়ে এক জেলে যেভাবে খুঁজে পেলেন বৃষ্টির মরদেহ

মধ্যপ্রাচ্যে বিপুল অস্ত্র বিক্রির তোড়জোড় ট্রাম্পের, অন্যদিকে অবরোধ ভেঙে ইরান-ইরাক-সিরিয়া অক্ষের উত্থান

যমজ বোনের পিতা আলাদা, কীভাবে সম্ভব

টিকা বন্ধ করে দিয়েছিল ইউনূস সরকার, এরপরই দেশে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত