Ajker Patrika

চলচ্চিত্র শিল্প: সিনেমা হলের পর্দায় বিশ্বকাপ চলচ্চিত্রের ব্যবসায় দুশ্চিন্তা

শরীফ নাসরুল্লাহ, ঢাকা
চলচ্চিত্র শিল্প: সিনেমা হলের পর্দায় বিশ্বকাপ
চলচ্চিত্রের ব্যবসায় দুশ্চিন্তা
ছবি: সংগৃহীত

ঈদুল আজহা শেষ হয়েছে এক মাসও পেরোয়নি! কিন্তু লায়ন সিনেমাসে ছবির বদলে দর্শক দেখবেন বিশ্বকাপ ফুটবলের বাছাই করা ম্যাচ। লায়নের মতো সিনেপ্লেক্স, একক পর্দার সিনেমা হল—কোনো জায়গায় ঈদের ছবিতে তেমন দর্শক না থাকার অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। অথচ দুই ঈদের ব্যবসার ওপর ভর করেই হলমালিকেরা সারা বছর ব্যবসা চালিয়ে যান।

চলচ্চিত্রের সুসময়ে দেশজুড়ে ছিল শত শত সিনেমা হল। দেশীয় চলচ্চিত্রশিল্পের দুর্দিন শুরু হলে একে একে বন্ধ হয়ে যায় বেশির ভাগ হল। গত কয়েক বছরে চলচ্চিত্রশিল্পে সুবাতাস বইছে। নতুন প্রজন্মের নির্মাতারা সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে যেসব ছবি বানাচ্ছেন, সেগুলোই কমবেশি শিল্পের দাবি মেটানোর সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসায়িক সাফল্যও পাচ্ছে। তবে মাঝে মাঝে জমছে হতাশার মেঘ। এবারের ঈদুল আজহার মৌসুম তেমনই এক পর্ব।

হলমালিকেরা বলছেন, এবারের কোরবানির ঈদে চলচ্চিত্রের বাজার সবচেয়ে মন্দা গেছে। একসময় বছরব্যাপী ছবি মুক্তি পেত। নিম্ন মান, অশ্লীলতার আগ্রাসনসহ নানা দুর্যোগে একপর্যায়ে সিনেমা বানানো কমে যায়। ব্যবসায়িক সাফল্যের সম্ভাবনা আছে এমন ছবির অভাবে হলমালিকেরা শুধু দুই ঈদ ঘিরে করতেন চলচ্চিত্র ব্যবসা। ইদানীং নানা রুচির দর্শকের উপযোগী ভিন্নধর্মী ছবি তৈরি হলেও চিত্রটা খুব বদলায়নি। আর এ বছরের অভিজ্ঞতা থেকে মালিকদের আশঙ্কা, এভাবে চললে যে হলগুলো চালু আছে, সেগুলোও বন্ধ হয়ে যাবে।

দেশের বিভিন্ন স্থানের প্রদর্শক, সংস্কৃতিকর্মী ও চলচ্চিত্র দর্শকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবারের ঈদুল আজহায় কোনো ছবিই উল্লেখযোগ্য মাত্রায় দর্শক টানতে পারেনি।

দেশের অন্যতম প্রধান মাল্টিপ্লেক্স চেইন স্টার সিনেপ্লেক্স। ঢাকা ও বাইরে মিলিয়ে তাদের বেশ কয়েকটি শাখা আছে। স্টার সিনেপ্লেক্সের বিপণন কর্মকর্তা মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘এবারের ঈদে আমরা খুবই হতাশ। কোনো ছবির নাম বলছি না। ৭-৮ বছর ধরে ঈদকেন্দ্রিক ছবির ব্যবসা হতো। ঈদকে কেন্দ্র করে ভালো ছবি তৈরি হতো। কিন্তু এবারের ঈদে দর্শক আসেনি। তাহলে চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি কীভাবে টিকবে?’

এবার ঈদে ৯টি সিনেমা মুক্তি পেয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘রকস্টার’, ‘মালিক’, ‘রইদ’, ‘বনলতা সেন’, ‘তছনছ’, ‘মাসুদ রানা’, ‘পিনিক’, ‘অফিসার’ এবং ‘ইউনিভার্সিটি অব চানখাঁরপুল’। ছবিগুলোর মধ্যে আর্ট ফিল্ম নামে পরিচিত শৈল্পিক ঘরানার ছবি যেমন আছে, তেমনি আছে একেবারে ফর্মুলাভিত্তিক বাণিজ্যিক ছবিও। আছে বাংলাদেশের এখনকার সবচেয়ে জনপ্রিয় নায়ক শাকিব খানের ছবিও। তবু এবারের ঈদে মুখ থুবড়ে পড়েছে চলচ্চিত্র বাজার।

মধুমিতা সিনেমা হলের মালিক এবং বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির সাবেক সভাপতি ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ বলেন, ‘হলে লোকই নাই। এবার একেবারে বাজে অবস্থা। কী ছবি বানায় জানি না! অনেকে বলে ভালো ছবি, কিন্তু দর্শক তো আসে না। আমরা হতাশ। এদিকে বিদ্যুতের দাম বেড়েছে। আমাদের টিকিটের রেটও বাড়িয়ে দিতে হবে। কিন্তু এই টাকাতেই দর্শক আসে না, বাড়াব কী করে? টিকে তো থাকতে হবে। কী করব কিছুই বুঝতে পারছি না।’

ঢাকার কেরানীগঞ্জের একসময়কার নামকরা লায়ন সিনেমা হল এখন সিনেপ্লেক্সে রূপান্তরিত হয়েছে। নাম লায়ন সিনেমাস। সেখানকার কাস্টমার কেয়ার এক্সিকিউটিভ আবদুর রহমান জানান, ঈদে তাঁদের ব্যবসা মোটামুটি হয়েছে। ঈদের শুরুতে সাতটি সিনেমা চালিয়েছিলেন। এখন ৫টি চলছে। গত ঈদের তুলনায় এবার ব্যবসা খুব একটা ভালো চলেনি।

আবদুর রহমানের মতে, ভালো ছবি নেই, তাই ব্যবসাও নেই।

লায়ন সিনেমাসের ফেসবুক পেজে গিয়ে দেখা গেল ফুটবল বিশ্বকাপের খেলা দেখানোর বিজ্ঞাপন। বড় পর্দায় তারা দেখাবে আর্জেন্টিনার গ্রুপপর্বের ম্যাচগুলো।

হলমালিকদের অভিযোগ, সিনেমা হল কমতে কমতে যা আছে, সেগুলো দিয়ে ব্যবসা করার উপযোগী ভালো চলচ্চিত্র নেই। ভালো সিনেমা না থাকলে হল এমনিতেই বন্ধ হয়ে যাবে। ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ বলেন, ‘আসলে ভালো কনটেন্ট হচ্ছে না। নায়ক নাই, নায়িকা নাই। এক শাকিব খানকে ঘিরে সব হচ্ছে। সেখানেও এবার দর্শক নেই। লগ্নিকারকেরা সরে যাচ্ছেন। আমাদের মূল নজর দেওয়া উচিত কনটেন্টে। হল বাঁচিয়ে রাখতে হলে এর বিকল্প নেই। আগে যারা ভালো ছবি বানাত, এ রকম পরিচালকদের ছবি বানানোর জন্য টাকা দেওয়া হোক। ভালো ছবি ছাড়া হল চলবে না।’

কয়েকজন নির্মাতা ও চলচ্চিত্র বিশেষজ্ঞও ভালো মানের চলচ্চিত্র নির্মাণের ওপর জোর দিয়েছেন।

ব্যবসার মন্দার মধ্যে নতুন করে আবার ভারতীয় চলচ্চিত্র মুক্তি দেওয়ার কথা তুলছেন কোনো কোনো হলমালিক। চলচ্চিত্রশিল্প টিকিয়ে রাখতে ছবি আমদানির কথা বলছেন তাঁরা। চলচ্চিত্রকে এই খাদের কিনারা থেকে ফেরাতে চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে বসার কথাও ভাবছেন প্রদর্শকেরা।

চলচ্চিত্র সমালোচক বিধান রিবেরু অবশ্য মোটের ওপর আশাবাদী। আজকের পত্রিকার সঙ্গে আলাপে তিনি বলেন, ‘ঈদের সময়ে যথেষ্ট মানুষ ছবি দেখেছে। উৎসবকে কেন্দ্র করে মানুষের আগ্রহের কারণে এখন পূজাকে কেন্দ্র করেও ছবি মুক্তি পাচ্ছে। আমার ধারণা, কিছুদিনের মধ্যে সাপ্তাহিক বন্ধসহ বিভিন্ন ছুটিতেও ছবি মুক্তি পাবে। এটি ইতিবাচক দিক বলে মনে করি। তবে একটা জিনিস মনে রাখতে হবে, মানুষ এখন শুধু গৎ বাঁধা ফর্মুলার ছবি পছন্দ করছে না। তারা অন্য ধরনের ছবিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে। এই ট্রেন্ড তৈরি হচ্ছে। ফর্মুলার বাইরের ছবি দেখতে দর্শক হুমড়ি খেয়ে পড়বে এমন নয়। এর জন্য সময় দিতে হবে। দর্শক তৈরি হতে হবে। যারা ফর্মুলার ছবির দর্শক, তারা ফর্মুলার ছবি দেখবে; আর যারা ‘রইদ’ ও ‘বনলতা সেন’-এর দর্শক, তারা তা-ই দেখবে। এই নতুন ধরনের ছবিগুলোর ব্যাপারে যদি হলমালিকেরা যথেষ্ট প্রচার করেন, তাহলে এগুলো দিয়েও ব্যবসা করা সম্ভব।

নির্মাতা খন্দকার সুমন অবশ্য অন্যদিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন। তিনি বললেন, চলচ্চিত্র ব্যবসা শুধু কনটেন্টের ওপর নির্ভর করে না; সামাজিক-রাজনৈতিকসহ নানা প্রভাব থাকে। ঈদুল আজহায় মানুষের কাছে তেমন টাকা থাকে না। ঈদের দিন কোরবানিসহ নানা কাজে ব্যস্ত থাকে, আত্মীয়স্বজনের বাড়ি যায়, ইত্যাদি কারণে এবার মনে হতে পারে দর্শক কম। কিন্তু এবার তো অন্য ঈদের তুলনায় সিনেমার মান ভালো ছিল। ব্যবসাটা অনেকাংশে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপরও নির্ভর করে।

চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আওলাদ হোসেন উজ্জল বলেন, ‘বাস্তবতা হলো, প্রদর্শকেরা হতাশ। কোনো ছবি ভালো যাচ্ছে না। যেভাবে সিনেমা হলে দেখার কথা, সেভাবে দর্শক টানতে পারছে না। ভালো কনটেন্ট না থাকলে হলগুলো বন্ধ হয়ে যাবে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত