Ajker Patrika

রাজধানীর মানিকদী: গণ-অভ্যুত্থানের পর আবাসনে তিনবার হামলা

আমানুর রহমান রনি, ঢাকা
রাজধানীর মানিকদী: গণ-অভ্যুত্থানের পর আবাসনে তিনবার হামলা
ফাইল ছবি

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর রাজধানীর মানিকদীতে আবাসন প্রকল্প এলাকায় অন্তত তিনবার হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। জমির দখল ও পাল্টা দখল নিয়ে আবাসন কোম্পানিগুলো এই সংঘর্ষে জড়ায়। এসব আবাসন কোম্পানির পেছনে ক্ষমতাধর ব্যক্তি ও রাজনীতিকেরা রয়েছেন। ভুক্তভোগী ও স্থানীয় এবং পুলিশের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

সর্বশেষ কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওসহ নিউগিনি প্রপার্টিজে হামলার আগে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান পাল্টাপাল্টি মামলাও করেছে। নিউগিনি কর্তৃপক্ষ বিরোধপূর্ণ আবাসন এলাকায় সালমান মুক্তাদিরকে জমি লিজ দিয়ে তাঁর ইমেজ ব্যবহার করে প্রভাব দেখাতে চেয়েছিল কি না, সেই তদন্তও করছে পুলিশ।

গত শনিবার রাতে ক্যান্টনমেন্ট থানার ইসিবি চত্বরের দক্ষিণ মানিকদীর নিউগিনি প্রপার্টিজে হামলার ঘটনা ঘটে। ভাড়াটে সন্ত্রাসী দিয়ে এই হামলা চালানো হয় বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। মূলত দখল ও পাল্টা বেদখলকে কেন্দ্র করে এই হামলার ঘটনা ঘটে। হামলায় দেশীয় ও আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করেছে সন্ত্রাসীরা। তবে এর আগেও নিউগিনি প্রপার্টিজে একাধিক হামলার ঘটনা ঘটেছে।

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হামলার শিকার নিউগিনির বিরুদ্ধেও ওই এলাকায় হামলার অভিযোগ আছে।

তবে নিউগিনি প্রপার্টিজের চেয়ারম্যান নাজিম উদ্দিন ভূঁইয়ার দাবি, তাঁরা সব সময় হামলার শিকার হয়েছেন। তাঁর কাছে সর্বশেষ হামলার আগে চাঁদা দাবি করা হয়েছে। এই ঘটনায় তিনি ক্যান্টনমেন্ট থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন। তবে সে বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি পুলিশ। এরপরই হামলার ঘটনা ঘটে বলে তাঁর অভিযোগ।

তবে পুলিশ জানিয়েছে, একাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিউগিনি মালিকপক্ষের মামলা রয়েছে। এমনকি চেয়ারম্যান নাজিম উদ্দিনের বিরুদ্ধেও পাঁচটি মামলা থাকার কথা জানিয়েছে পুলিশ।

পুলিশ ও আবাসন প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ হামলার শিকার হওয়ার আগে ২০২৪ সালের ৭ আগস্ট রাতে একবার নিউগিনি হাউজিংয়ের ভেতরে অনলাইন গ্রুপের স্থাপনায় হামলা হয়েছিল। ওই এলাকার বাসিন্দা সাহেরা বেগম নামে এক নারীও ওই হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

ওই ঘটনায় পুলিশ তদন্ত করে জানতে পারে, অনলাইন গ্রুপ নামে একটি ডেভেলপার কোম্পানির বিরোধে এই ঘটনা ঘটে। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর অনলাইন গ্রুপের এমডি ঢাকা উত্তর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি খান মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামান আত্মগোপনে থাকার সুযোগে নিউগিনির মালিক ভাড়াটে সন্ত্রাসী দিয়ে অনলাইন গ্রুপের জমি দখল করে নেন। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি আক্তারুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করে বিলুপ্ত র‍্যাব (বর্তমানে এসআরবি)। এই সুযোগে নিউগিনি ওই এলাকায় অনলাইন গ্রুপসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি মালিকানাধীন বিরোধপূর্ণ জমি দখল করে নেয়। তবে অনলাইন গ্রুপের সঙ্গে যেসব ক্ষমতাসীন ব্যক্তি রয়েছেন, তাঁরা বর্তমানে ওই বিরোধপূর্ণ জমি আবার উদ্ধারের চেষ্টা করছেন। এ নিয়ে অনলাইন গ্রুপের সঙ্গে দ্বন্দ্ব চলছে।

এ বিষয়ে অনলাইন গ্রুপের প্রকৌশলী আব্দুর রহমান বলেন, নিউগিনির সঙ্গে কিছু ঘটনা ঘটেছিল। তবে এ বিষয়ে তিনি এখন কথা বলতে চান না।

এ ছাড়া ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে দক্ষিণ মানিকদী গ্রামে যাওয়া-আসার পথে মসজিদ স্থাপন ও শ্রমিকদের জন্য থাকার ঘর নির্মাণ করে নিউগিনি। এরপর এলাকাবাসী সেখানে হামলা করেন। এ নিয়েও ক্যান্টনমেন্ট থানায় অভিযোগ রয়েছে।

একটি সূত্র জানিয়েছে, নিউগিনি মূলত সালমান মুক্তাদিরের পরিচিতি ব্যবহার করতে চেয়েছিল। ওই বিরোধপূর্ণ এলাকায় তাঁর ষ্টুডিওর জন্য জমি লিজ দিয়ে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখতে চেয়েছিল। তবে মুক্তাদির বিষয়টি জানতেন না এবং বুঝতেও পারেননি।

ঘটনার পর মুক্তাদিরও বলেছেন, তাঁর কাছে কেউ সরাসরি চাঁদা চাননি। তবে জমির মালিকের কাছে চাঁদা চাওয়া হয়েছে বলে তিনি শুনেছেন।

সালমানকে বিরোধপূর্ণ জমি দিয়েছেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে নিউগিনির মালিক চেয়ারম্যান নাজিম উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, ‘আমার প্রতিষ্ঠানের জমি আমি চার বছরের জন্য তাঁকে লিজ দিয়েছি।’

প্রকল্পের অন্য এলাকায় বহুতল ভবন করলেও এখানে কেন টিনশেড করে রেখেছেন—এর জবাবে নাজিম বলেন, ‘এটা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার, তাই করছি না।’ তবে তিনি স্বীকার করেন, ১০ কাঠা জমি কিনেছিলেন, সেই জমি বুঝিয়ে না দিয়ে উল্টো জমি দখল করে রেখেছেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নিউগিনির প্রকল্প এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের বাড়িঘর রয়েছে। তবে ভেতরের একটি সড়ক ব্যবহার নিয়ে দক্ষিণ মানিকদীর গ্রামবাসীর সঙ্গে তাদের বিরোধ রয়েছে। ইসিবি চত্বরের ভেতর দিয়ে নিউগিনি হাউজিংয়ে ১ নম্বর ফটক ব্যবহার করে ভেতরের সড়ক দিয়ে এলাকাবাসী ৪ নম্বর ফটক দিয়ে নামাপাড়ায় বের হতে পারেন। তবে নিউগিনি কর্তৃপক্ষ ১ নম্বর ফটকটি বন্ধ করে দিয়েছে। এটা নিয়ে এলাকাবাসীর ক্ষোভ রয়েছে।

আব্দুস সালাম নামে মানিকদীর এক ব্যক্তি বলেন, ‘এই ফটকটি বন্ধ করে দেওয়ায় আমাদের অনেক পথ ঘুরতে হয়।’

তিন অস্ত্রধারী শনাক্ত, আসামি বিএনপি-জামায়াত-আ. লীগের কর্মী

এদিকে নিউগিনি আবাসনে হামলার ঘটনায় আজ রাত পর্যন্ত পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

ক্যান্টনমেন্ট থানার পরিদর্শক (অপারেশন) সুব্রত দেবনাথ বলেন, এই পাঁচজনের মধ্যে একজনকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। থানা-পুলিশ যে চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে তাদের পাঁচ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের পরিচয়ের বিষয়ে সুব্রত দেবনাথ বলেন, গ্রেপ্তার আসামিদের মধ্যে মামলার ১ নম্বর আসামি শাহরিয়া মাহমুদ মাদ্রাসার শিক্ষক। তবে তিনি একসময় প্রজন্ম লীগ করতেন। অন্যরা শ্রমিক গোছের। ভাষানটেক বস্তিতে বসবাস করে। তবে মামলার ২ নম্বর আসামি আবুল কাশেম ক্যান্টনমেন্ট থানা জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বলে জানা গেছে। অপর দিকে হামলায় অংশ নেওয়া ইব্রাহীমসহ কয়েকজন স্থানীয় যুবদলের কর্মী বলে জানা গেছে। তবে এ বিষয়ে তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।

ইতিমধ্যে অস্ত্রধারী তিনজনকে শনাক্ত করেছে পুলিশ। তাঁদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা করছে।

এ বিষয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম আজকের পত্রিকাকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকায় আবাসন ব্যবসা নিয়ে বিরোধ আছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, ৩৫ কাঠা জমি উদ্ধার করে দিতে পারলে জমির একটি অংশের মালিকানা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি পেয়ে মামলার ১ নম্বর আসামি শাহরিয়া মাহমুদ হামলার পরিকল্পনা ও লোক জড়ো করার দায়িত্ব নেন। মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগের স্থানীয় নেতা শাহ আলম অনিক তাঁকে লোকজন জড়ো করতে সহযোগিতা করেন। অন্যদিকে মুন্না ও মামুন ভাষানটেক বস্তির বাসিন্দা এবং আসলাম পেশায় অটোরিকশাচালক। তাঁদের বিরুদ্ধে ভাড়া করা লোকজনের সঙ্গে হামলায় অংশ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সর্বশেষ গ্রেপ্তার মিজানুর রহমান মামলার এজাহারভুক্ত ৯ নম্বর আসামি।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত