Ajker Patrika

টিসিবির ট্রাকসেল: লাইনে বিশৃঙ্খলা, দাঁড়িয়েও পণ্য পাচ্ছেন না অনেকে

  • কিছু নারী-পুরুষ চক্র সৃষ্টি করেছে বলে অভিযোগ
  • ডিলারের ট্রাক নিয়ে ফিরে যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে
‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
টিসিবির ট্রাকসেল: লাইনে বিশৃঙ্খলা, দাঁড়িয়েও পণ্য পাচ্ছেন না অনেকে
ফাইল ছবি

সকাল সাড়ে ১০টা। রাজধানীর কাকরাইল মোড়ে টিসিবির সাশ্রয়ী মূল্যের পণ্যের একটি ট্রাক এসে থামতেই হই হই রব পড়ে গেল। চোখের পলকে ট্রাকের পেছনে শদেড়েক নারী-পুরুষ জমা হয়ে গেল। লাইনে দাঁড়ানো নিয়ে শুরু হলো চরম বিশৃঙ্খলা। অনেক কষ্ট করে ডিলারের লোকজন শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে বেলা সোয়া ১১টার দিকে পণ্য বিক্রি শুরু করলেন। ঘণ্টাদেড়েক ভালোভাবে চলার পর আবার ঘটল বিপত্তি। পুরো ব্যাপারটার ওপর বেশ কিছু সময় নজর রেখে এ প্রতিবেদক দেখলেন সমস্যার নানা দিক।

লোকজন লাইনে দাঁড়ানোর পর ঠিকঠাক বিক্রি শুরু হয়েছিল। দেড় শ প্যাকেজ পণ্য বিক্রিও হয়ে গেল। ঝামেলা বাধল কয়েকজন নারী ক্রেতা দ্বিতীয়বার পণ্য নিতে এলে। লাইনে থাকা অন্য মহিলারা প্রতিবাদ করায় বেধে গেল গন্ডগোল। নারীদের দুই দলের কোন্দলের মাঝখানে পড়ল পণ্যের ট্রাক। অনেকে তেড়ে গেল ডিলারের দিকে। তাঁর ‘অপরাধ’ সে কেন লাইনের শৃঙ্খলা ধরে রাখতে পারেননি। এমন অবস্থায় বেলা পৌনে ১টার দিকে পণ্য বিক্রি বন্ধ করে টিসিবির সংশ্লিষ্ট অফিসে ফিরে যান ডিলার সামসুল হক সোহেল।

বেলা দেড়টার দিকে ফোনে পরিস্থিতি জানতে চাইলে সোহেল বলেন, ‘নারীদের দুই পক্ষের মারামারিতে পণ্যের ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। অনেকে ট্রাকে ওঠার চেষ্টাও করেছে। এতে আমি ভয় পেয়ে যাই। টিসিবির আঞ্চলিক কার্যালয়ে ফোন দিয়ে বিষয়টি জানাই। এ ছাড়া তাদের পরামর্শে ভিডিও কল দিয়ে পরিস্থিতি দেখাই। তখন আমাকে নিরাপদে পণ্য নিয়ে সরে যেতে বলা হয়।’

বেলা পৌনে ২টার দিকে আবার কাকরাইল মোড়ে গিয়ে আশপাশের বিভিন্ন লোকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কিছুসংখ্যক নারী ক্রেতা লাইনে দাঁড়িয়ে পণ্য কিনে রাস্তার পাশে একজনের দায়িত্বে রেখে আবার গিয়ে লাইনে দাঁড়ান। ওই নারী ক্রেতারা কেউই আশপাশের নন। এ নিয়েই গন্ডগোল বাধে।

এলাকায় থাকা কয়েকজন এ-ও বলেন, এ ক্ষেত্রে ডিলারের আরও শক্ত ভূমিকা দরকার ছিল। তাঁর লোকজন লাইনের শৃঙ্খলা রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন।

কাকরাইল মোড়ে কথা হয় জুতা মেরামতকারী মো. মিলনের সঙ্গে। তিনিও বললেন, কয়েকজন নারীর মধ্যে ঝগড়া বাধলে পণ্য বিক্রি বন্ধ হয়ে যায়। মিলনের মতে, কয়েকবার পণ্য নেওয়ার চেষ্টা করা ওই নারীরা খিলগাঁও, মুগদা, মান্ডাসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে দল বেঁধে আসেন। একজন লাইনে দাঁড়ান, তিনজন পণ্য নেন। তাঁরা এক ট্রাক থেকে সুলভে পণ্য নিয়ে আবার আরেক ট্রাকের খোঁজে অন্য জায়গায় যান। তাঁদের একটা চক্র রয়েছে।

পবিত্র রমজান উপলক্ষে গত মঙ্গলবার থেকে ট্রাকসেল কার্যক্রম শুরু করেছে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। দৈনিক ট্রাকপ্রতি ৪০০ জন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে ভোজ্যতেল, চিনি, ডাল, ছোলা ও খেজুর এই পাঁচটি পণ্য বিক্রি করছে সরকারি সংস্থাটি।

টিসিবির ট্রাকসেলের সময় লাইনে হুড়োহুড়িসহ বিশৃঙ্খলা নতুন নয়। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রায়ই এমন দৃশ্য দেখা যায়। চাহিদার তুলনায় পণ্যের পরিমাণের সীমাবদ্ধতাও এর একটি কারণ। গত বুধবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে ট্রাকের পণ্য বিক্রির সময় হুড়োহুড়ি করে কয়েকজনকে লাইন থেকে ছিটকে পড়তে দেখা যায়। এদিন মোহাম্মদপুরেও সিরিয়াল নম্বর নিয়ে ব্যাপক হুড়োহুড়ি হয়েছে। আগের দিন মঙ্গলবার রাজশাহীতে টিসিবির পণ্যের লাইনে দাঁড়িয়ে হাতাহাতি হয়।

গত বছরের মার্চ মাসে নাটোরে টিসিবির পণ্য নিতে গিয়ে মারামারিতে পাঁচজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

সিন্ডিকেটের অভিযোগ

ডিলারের পাশাপাশি সাধারণ ক্রেতাদেরও অনেকের অভিযোগ, সব ট্রাকসেলের জায়গায় নারী ও পুরুষদের একটি সিন্ডিকেট বা চক্র গড়ে উঠেছে। এতে প্রকৃত উপকারভোগীরা ঠিকমতো পণ্য পাচ্ছেন না। বিশৃঙ্খলার কারণে প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও অনেক নিম্নবিত্ত ক্রেতা লাইনে দাঁড়ানই না। বিশেষ করে বয়স্ক ক্রেতারা দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়েও বিশৃঙ্খলার কারণে পণ্য কিনতে পারেন না।

টিসিবির মুখপাত্র ও উপপরিচালক (বাণিজ্যিক) মো. শাহাদত হোসেন বলেন, ‘আমরা নানাভাবে লাইনের শৃঙ্খলা রাখার চেষ্টা করেছি। স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিদের চিঠি দিয়ে পণ্য বিক্রির বিষয়ে আগেই জানিয়ে রাখছি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বলা আছে আগে থেকেই। সব জায়গায় তাদের থাকার কথা রয়েছে। এ ছাড়া পণ্য বিক্রির জন্য টোকেন সিস্টেম করেছি; কিন্তু এরপরও বিশৃঙ্খলা হচ্ছেই।’

শাহাদত হোসেন আরও বলেন, ‘একসঙ্গে অনেক লোক এসে যদি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে তখন ডিলারের পক্ষে তা সামাল দেওয়া সম্ভব হয় না। অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোকজনও ঠিকভাবে সহায়তা করেন না।’

গতকাল কাকরাইল মোড় ছাড়াও রামপুরা বাজারের বিপরীতের ডিআইটি রোড, মহাখালীর নাবিস্কো মোড়, সচিবালয়, চকবাজার, কলোনি গেট তেজগাঁওসহ মোট ৫০টি জায়গায় ট্রাক থেকে টিসিবির পণ্য বিক্রি করা হয়। এসব জায়গার কয়েকটিতে ঘুরে পণ্যের জন্য দীর্ঘ লাইন আর লাইনে দাঁড়ানো লোকের মধ্যে অস্থিরতা দেখা যায়।

বেলা পৌনে ৩টায় পূর্ব রামপুরায় মূল সড়কের পাশে টিসিবির ডিলার প্রতিষ্ঠান সাদ এন্টারপ্রাইজের পণ্য বিক্রি হতে দেখা যায়। ট্রাকের পেছনে প্রায় আড়াই শ ক্রেতা লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। অথচ তখন পণ্য ছিল ২০০ জনেরও কম ক্রেতার। অনেকে প্রায় ১ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে রয়েছেন বলে জানান।

এখানে কথা হয় ষাটোর্ধ্ব হোসেন মিয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘অনেক ক্ষণ ধইরা খাড়াই রইছি। একে তো রইদ, তার ওপর লাইনের চাপ। দম বাইর হইয়া যায় প্রায়। তার পরও যদি জিনিস পাই, তবুও ভালো।’

আগামী ১২ মার্চ পর্যন্ত টিসিবির ট্রাকসেল কার্যক্রম চালু থাকবে। প্রতিদিন রাজধানীতে ৫০টিসহ দেশের বিভিন্ন বিভাগ ও জেলা শহরে মোট ৪৫০টি ট্রাকে করে এসব পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে। রোজার দুটি বাড়তি পণ্য ছোলা প্রতি কেজি ৬০ ও খেজুর ১৬০ টাকা দরে বিক্রি করা হয়। এ ছাড়া ভোজ্যতেল প্রতি লিটার ১১৫, চিনি ৮০ ও মসুর ডাল ৭০ টাকা কেজি। এটা প্রয়োজনের তুলনায় পরিমাণে অনেক কম হলেও দুর্মূল্যের বাজারে বেশ কিছু মানুষকে স্বস্তি দিচ্ছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত