Ajker Patrika

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত: রোমাঞ্চকর সেবায় নেই নিরাপত্তা ও নজরদারি

মাইনউদ্দিন শাহেদ, কক্সবাজার
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত: রোমাঞ্চকর সেবায় নেই
নিরাপত্তা ও নজরদারি
কক্সবাজার সৈকতে প্যারাসেইলিং করছেন পর্যটকেরা। সম্প্রতি দরিয়ানগর পয়েন্ট থেকে তোলা। ছবি: আজকের পত্রিকা

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে বেড়াতে আসা পর্যটকদের কাছে প্যারাসেইলিং, ওয়াটার বাইক, টায়ার টিউব ও বিচ বাইক এখন জনপ্রিয় বিনোদনের অংশ। তবে এই রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার আড়ালে নিরাপত্তা, তদারকি ও অনুমোদন নিয়ে দীর্ঘদিনের নানা প্রশ্ন রয়ে গেছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি দুর্ঘটনায় প্রাণহানির পর বিষয়গুলো নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এখন প্রশ্ন উঠেছে, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলো কতটা কার্যকর ভূমিকা পালন করছে।

গত শনিবার কক্সবাজার শহরের অদূরে মেরিনড্রাইভসংলগ্ন দরিয়ানগরে প্যারাসেইলিং করার সময় প্রায় ৩০০ ফুট ওপর থেকে ছিটকে সমুদ্রে পড়ে অক্ষর সৌভিক রায় (৩১) নামে এক তরুণের মৃত্যু হয়েছে। এই সৈকতে ফ্লাই এয়ার সি স্পোর্টস নামের প্যারাসেইলিং প্রতিষ্ঠানে এই ঘটনা ঘটে। প্রায় এক দশক ধরে প্রতিষ্ঠানে প্যারাসেইলিং করার সময় বেশ কয়েকজন পর্যটক আহত হন। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি প্রশাসন। অক্ষর সৌভিকের মৃত্যুর পর কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান জানিয়েছেন, সৈকতে প্যারাসেইলিং পরিচালনার জন্য অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানকে জেলা প্রশাসন থেকে কোনো ধরনের অনুমোদন দেওয়া হয়নি।

অথচ শহরের বাহারছড়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ ফরিদ সৈকতের বালিয়াড়ি দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করে প্যারাসেইলিং প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে আসছিলেন। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ২০২০ সালে জেলা প্রশাসন দরিয়ানগর সৈকতে সাগরলতা পুনরুদ্ধারে একটি প্রকল্প নিয়েছিল। ওই প্রকল্পের জায়গা দখল করেই ফরিদ প্যারাসেইলিংয়ের মালপত্র ও কর্মী থাকার জন্য তিন-চারটি বাড়ি নির্মাণ করেছিলেন। এর পাশে প্রেসিডেন্ট বিচ ও প্যাচারদ্বীপ সৈকতে আরও চারটি প্যারাসেইলিং প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

গত রোববার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহান স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে সমুদ্রসৈকতে অনুমোদনহীন ও ঝুঁকিপূর্ণ প্যারাসেইলিং বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এতে বলা হয়, সৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে অস্থায়ীভাবে অনুমোদিত প্যারাসেইলিং ২০২৪ সালের ৩০ জুন শেষ হয়েছে। এরপর আর কোনো প্রতিষ্ঠানকে প্যারাসেইলিং অনুমোদন দেওয়া হয়নি। পর্যটকদের নিরাপত্তা ও বিশ্বমানের পর্যটনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্যারাসেইলিং বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

অপর দিকে শহরের লাবণী থেকে কলাতলীর তিন কিলোমিটার সৈকতে ওয়াটার বাইক, বিচ বাইক ও টায়ার টিউবে চড়ে সমুদ্র দর্শন করেন প্রতিদিন হাজারো পর্যটক। ২০২৪ সালের ২১ অক্টোবর ওয়াটার বাইক থেকে ছিটকে পড়ে এক পর্যটকের মৃত্যু হয়। হরহামেশা ওয়াটার বাইক ও টায়ার টিউবে চড়ার সময় ছিটকে পড়ে আহত হন পর্যটক। অনেক পর্যটক সৈকতে গোসলের সময় ওয়াটার বাইকের ধাক্কায় আহত হওয়ার ঘটনাও রয়েছে। এসব সৈকতে জেলা প্রশাসনের ৪৫টি ওয়াটার বাইকের অনুমোদন রয়েছে।

ওয়াটার বাইকের অধিকাংশ চালক দক্ষ বলে দাবি করেছেন সৈকতের ওয়াটার বাইক মালিক সমিতির সহসভাপতি মোহাম্মদ সোহেল। তিনি বলেন, ‘আমরা পর্যটকদের নিয়মকানুন সম্পর্কে অবগত করি। তবে কেউ কেউ তা মানতে চান না। ফলে মাঝেমধ্যে বেশি ওজনের কেউ বাইকে চড়লে দুর্ঘটনা ঘটে।’

কার অনুমতিতে চলছে এসব

সৈকতে অ্যাডভেঞ্চার পর্যটন পরিচালনার সঙ্গে একাধিক সরকারি সংস্থার সম্পৃক্ততা রয়েছে। জেলা প্রশাসন, স্থানীয় প্রশাসন, পর্যটনসংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, সমুদ্র নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট বাহিনী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার বিভিন্ন পর্যায়ের অনুমোদন ও তদারকির বিষয় রয়েছে। পর্যটকদের সঙ্গে আলাপে জানা গেছে, তাঁদের অনেকে জানতেই পারেন না কোন প্রতিষ্ঠান বৈধ অনুমোদনপ্রাপ্ত। কারা নিয়মিত নিরাপত্তা পরীক্ষা করে এবং দুর্ঘটনা ঘটলে ক্ষতিপূরণ বা দায়বদ্ধতার কাঠামো কী।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজারের সভাপতি করিম উল্লাহ কলিম বলেন, ‘কক্সবাজারে পর্যটকদের জন্য সমুদ্র দেখা ছাড়া তেমন কোনো বিনোদনের ব্যবস্থা নেই। ফলে অ্যাডভেঞ্চারভিত্তিক পর্যটন ক্রমাগত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ফলে আন্তর্জাতিক মান বিবেচনা করে সৈকতে অ্যাডভেঞ্চার পর্যটনের প্রসার দরকার।’

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কক্সবাজার কার্যালয়ের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন বলেন, ‘কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে সৈকতে প্যারাসেইলিংয়ের অনুমোদন নেয়নি। গোসলে নেমে কোনো পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দা ডুবে গেলে কিংবা নিখোঁজ হলে উদ্ধার তৎপরতা চালানোর জন্য চট্টগ্রাম থেকে ডুবুরি আনতে হয়।’

নিরাপত্তা সরঞ্জাম নিয়েও প্রশ্ন

প্যারাসেইলিংয়ের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে মানসম্মত হারনেস, লাইফ জ্যাকেট, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টো-বোট, নির্ধারিত ওজনসীমা, বাতাসের গতিবেগ পরিমাপ এবং প্রশিক্ষিত অপারেটর। এ ছাড়া প্যারাসেইলিংয়ের দড়ি, ক্যারাবিনার, হারনেস, প্যারাস্যুট, উইঞ্চ এবং টো-বোট নির্দিষ্ট সময় পরপর পরীক্ষা ও প্রতিস্থাপন করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু কক্সবাজারে ব্যবহৃত সরঞ্জাম কত দিন পরপর পরীক্ষা করা হয়, কে পরীক্ষা করে এবং তার কোনো নথি পাওয়া যায়নি।

পর্যটকের অভিযোগ, মাত্র কয়েক মিনিটের মৌখিক নির্দেশনা দিয়েই উড়তে পাঠানো হয়। নিরাপত্তা সরঞ্জামের মান বা মেয়াদ সম্পর্কে কোনো তথ্য জানানো হয় না।

ওয়াটার বাইকেও পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ছাড়াই পর্যটকদের চালাতে দেওয়া হয়। একই এলাকায় একাধিক জলযান দ্রুত চলায় অনেক সময় সংঘর্ষের ঝুঁকিও থাকে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজার শহর থেকে টেকনাফ পর্যন্ত ১২০ কিলোমিটার সৈকতে অ্যাডভেঞ্চার পর্যটন ও গোসলে নেমে বিপদে পড়া পর্যটকদের উদ্ধারে সরকারি কোনো ব্যবস্থা নেই। কেবল শহরের লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী সৈকতে সি সেফ নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ১২ বছর ধরে লাইফ গার্ড সেবা দিয়ে আসছে। এই তিন পয়েন্টে এই সময়ে তারা ১ হাজার ৪৩ জন পর্যটক ও স্থানীয় জনগণকে জীবিত উদ্ধার করেছে।

সি সেফ লাইফ গার্ডের সুপারভাইজার সাইফুল্লাহ সিফাত জানান, তাঁদের ২৭ জন সদস্য পালাক্রমে সৈকতে নেমে বিপদে পড়া পর্যটকদের উদ্ধারে কাজ করছেন।

এদিকে সৈকতে গোসলে নেমে আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানোর জন্য জেলা বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির একটি অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও সেটি দীর্ঘদিন অকেজো অবস্থা পড়ে রয়েছে। এ ছাড়া পর্যটকদের উদ্ধারে ট্যুরিস্ট পুলিশের কাছে তিনটি ওয়াটার বাইক থাকলেও সেগুলো অচল।

সৈকতে কোনো প্রতিষ্ঠানের প্যারাসেইলিংয়ের অনুমোদন নেই জানিয়ে জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান বলেন, ‘জেলা প্রশাসন থেকে এসব কর্মকাণ্ড বন্ধে বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সৈকতের অ্যাম্বুলেন্সটি দ্রুত সংস্কার করে সচল করা হবে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত