Ajker Patrika

ধর্ষণের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ক্ষমতা: রুমিন ফারহানা

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
ধর্ষণের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ক্ষমতা: রুমিন ফারহানা
: রাজধানীর বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে ‘আর না ধর্ষণ, শিশু নিপীড়ন, বিচারহীনতা: কোন পথে সমাধান?’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনা। ছবি: আজকের পত্রিকা

প্রতিটি ধর্ষণের সঙ্গে ক্ষমতা ওতপ্রোতভাবে যুক্ত বলে মন্তব্য করেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। তিনি বলেছেন, ধর্ষক হয় অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী অথবা সামাজিকভাবে শক্তিশালী। এ ছাড়া হয় রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী অথবা সে নিজেকে তার লৈঙ্গিক পরিচয়ের কারণে শক্তিশালী মনে করে। কারণ কে না জানে যে, এই সমাজে একটা মেয়ের দিকে যত দ্রুত এবং সহজে বিনা কারণে আঙুল তোলা যায়, একটা ছেলের দিকে আঙুল তত সহজে ওঠে না।

আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে ‘আর না ধর্ষণ, শিশু নিপীড়ন, বিচারহীনতা: কোন পথে সমাধান?’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন। নারী ও শিশু নির্যাতন বিরোধী নাগরিক উদ্যোগ ‘আর না+’ এই গোলটেবিল আলোচনা আয়োজন করে।

রুমিন ফারহানা বলেন, ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী এক মাসে ১১৮টির বেশি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে, যার অধিকাংশের শিকার শিশু। কিন্তু সব ঘটনা সমান গুরুত্ব পায় না। কোনো কোনো ঘটনা অতিরিক্ত আলোচিত হয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসে, আবার অসংখ্য ঘটনা আড়ালেই থেকে যায়।

এ সংসদ সদস্য বলেন, পল্লবীর শিশু ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডটি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যাপক তৎপরতা দেখা গেছে। কিন্তু একই সময়ে ঘটে যাওয়া অন্য অনেক শিশুর প্রতি একই ধরনের মনোযোগ দেখা যায়নি। বিচার পাওয়ার জন্য কোনো ঘটনার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া বা রাজনৈতিকভাবে আলোচিত হওয়া উচিত নয়। আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হলে সব ভুক্তভোগীকেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

রুমিন ফারহানা বলেন, ধর্ষণ প্রতিরোধে তিনটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—শিক্ষা, সচেতনতা এবং বিচার। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় বয়ঃসন্ধিকাল, শরীরের পরিবর্তন ও যৌনতা বিষয়ে প্রয়োজনীয় শিক্ষা যথাযথভাবে দেওয়া হয় না। বিশেষ করে ছেলেরা অনেক সময় সঠিক তথ্যের অভাবে বিভ্রান্তিকর উৎসের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। যৌন শিক্ষা নিয়ে সমাজে এখনো গভীর ‘ট্যাবু’ রয়েছে, যা ভাঙতে পরিবার ও গণমাধ্যমকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

এই সংসদ সদস্যের মতে, পরিবারে ছেলে ও মেয়ে উভয়কেই শেখাতে হবে যে যৌন হয়রানি বা ধর্ষণের দায় কখনো ভুক্তভোগীর নয়; দায় সম্পূর্ণ অপরাধীর। ‘গুড টাচ’ ও ‘ব্যাড টাচ’ সম্পর্কে শিশুদের সচেতন করার পাশাপাশি এই মানসিকতাও গড়ে তুলতে হবে যে যৌন সহিংসতা অন্য যেকোনো ফৌজদারি অপরাধের মতোই একটি গুরুতর অপরাধ।

সমাজে নারীদের সহজেই দোষারোপ করার প্রবণতা ধর্ষকদের সাহস জোগায় বলে উল্লেখ করেন রুমিন ফারহানা। তিনি বলেন, একজন নারী কী পোশাক পরেছেন, কোথায় গেছেন বা কার সঙ্গে ছিলেন—এসব প্রশ্ন নয়; প্রশ্ন হওয়া উচিত অপরাধী কেন অপরাধ করল।

মাদ্রাসাকেন্দ্রিক যৌন নির্যাতনের প্রসঙ্গে রুমিন ফারহানা বলেন, সমাজ মাদ্রাসাকে নৈতিকতা ও ধর্মীয় শিক্ষার প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখে। দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারের অভিভাবকেরা তাদের সন্তানদের পূর্ণ আস্থা নিয়ে সেখানে পাঠান। সেই আস্থার জায়গায় যদি শিশু নির্যাতন বা বলাৎকারের ঘটনা ঘটে, তবে তা শুধু একটি অপরাধ নয়, বরং বিশ্বাসভঙ্গেরও ভয়াবহ উদাহরণ। এ কারণেই এসব ঘটনা নিয়ে সমাজে বাড়তি উদ্বেগ তৈরি হয়।

চিকিৎসক ও রাজনীতিবিদ ডা. তাসনিম জারা বলেন, ধর্ষণ ও শিশু নির্যাতনের মতো ঘটনা কেবল তখনই আলোচনায় আসে, যখন তা ভাইরাল হয় বা সামাজিকভাবে বড় প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। কিন্তু এই সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে এসে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্থায়ী জবাবদিহি ও নিয়মিত মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

তাসনিম জারা আরও বলেন, বিচার ব্যবস্থার পাশাপাশি পুলিশ, ফরেনসিক তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি না হলে, আইন কার্যকর করা সম্ভব নয়। বিশেষ করে ফরেনসিক প্রমাণ সংগ্রহ ও দক্ষ জনবলের ঘাটতি বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে।

একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ট্র্যাকিং বা ড্যাশবোর্ড চালুর প্রস্তাব দেন তাসনিম জারা। যেখানে প্রতিটি ধর্ষণ ও নির্যাতন মামলার অগ্রগতি নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। কোন মামলা কত দিনে নিষ্পত্তি হলো, কোথায় বিলম্ব হলো—এসব তথ্য প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ট্র্যাক করা হলে জবাবদিহি নিশ্চিত করা সহজ হবে বলে তিনি মনে করেন।

আলোচনায় আরও অংশ নেন আইনজীবী ও সাংবাদিক মানজুর আল মতিন, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের মহাসচিব সৈয়দ হাসিব উদ্দিন হোসেন, মহাসচিব, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন, রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গণবিপ্লবী উদ্যোগের প্রতিনিধি আরিফ সোহেল, নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশনের (এনপিএ) মুখপাত্র নাজিফা জান্নাত, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক নেত্রী উমামা ফাতেমা, জাস্টিস অ্যান্ড ডেমোক্রেটিক পার্টির (জেডিপি) আহ্বায়ক নাঈম আহমাদ প্রমুখ।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত