Ajker Patrika

চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমবাগান: প্রতিরোধব্যবস্থা থেকেও বজ্রপাতে জুনে মৃত্যু ৯

  • আমবাগান, খোলা মাঠ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ: বিশেষজ্ঞ
  • হতাহত কমানোর কার্যকর উপায় জনসচেতনতা বৃদ্ধি
  • অধিকাংশ শ্রমিক জানেন না বজ্রপাতের সময় করণীয়
  • প্রশ্নের মুখে কোটি টাকার বজ্রপাত প্রতিরোধব্যবস্থা
আব্দুল বাশির, চাঁপাইনবাবগঞ্জ
চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমবাগান: প্রতিরোধব্যবস্থা থেকেও বজ্রপাতে জুনে মৃত্যু ৯
ছবি: সংগৃহীত

চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমবাগানগুলো এখন শুধু ফলনের নয়, মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। চলনৌকাবাইচেতি মৌসুমে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১১ জন, যাদের মধ্যে ৯ জনই আম সংগ্রহ কিংবা ঝড়ে পড়া আম কুড়াতে গিয়ে বজ্রাঘাতের শিকার হয়েছেন।

এদিকে জেলার প্রায় সাড়ে ৩৭ হাজার হেক্টর আমবাগানে যখন হাজারো শ্রমিক ও কৃষক জীবিকার তাগিদে কাজ করছেন, তখন তাঁদের নিরাপত্তায় কার্যকর বজ্রনিরোধক ব্যবস্থা কিংবা আশ্রয়কেন্দ্রের দেখা মিলছে না। কোটি টাকার সরকারি প্রকল্পে স্থাপিত বজ্রনিরোধক দণ্ডগুলোর কার্যকারিতা নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ২২ মে থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১১ জন। এর মধ্যে ৯ জনই আম সংগ্রহ কিংবা ঝড়ে পড়া আম কুড়াতে গিয়ে বজ্রাঘাতের শিকার হয়েছে। ৩ জুন সদর উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের ভবানীপুর গ্রামের একটি আমবাগানে বজ্রপাতে মৃত্যু হয় মিরাজ নামের এক কিশোরের। একই দিনে মারা যান পৌর এলাকার মনিরুল ইসলাম। পরদিন বিকেল থেকে সন্ধ্যার মধ্যে সদর, শিবগঞ্জ ও নাচোল উপজেলায় বজ্রপাতে আরও ছয়জনের মৃত্যু হয়। সর্বশেষ ১৫ জুন শিবগঞ্জে আমবাগানে ফুটবল খেলার সময় একজনের মৃত্যু হয়।

শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাঁদের অধিকাংশই জানেন না বজ্রপাতের সময় কী করতে হয়। অনেকেই ঝড় শুরু হলেই আম কুড়াতে বাগানে ছুটে যান, যা মৃত্যুঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।

১৬টি বজ্রনিরোধক দণ্ড

জানা গেছে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় বাংলাদেশে বজ্রপাতের প্রবণতা ও মৃত্যুহার বিবেচনায় সরকার ২০১৫ সালে বজ্রপাতকে ‘দুর্যোগ’ ঘোষণা করে। সে জন্য ২০২১-২২ অর্থবছরে বজ্রনিরোধক যন্ত্র স্থাপনে সাড়ে ১৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। এ কর্মসূচির আওতায় দেশের ১৫ জেলার ১৩৫ উপজেলায় মোট ৩৩৫টি বজ্রপাত নিরোধক দণ্ড এবং বজ্রপাত নিরোধক যন্ত্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ সময় জেলার পাঁচ উপজেলায় ১৬টি বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন করা হয়। প্রতিটি দণ্ড স্থাপনে ব্যয় হয় প্রায় ৭ লাখ ৭২ হাজার ৫০০ টাকা।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে, প্রতিটি দণ্ডের মাথায় স্থাপিত ‘লাইটনিং অ্যারেস্টার’ আশপাশে সংঘটিত বজ্রপাতকে মাটিতে প্রবাহিত করবে এবং একই সঙ্গে বজ্রপাতের সংখ্যা গণনা করে সংরক্ষণ করবে। কিন্তু স্থাপনের চার বছর পরও এসব যন্ত্র কতটি বজ্রপাত প্রতিরোধ করেছে, তার কোনো তথ্য জেলা পর্যায়ে নেই। এমনকি যন্ত্রগুলো সচল নাকি অচল—সেটিও নিশ্চিতভাবে বলতে পারছেন না সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

পাঁচ উপজেলার একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, যন্ত্রগুলোর প্রযুক্তিগত অবস্থা পরীক্ষা করার মতো কোনো বিশেষজ্ঞ জেলা পর্যায়ে নেই। কেন্দ্রীয়ভাবে জিপিএস ব্যবস্থার মাধ্যমে পর্যবেক্ষণের কথা থাকলেও বাস্তবে তার তথ্য জেলা প্রশাসনের কাছে পৌঁছায় না। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর নিয়মিত বজ্রঝড়ের পূর্বাভাস প্রকাশ করে। তবে অনুসন্ধানে একাধিক কৃষক ও শ্রমিক জানান, তাঁরা মোবাইলে কোনো সতর্কবার্তা পাননি।

৩৭ হাজার হেক্টর জমিতে আমের আবাদ

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় সাড়ে ৩৭ হাজার হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়। মৌসুমজুড়ে হাজার হাজার শ্রমিক ও কৃষক আম সংগ্রহ, পরিবহন এবং বাজারজাতকরণ কাজে নিয়োজিত থাকেন।

গোমস্তাপুর উপজেলার আমচাষি এরশাদ আলী বলেন, বজ্রপাতের ঝুঁকি সম্পর্কে আগাম ধারণা থাকলে অনেকেই ওই সময় বাগানে যেত না। ফলে অনেকটাই বজ্রপাতে নিহতের সংখ্যা কমে আসত।

আমবাগান এবং খোলা মাঠ ঝুঁকিপূর্ণ

আবহাওয়াবিদ ও দুর্যোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, উঁচু গাছসমৃদ্ধ আমবাগান এবং খোলা মাঠ বজ্রপাতের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। কিন্তু জেলার প্রধান অর্থকরী ফসল আমকে ঘিরে কোনো বিশেষ বজ্রপাত নিরাপত্তা কর্মসূচি নেই।

সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা শাহিনুর আলম বলেন, ‘বজ্রপাতে হতাহত কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো জনসচেতনতা বৃদ্ধি। কিন্তু এ বিষয়ে পর্যাপ্ত প্রচার-প্রচারণা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম না থাকায় মানুষ এখনো ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ থেকে সরে আসছে না।’ তিনি বলেন, ‘ঝড়ের সময় আম কুড়াতে যাওয়ার প্রবণতা বহু পুরোনো। অনেকেই ঝড়ের মধ্যে বেশি আম পাওয়ার আশায় বাগানে ছুটে যান। কিন্তু তাঁরা বুঝতে পারেন না, কয়েক কেজি আমের জন্য নিজের জীবনকে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে ফেলছেন। বজ্রপাতের সময় খোলা স্থানে অবস্থান করা অত্যন্ত বিপজ্জনক।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত