Ajker Patrika

নরসিংদীতে ২ কোটির বেশি টাকা আত্মসাৎ করে লাপাত্তা বিকাশ এজেন্ট

নরসিংদী প্রতিনিধি
নরসিংদীতে ২ কোটির বেশি টাকা আত্মসাৎ করে লাপাত্তা বিকাশ এজেন্ট

নরসিংদীতে বিকাশে বাড়তি লাভের লোভে পড়ে একই এলাকার কয়েকজন ব্যবসায়ী এক এজেন্টের কাছে প্রায় ২ কোটি বেশি টাকা খুইয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সাতজন ভুক্তভোগী এ বিষয়ে থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযুক্ত ব্যক্তি টাকা নিয়ে বিদেশে পালিয়ে গেছেন বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। 

এ দিকে জেলা প্রশাসনের আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় এ নিয়ে আলোচনার হরে ছায়াতদন্ত শুরু হয়। এ অভিযোগের প্রাথমিক প্রমাণও পেয়েছেন বলে জানিয়ে তদন্ত সংশ্লিষ্টজন। 

এ ঘটনা ঘটেছে নরসিংদী পৌর শহরের ব্রাহ্মনদী এলাকায়। অভিযুক্ত বিকাশ এজেন্টের নাম—আনিকুল ইসলাম (২৩)। তিনি ওই এলাকার তৌহিদা এন্টারপ্রাইজের মালিক। এ ছাড়া নরসিংদী সদর উপজেলার আলোকবালী ইউনিয়নের সংরক্ষিত ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য ও ইউনিয়ন আ. লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক আরিফা ইয়াসমিন মুন্নির (৪২) ছেলে। 

গত মঙ্গলবার আনিকুল ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে নরসিংদী সদর থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। 

আল আমিন নামের একজন ভুক্তভোগী বলেন, ‘আমি একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষ। আয় রোজগার না করতে পেরে আমার একটি নম্বরের বিকাশ এজেন্টের আয় থেকে পরিবার চালাইতাম। বাড়তি লাভের আশায় বিকাশ কোম্পানির কাছ থেকে ক্যাশ আউট না করে আনিকুলের এজেন্ট থেকে ক্যাশ আউট করতাম। বিকাশ কোম্পানি ক্যাশ আউটের জন্য এজেন্টকে দিত লাখে ৫০০ টাকা। আর আনিকুল দিত ৩ থেকে ৪ হাজার। এমন লোভে অনেক এজেন্ট তাঁর কাছে টাকা ক্যাশ আউটের জন্য যেত।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘অতিরিক্ত লাভের আশায় আনিকুলকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা দিয়েছিলাম। আমার পাশের বাসার ছেলে আনিকুল পুঁজি গায়েব করে পালিয়ে গেছে। অভিযুক্তের মায়ের কাছে টাকা চাইলে উল্টো হুমকি দেয়। এখন না খেয়ে মরার মতো অবস্থা হয়েছে। মঙ্গলবার আমরা ৭ জন ভুক্তভোগী একত্রিত হয়ে থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছি, যাদের মোট টাকার পরিমাণ ২ কোটি ৮০ লাখ টাকা।’ 

আলোকবালী ইউনিয়নের বাখরনগর গ্রামের ফাইভ জি স্টোরের মালিক ভুক্তভোগী সোহান আলী বলেন, ‘আনিকুলের বিকাশ এজেন্ট থেকে প্রতি এক লাখ টাকায় ক্যাশ আউটের জন্য অতিরিক্ত ৩ হাজার টাকা করে দেওয়া হতো। ৩ মাস ধরে আমাদেরকে এভাবে লভ্যাংশ দিয়ে আসছিল এবং একই এলাকার ছেলে হিসেবে তার প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস তৈরি হয়। কিন্তু গত ১৫ দিন ধরে বিভিন্ন অজুহাতে কাউকে টাকা না দিয়ে সুযোগ বুঝে সকল টাকা আটক করে। এবং কাউকে পরিশোধ না করে এলাকা থেকে গত সপ্তাহে পালিয়ে গেছে।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘তার পরিবারকে এ ঘটনা জানানো হলে, উল্টো আমরাই অভিযুক্ত আনিকুলকে গুম করেছি বলে হুমকি দেয়। তার পরিবার এলাকায় প্রভাবশালী হওয়ায় অভিযোগ করেও কোনো ফল পাচ্ছি না। ব্যবসার সকল টাকা হারিয়ে, না পারছি পরিবারকে বোঝাতে, না পারছি টাকা আদায় করে ব্যবসা চালিয়ে যেতে।’ 

একই এলাকার ভুক্তভোগী খলিল উল্লাহ স্টোরের মালিক খলিল উল্লাহ বলেন, ‘১০ থেকে ১২ দিন আগে বিকাশের মাধ্যমে আমার কাছে সাড়ে ১৫ লাখ টাকা নিয়েছে। আনিকুলের এজেন্ট নম্বরে টাকা পাঠানোর ডকুমেন্টও আছে। আনিকুলের মায়ের আশ্বাসে তার সাথে ব্যবসা শুরু করেছিলাম। এখন টাকা, সম্মান দুটোই শেষ। এখন মানসিকভাবে ও অর্থনৈতিকভাবে চরম খারাপ অবস্থার মধ্যে পরে গেছি। আমরা টাকা ফেরত চাই।’ 

এ বিষয়ে আলোকবালী ইউপি চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন সরকার দীপু বলেন, ‘অতিরিক্ত লাভের লোভ দেখিয়ে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার একাধিক অভিযোগের বিষয়ে আমি অবগত। থানায়ও লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগী। অভিযুক্ত আনিকুল বা তার পরিবারের দৃশ্যমান কোনো আয় নেই। কিন্তু গত দুই মাসে অন্তত দুই কোটি টাকা ব্যয় করে সদর উপজেলার সংগীতা ও বাসাইল এলাকায় দুটি বাড়ি কিনেছেন তারা। ইতিপূর্বে তার মা-বাবার নামেও বিভিন্ন ধরনের অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।’ 

এ দিকে অভিযুক্ত আনিকুল ইসলামের বাবা মাইনউদ্দিন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমার ছেলে কারও কাছ থেকে কোনো টাকা নেয়নি। আমার ছেলেকেও গত কয়েক দিন ধরে খোঁজে পাচ্ছি না। নিখোঁজের ঘটনায় নরসিংদী সদর থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছি। আমরা শহরে কোনো বাড়ি কিনে থাকলে, সরকার তা খুঁজে বের করে বাজেয়াপ্ত করুক।’ 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ছায়া তদন্তকারী এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘আমি তদন্তে প্রায় ৫০ জন ভুক্তভোগীর নাম পেয়েছি। তদন্ত প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জমা দেওয়া হবে।’ 

তিনি আরও জানান, ‘বিকাশ কর্তৃপক্ষ প্রতি এক লাখ টাকায় বিকাশ এজেন্টদের ৫০০ টাকা লভ্যাংশ দেয়। কিন্তু আনিকুল প্রতি এক লাখ টাকার বিপরীতে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা লভ্যাংশ দিত। ভুক্তভোগীরা সবাই আনিকুলের এলাকার হওয়ায় সহজে আনিকুলকে বিশ্বাস করে তার এজেন্ট নম্বর থেকে টাকা তুলত। গত ৩-৪ মাস ধরে নিয়মিত টাকা পরিশোধ করে বিশ্বস্ততা অর্জন করে আনিকুল। পরে সুযোগ বুঝে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।’ 

নরসিংদী সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. তানভীর আহমেদ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘ভুক্তভোগীদের মধ্যে ৭ জনের কাছ থেকে লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। তবে ভুক্তভোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। প্রাথমিক তদন্তে পাওয়া গেছে, বিকাশে অতিরিক্ত লাভের লোভ দেখিয়ে ও সরল বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে ভুক্তভোগীদের টাকা আনিকুল আত্মসাৎ করেছে। আমরা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছি। ভুক্তভোগীদের কেউ হুমকি দিলে তাঁর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ 

এ বিষয়ে নরসিংদীর জেলা প্রশাসক ড. বদিউল আলম আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘টাকা আত্মসাতের ঘটনাটি ভুক্তভোগীদের অভিযোগ ছাড়াও ছায়া তদন্ত করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে টাকার সঠিক পরিমাণ এখনো জানা যায়নি।’ 

এ দিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের ঢাকা অফিসের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আনিকুলের পাসপোর্টের তথ্য অনুযায়ী তিনি গত ১০ ফেব্রুয়ারি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর থেকে দুবাইয়ের শারজাই বিমানবন্দরে চলে গেছেন।’ 

উল্লেখ্য, গত ২৩ জানুয়ারি নরসিংদীর রায়পুরার আলগী বাজারের ডাচ বাংলার এজেন্ট শাখা থেকে প্রায় ৪৫-৫০ জন গ্রাহকদের প্রায় ১০ কোটি টাকা নিয়ে লাপাত্তা হন এজেন্ট উদ্যোক্তা। এ ছাড়াও গত ১০ বছরে নরসিংদী থেকে আরডিবি, শাহ সুলতান মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি, সোনালী ইনস্যুরেন্স, সোয়াল ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি, সন্ধানী লাইফ ইনস্যুরেন্স, পিডিবি ও মধুমতি ইনস্যুরেন্সসহ নামে-বেনামে আরও একাধিক সংস্থা ও ব্যক্তির একাধিক অর্থ জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। এ নিয়ে বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় খবর প্রকাশিত হয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

রাজধানীর বসুন্ধরায় আইনজীবীকে পিটিয়ে হত্যা

এনইআইআর চালু করায় বিটিআরসি ভবনে মোবাইল ব্যবসায়ীদের হামলা-ভাঙচুর

‘আওয়ামী লীগ থেকে জামায়াতে আসেন, দায়দায়িত্ব আমাদের’

তারেক রহমান ও মির্জা ফখরুলের খ্রিষ্টীয় নববর্ষের বাণী প্রত্যাহার করেছে বিএনপি

কাজী নজরুলের ‘বিদায় বেলায়’ কবিতায় দাদিকে স্মরণ জাইমা রহমানের

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত