Ajker Patrika

সাংবাদিক নেতাদের অবস্থান: এজলাসে গণমাধ্যমকে প্রবেশ করতে না দেওয়া সংবিধান বিরোধী

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
সাংবাদিক নেতাদের অবস্থান: এজলাসে গণমাধ্যমকে প্রবেশ করতে না দেওয়া সংবিধান বিরোধী
সুপ্রিম কোর্টের প্রধান ফটকের সামনে বুধবার আইন, বিচার, সংবিধান ও মানবাধিকার বিষয়ক সাংবাদিকদের সংগঠন ল’রিপোর্টার্স ফোরামের (এলআরএফ) অবস্থান কর্মসূচি। ছবি: আজকের পত্রিকা

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের এজলাসে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রবেশ করতে না দেওয়া সংবিধান বিরোধী বলে অভিযোগ করেছেন সাংবাদিক নেতারা। তারা অবিলম্বে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রবেশাধিকার ফিরিয়ে দিতে প্রধান বিচারপতির কাছে অনুরোধ করেন। অন্যথায় কঠোর কর্মসূচি দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন তারা।

আইন, বিচার, সংবিধান ও মানবাধিকার বিষয়ক সাংবাদিকদের সংগঠন ল’রিপোর্টার্স ফোরামের (এলআরএফ) অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে এই হুঁশিয়ারি দেন।

আজ বুধবার দুপুরে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান ফটকের সামনে এই কর্মসূচি পালন করা হয়।

এ সময় সাংবাদিক নেতারা বলেন, গত ৭ জানুয়ারি থেকে আপিল বিভাগসহ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিভিন্ন বিচারকক্ষে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার বন্ধ রয়েছে। এর ফলে বিচারাধীন মামলার কার্যক্রম সরাসরি পর্যবেক্ষণ এবং সংবাদ সংগ্রহে বাধার মুখে পড়ছেন তাঁরা।

সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও নিউএজ পত্রিকার সম্পাদক নুরুল কবীর অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে বলেন, একটা অন্যায় পদক্ষেপের জন্য সাংবাদিকদের প্রতিবাদ জানাতে হচ্ছে। এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। একটা রক্তাক্ত গণ–অভ্যুত্থানের পর লক্ষ্য ছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা, গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা, সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা। সেই সময়ে আদালতের কার্যক্রম গণমাধ্যমের মাধ্যমে মানুষকে জানানোর কথা ছিল। আমরা লক্ষ্য করছি, বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নেতৃত্ব তথ্য জানানোর অধিকার থেকে জনগণকে বঞ্চিত করছে।

নুরুল কবীর বলেন, অতীতে বিভিন্ন সরকার আদালতের বা বিচার বিভাগের টুটি চেপে ধরলে সংবাদমাধ্যম বিচার বিভাগের পক্ষ অবলম্বন করেছে। সেই সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব পালন করার ক্ষেত্রে যখন সর্বোচ্চ আদালত বাধার সৃষ্টি করে, তখন বিচার বিভাগের নেতৃত্বের গণতন্ত্র পরায়ণতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ওপেন কোর্টে বিচার করা বাংলাদেশের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। রাষ্ট্রের সংবিধান প্রদত্ত অধিকার ক্ষুণ্ন হলে সেটা সমুন্নত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষকে। সেই বিভাগ নিজে যদি সে অধিকার লঙ্ঘন করে এটা দুঃখজনক, দুর্ভাগ্যজনক এবং লজ্জাজনক ঘটনা।

সম্পাদক পরিষদের সভাপতি নুরুল কবীর বলেন, প্রকাশ্য আদালতে বিচারকার্য পরিচালনার নির্দেশনা লঙ্ঘন করে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত কোনো অবস্থাতেই সংবিধান লঙ্ঘনের অপরাধে নিজেদের অভিযুক্ত করবেন না, এটা সম্পাদক পরিষদের আশা। আমরা এ বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করার জন্য প্রধান বিচারপতির সাক্ষাৎ চেয়েও পাইনি। আশা করি প্রধান বিচারপতিসহ সম্মানিত বিচারপতিগণ এ বিষয়ের গুরুত্ব অনুধাবন করবেন। তাদের পরিষ্কার বোঝা দরকার, সংবাদ সংগ্রহের বিরুদ্ধে তারা যেই ধরনের কার্যক্রম করে যাচ্ছেন এটা পরিষ্কারভাবে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সংবিধান বিরোধী।

ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহীদুল ইসলাম বলেন, যখন মানুষ অধিকার বঞ্চিত হয়, অন্যায়ের শিকার হয়, তখন সে সর্বশেষ আস্থার জায়গা হিসেবে আদালতে যায় অধিকার ফিরে পাওয়ার জন্য। কিন্তু আদালত নিজেই যখন মানুষকে অধিকার থেকে বঞ্চিত করে, তখন মানুষ কোথায় যাবে? আজকের এই শান্তিপূর্ণ সমাবেশের মধ্য দিয়ে যদি অধিকার আদায় না হয়, তাহলে আমরা রাজপথে নামব।

শহীদুল ইসলাম প্রধান বিচারপতির উদ্দেশে বলেন, আপনি জানেন ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশের প্রধান বিচারপতি পালিয়ে গেছে, জাতীয় মসজিদের খতিব পালিয়ে গেছে, অনেক বিচারপতি পালিয়ে গেছে। আমরা সে পথে যেতে চাই না। তথ্যের অধিকার প্রতিষ্ঠা করুন। অন্যথায় আমাদের আরও কঠিন কর্মসূচি নিতে হবে। আমাদের সেদিকে যেতে বাধ্য করবেন না।

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি আবু সালেহ আকন বলেন, প্রধান বিচারপতির কাছে আমার জানতে ইচ্ছে করে-বিচারকক্ষে এমন কী করেন, যেটা জাতি জানতে পারবে না? আর সে জন্য সাংবাদিকদের আদালতে প্রবেশে বাধা দিচ্ছেন। এতে জাতির সন্দেহ জাগে। আমরা দেখেছি ফ্যাসিস্ট আমলে এই আদালতে ফরমায়েশি রায় হয়েছে। সেই রায়ের ভিত্তিতে অনেকের ফাঁসি হয়েছে। আমরা বাক স্বাধীনতা, লেখার স্বাধীনতার জন্য দীর্ঘদিন লড়াই করেছি। আমাদের লেখায়, পেশাগত কাজে বাধার সৃষ্টি করলে আমরা মেনে নেব না।

আবু সালেহ আরও বলেন, অপকর্মের কারণে সাবেক অনেক বিচারপতি এখন জেল খাটছে। অনেকে পালিয়ে গেছে। আমরা চাই না ভবিষ্যতে এইরকম আরও কোনো দৃষ্টান্ত হোক। আমি চাই এই প্রধান বিচারপতির মাধ্যমেই আমাদের বাক স্বাধীনতা, লেখার স্বাধীনতা আরও সুদৃঢ় হবে। তিনি তা না করলে আমরা আজ ফুটপাতে দাঁড়ালেও পরবর্তী কর্মসূচিতে রাস্তা অবরোধ করব। তখন কিন্তু আমাদের কোনো দায় দিতে পারবেন না।

সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকার আদায়ের জন্য প্রয়োজনে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে আলোচনা করুন। সাংবাদিকদের কাজে যেন কোনো ব্যাঘাত সৃষ্টি না হয়, সেই ব্যবস্থা করুন। তা না হলে সাংবাদিক সংগঠনগুলো ল’রিপোর্টার্স ফোরামের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন করবে।

সমাপনী বক্তব্যে এলআরএফের সভাপতি মুহাম্মদ ইয়াছিন বলেন, দাবি মানা না হলে শিগগিরই সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারকক্ষে প্রবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

ল’রিপোর্টার্স ফোরামের দাবির প্রতি সংহতি জানিয়ে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এমএম বাদশাহ, রিপোর্টার্স অ্যাগেইনস্ট করাপশনের সভাপতি শাফি উদ্দীন আহমদ, রিপোর্টার্স ফোরাম ফর ইলেকশন অ্যান্ড ডেমোক্রেসির (আরএফইডি) সভাপতি কাজী এমাদ উদ্দীন জেবেল (কাজী জেবেল), এলআরএফের সাবেক সভাপতি ও ইত্তেফাকের নির্বাহী সম্পাদক সালেহ উদ্দিন, আরটিভির হেড অব নিউজ ও ডিআরইউ’র সাবেক সভাপতি ইলিয়াস হোসেন, এলআরএফের সাবেক সভাপতি এম বদি-উজ-জামান, আশুতোষ সরকার, ওয়াকিল আহমেদ হিরন, শামীমা আক্তার, এলআরএফের সাবেক সেক্রেটারি হাবিবুর রহমান, দিদারুল আলম, সিনিয়র সদস্য সংকর মৈত্র ও সাজেদুল হক প্রমুখ।

অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ফোরামের সাধারণ সম্পাদক আরাফাত মুন্না। অবস্থান কর্মসূচিতে ফোরামের কার্যনির্বাহী কমিটির সহসভাপতি আবু সালেহ রনি, যুগ্ম সম্পাদক তানভীর আহমেদ, অর্থ সম্পাদক মনজুর হোসাইন, সাংগঠনিক সম্পাদক আহমেদ আল আমীন, দপ্তর সম্পাদক মাহমুদুল আলম, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক জাহিদুল বাশার, প্রশিক্ষণ ও কল্যাণ সম্পাদক জান্নাতুল ফেরদৌসী মানু, কার্যনির্বাহ সদস্য আসাদুর রহমান, এসএম নূর মোহাম্মদ ও রেজাউল করিম ছাড়াও দুই শতাধিক সাংবাদিক অংশ নেন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত