Ajker Patrika

পুরোনো ভবনে শঙ্কায় ছাত্ররা

  • ১৯৮৫ সালের ১৫ অক্টোবর ঢাবির জগন্নাথ হলে টিভি রুমের ছাদ ধসে ৪০ জনের মৃত্যু হয়।
  • পুরোনো ভবনের সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণকাজ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্টদের।
  • পুরোনো ভবনগুলোর ভূমিকম্প-সহনশীলতা ও ঝুঁকির বিষয়টি যাচাই করা হচ্ছে।
মো. বেলাল হোসেন, ঢাবি
পুরোনো ভবনে শঙ্কায় ছাত্ররা
ছাদের পলেস্তারা খসে ভেতরের রড বের হয়ে এসেছে। ঝুঁকিপূর্ণ কক্ষেই থাকছেন শিক্ষার্থীরা। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টারদা সূর্য সেন হলে। ছবি: আজকের পত্রিকা

‘মনে হচ্ছিল, আকাশ ভেঙে পড়েছে। আর প্রচণ্ড আঘাতে ডান পা’টা হাঁটুর পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ছাদের ভাঙা একটা টুকরা এসে পড়েছিল আমার পায়ে। চারদিকে আর্তনাদ। কেউ বাঁচার জন্য আকুতি জানাচ্ছিলেন, কারও কণ্ঠস্বর কয়েকবার আর্তচিৎকারের পরই থেমে যাচ্ছিল। ঘোর অন্ধকারে কে কোথায় পড়ে আছেন, কার কী অবস্থা—কিছুই বোঝার উপায় ছিল না।’

১৯৮৫ সালের ১৫ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে ঘটা ভয়াবহ বিপর্যয়ের বর্ণনা এভাবেই দিলেন বেঁচে যাওয়া রসায়ন বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী বিপুল কুমার সাহা। জনাকীর্ণ টিভি রুমের ছাদ ধসে পড়ে সেদিন মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটেছিল ৪০ জনের। আহত হয়েছিলেন ১০০-এর বেশি শিক্ষার্থী।

প্রাণে বেঁচে ফিরলেও চার দশক পরও সেদিনের স্মৃতি ভুলতে পারেননি বিপুল কুমার সাহা। বর্তমানে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব পালন করছেন।

আজকের পত্রিকাকে বিপুল সাহা জানান, সেদিন রাতে দীর্ঘ সময়ের গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিতে পুরোনো ভবনের ছাদে অনেক পানি জমেছিল। একপর্যায়ে ছাদটি পানির ভার বহন করতে না পেরে ধসে পড়ে।

শিক্ষার্থীদের এই বিপর্যয়ের ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন তোলে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিপুল কুমার জেনেছিলেন, আহতদের জন্য রক্ত দিতে ছুটে আসছেন রিকশাচালক থেকে শুরু করে মাদ্রাসাশিক্ষার্থীসহ অসংখ্য সাধারণ মানুষ।

জগন্নাথ হলে পরে ‘অক্টোবর স্মৃতি ভবন’ নামে নতুন ভবন হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে বেশ কয়েকটি হল এবং প্রশাসনিক ও একাডেমিক ভবন উঠেছে। পাশাপাশি কিছু পুরোনো ভবনের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। দিনে দিনে সে উদ্বেগ বাড়ছে। সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হল, শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল, মাস্টারদা সূর্যসেন হল ও শামসুন নাহার হলের পুরোনো ভবনগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এসব পুরোনো ভবনের সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজ কতটা কী হচ্ছে এবং সেগুলো বড় ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগে টিকে থাকতে কতটা সক্ষম তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্টদের মধ্যে।

বিশেষ করে বেশি পুরোনো সলিমুল্লাহ হল ও শহীদুল্লাহ হলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ পুরোনো। হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল, মাস্টারদা সূর্যসেন হল ও সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের মিলনায়তনগুলোর অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। মুহসীন ও সূর্যসেন হলের পুরোনো মিলনায়তন ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় এগুলোর ব্যবহার বন্ধ রয়েছে।

বিপুল কুমার সাহার মতে, শিক্ষার্থীরা কোনো ভবনের সমস্যা চিহ্নিত করে আবেদন করার পর কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নেবে—নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পদ্ধতি এমন হওয়া উচিত নয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নিজস্ব উদ্যোগে নিয়মিত ভবন পরিদর্শন ও ঝুঁকি নিরূপণের ব্যবস্থা থাকতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) কাজী মো. আক্রাম হোসেন আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেকগুলো ভবন পুরোনো। নব্বইয়ের দশকের আগে নির্মিত ভবনগুলোতে ভূমিকম্প-সহনশীলতার বিষয়টি বর্তমানের মতো গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয়নি। তখন প্রযুক্তিও এত সহজলভ্য ছিল না। আমরা ইতিমধ্যে অনেক ভবন মেরামত করেছি। যেসব ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেগুলোতে বরাদ্দ অনুযায়ী মেরামতের কাজ করছি, যাতে শিক্ষার্থীরা মোটামুটি নিরাপদে থাকতে পারে। তবে ভূমিকম্প বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় কী হবে, তা বলা কঠিন।’

উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী জানান, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় উপাচার্যের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। স্থাপত্য ও প্রকৌশলসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ এবং ভূতত্ত্বসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগের জ্যেষ্ঠ শিক্ষকেরা কমিটিতে রয়েছেন।

উপ-উপাচার্য বলেন, প্রকৌশল শাখার মাধ্যমে পুরোনো ভবনগুলোর ভূমিকম্প-সহনশীলতা ও ঝুঁকির বিষয়টি যাচাই করা হচ্ছে। কোনো ভবনে ফাটল বা ঝুঁকির বিষয় নজরে এলে প্রশাসনকে জানালে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ছাড়া নতুন ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে নির্ধারিত কোড ও মান অনুসরণ করতে বলা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়নে প্রস্তাবিত ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকার প্রকল্পসহ চলমান উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সক্ষমতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু জরাজীর্ণ ও দুর্বল ভবন রয়েছে। এগুলো দ্রুত মেরামত করা এবং প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। তবে চাইলেই সব ভবনের সংস্কার বা উন্নয়নকাজ একসঙ্গে সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হয়।’

উপাচার্য জানান, সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের নিরাপত্তা উন্নয়নে পিলার দিয়ে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। ওয়ার্ক অর্ডার সম্পন্ন হলে আরও সংস্কারের কাজ শুরু হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত