Ajker Patrika

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক উন্নয়ন প্রকল্প: সরকারি নথির সঙ্গে মাঠপর্যায়ের তথ্যের অমিল

ফটিকছড়ি (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি 
আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০২৬, ১৬: ৩৯
ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক উন্নয়ন প্রকল্প: সরকারি নথির সঙ্গে মাঠপর্যায়ের তথ্যের অমিল
বিতরণের পর পরই অসুস্থ হয়ে মারা গেছে ছাগল। ছবি: আজকের পত্রিকা

চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে সমতল ভূমিতে বসবাসরত অনগ্রসর ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন প্রকল্পে ২০০ উপকারভোগীর মধ্যে ৪০০ ছাগলসহ বিভিন্ন উপকরণ বিতরণের সরকারি নথির সঙ্গে মাঠপর্যায়ের তথ্যের অমিলের অভিযোগ উঠেছে। সেই সঙ্গে বিতরণে অনিয়ম ও অস্বচ্ছতার কারণে প্রকল্পের সুফলবঞ্চিত হয়েছেন সুবিধাভোগীরা।

কয়েকজন উপকারভোগী দাবি করেছেন, তাঁদের নামে মাস্টাররোলে থাকা স্বাক্ষর তাঁদের নয়। তাছাড়া খাদ্য ও নির্মাণ সামগ্রী সহায়তা যে পরিমাণে পাওয়ার কথা ছিল তার অর্ধেক প্রাপ্তি, বিতরণের পর পরই ছাগল অসুস্থ হয়ে মারা যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের মাস্টাররোল অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দুই দফায় উপকারভোগীদের মধ্যে ছাগল, খাদ্য, ফ্লোর ম্যাট, সিআই শিট ও কংক্রিট পিলার বিতরণ করা হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে ১০০ উপকারভোগীর প্রত্যেককে দুটি ছাগল, ২৫ কেজি খাদ্য, পাঁচটি ফ্লোর ম্যাট ও ২ হাজার ৫০০ টাকা নগদ সহায়তা দেওয়ার কথা। এ পর্যায়ের বিতরণের শেষ সময় ছিল ২০২৫ সালের ২২ সেপ্টেম্বর।

দ্বিতীয় পর্যায়ে আরও ১০০ উপকারভোগীকে দুটি ছাগল, ৫০ কেজি খাদ্য, পাঁচটি ফ্লোর ম্যাট, দুটি সিআই শিট ও চারটি কংক্রিট পিলার দেওয়ার তথ্য রয়েছে। এ পর্যায়ের বিতরণের শেষ সময় ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬।

মাস্টাররোলে উপকারভোগীদের নাম, পিতা বা স্বামীর নাম, ঠিকানা, মোবাইল নম্বর ও স্বাক্ষর রয়েছে। এসব তথ্য ধরে গত ২২ থেকে ২৪ আগস্ট দাঁতমারা ইউনিয়নের সোনারখীল ও পেলারখীল, নারায়ণহাটের নেপচুন এবং বাগানবাজারের রামগড় চা-বাগান এলাকায় কয়েকজন উপকারভোগীর তথ্য যাচাই করা হয়।

মায়ালক্ষ্মী ত্রিপুরা, ললিন্দ্র ত্রিপুরা, কাঞ্চন কুমার ত্রিপুরা, মজিব ত্রিপুরা, সশিন্দ্র ত্রিপুরা, মাধুরী ত্রিপুরা, কাঞ্চন মালা ত্রিপুরা, নিরেন্দ্র ত্রিপুরা, সোনালক্ষ্মী ত্রিপুরা, সংগ্রাম ত্রিপুরা, শিবু কুমার ত্রিপুরা, মনিবালা ত্রিপুরা ও চাকষী ত্রিপুরা জানান, তাঁরা মাস্টাররোলে স্বাক্ষর করেননি। তবে তাঁদের নাম, পিতা বা স্বামীর নাম, মোবাইল নম্বর ও ঠিকানা সঠিক রয়েছে বলে তাঁরা নিশ্চিত করেছেন।

প্রকল্পের নিয়ম অনুযায়ী, বিতরণের আগে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সরবরাহ করা ছাগল প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ভেটেরিনারি সার্জনের মাধ্যমে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও পিপিআর টিকা দেওয়ার কথা। এরপর সংক্রমণমুক্ত ও সুস্থ ছাগল বিতরণের বিধান রয়েছে।

তবে অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই তড়িঘড়ি করে ছাগল বিতরণ করা হয়েছে। বিতরণের আগে প্রকল্পের বিতরণ কমিটির সভাপতি ও সদস্যদের যথাযথভাবে অবহিত করা হয়নি বলেও অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্প পরিচালকের স্বাক্ষরিত কার্যাদেশের কপি হাতে পাওয়ার আগেই ছাগল বিতরণ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের যোগসাজশে দ্রুত ছাগল বিতরণ করা হয়েছে। ফলে ছাগলগুলোর স্বাস্থ্য পরীক্ষা, পিপিআর টিকা এবং সংক্রমণমুক্ত করার প্রক্রিয়া যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

কোন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ছাগল সরবরাহ করেছে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেনি উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার কার্যালয়। কার্যালয় থেকে ছাগল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের নাম, সরবরাহসংক্রান্ত নথি, স্বাস্থ্য পরীক্ষার সনদ কিংবা টিকাদানের স্বতন্ত্র রেকর্ডও পাওয়া যায়নি।

প্রথম পর্যায়ে ১০০ উপকারভোগীর প্রত্যেককে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে মোট ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা নগদ সহায়তা দেওয়ার কথা ছিল। তবে মাঠপর্যায়ে এ অর্থ বিতরণের সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অর্থ বিতরণের পৃথক রসিদ বা ভাউচার, ব্যাংক কিংবা মোবাইল ব্যাংকিং লেনদেনের নথিও পাওয়া যায়নি।

প্রকল্পের ফিল্ড ফ্যাসিলিটেটর থোয়াইংনিং মার্মা বলেন, ‘২ হাজার ৫০০ টাকা করে নগদ সহায়তার বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। ফলে অর্থ বিতরণ করা হয়নি।’

তবে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আবদুল মমিন ভিন্ন দাবি করেছেন। তিনি বলেন, ‘প্রকল্পের সব উপকরণ ও অর্থ উপকারভোগীদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে, প্রকল্পটি শেষ পর্যায়ে রয়েছে।’

প্রথম পর্যায়ে পাঁচটি করে ফ্লোর ম্যাট দেওয়ার কথা থাকলেও সরেজমিনে যাচাই করা অধিকাংশ উপকারভোগী তা পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারেননি। তবে তাঁরা ২৫ কেজি করে দানাদার খাদ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছেন।

দ্বিতীয় পর্যায়ে সরকারি নথিতে ৫০ কেজি করে খাদ্য দেওয়ার কথা থাকলেও কয়েকজন উপকারভোগী জানান, তাঁরা এর অর্ধেক পরিমাণ পেয়েছেন।

দ্বিতীয় পর্যায়ে ১০০ উপকারভোগীর মধ্যে ২০০টি সিআই শিট ও ৪০০টি কংক্রিট পিলার বিতরণের তথ্য রয়েছে। তবে সরেজমিনে যাচাই করা উপকারভোগীদের বাড়িতে এসব উপকরণ দিয়ে গৃহনির্মাণের চিত্র পাওয়া যায়নি। ফলে নথিতে উল্লেখিত উপকরণগুলো বিতরণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

দ্বিতীয় পর্যায়ে যাচাই করা ১৫ জন উপকারভোগীর মধ্যে ১২ জনের দুটি করে এবং তিনজনের একটি করে ছাগল মারা গেছে বলে তাঁরা জানিয়েছেন। তাঁদের তথ্য অনুযায়ী, ওই ১৫ জনের পাওয়া ৩০টি ছাগলের মধ্যে ২৭টিই মারা গেছে।

দাঁতমারা ইউনিয়নের পেলারখীল ত্রিপুরাপাড়ার কয়েকজন উপকারভোগী জানান, ছাগলগুলো পাওয়ার সময়ই দুর্বল ছিল। কেউ কেউ বিতরণের এক সপ্তাহের মধ্যে ছাগল মারা যাওয়ার কথা জানিয়েছেন।

নারায়ণহাট ইউনিয়নের নেপচুন চা-বাগানের শ্রমিক সংগ্রাম ত্রিপুরা এবং রামগড় চা-বাগানের শিবু কুমার ত্রিপুরা ও মনিবালা ত্রিপুরা জানান, ছাগল পাওয়ার সময় সেগুলো দুর্বল ছিল। বিতরণের এক সপ্তাহের মধ্যে ছাগল মারা যায়। তদারকি কর্মকর্তাকে বিষয়টি জানানোর পরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে তাঁদের অভিযোগ।

তবে মৃত ছাগলের ছবি, ভিডিও কিংবা চিকিৎসাসংক্রান্ত নথি না থাকায় মৃত্যুর কারণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। কয়েকজন উপকারভোগী ছাগলের ওজন কম ছিল বলেও অভিযোগ করেছেন। বিতরণের সময় ছাগলের ওজন যাচাইয়ের কোনো স্বতন্ত্র রেকর্ড, স্বাস্থ্য সনদ বা টিকাদানের নথিও সংশ্লিষ্ট কার্যালয় থেকে পাওয়া যায়নি।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আবদুল মমিন বলেন, বিতরণের সময় ছাগলগুলো সুস্থ-সবল ছিল। পরে উপকারভোগীদের পরিচর্যার ঘাটতি ও পরিবেশগত সমস্যার কারণে ছাগল মারা যেতে পারে। বিভিন্ন এলাকায় ছাগল মারা যাওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি সরকারের প্রকল্পটিকে ‘লস প্রজেক্ট’ হিসেবে উল্লেখ করেন।

অফিস আদেশে ছাগল বিতরণের আগে বিতরণ কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জরুরি ভিত্তিতে অবহিত করার কথা উল্লেখ থাকলেও ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহীমকে বিষয়টি জানানো হয়নি।

ইউএনও সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহীম বলেন, ‘ছাগল বিতরণের বিষয়টি আমাকে অবহিত করা হয়নি। বিষয়টি দুঃখজনক। সরকারি নিয়মনীতি অনুসরণ করে এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করা উচিত। বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করব।’

চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আলমগীর বলেন, ‘ছাগল বিতরণ করা হয়েছে এটি ঠিক।’ রোগাক্রান্ত ছাগল বিতরণের অভিযোগের বিষয়ে তিনি প্রকল্প পরিচালকের দায় রয়েছে বলে উল্লেখ করেন। মাঠপর্যায়ে কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে এর জন্য প্রকল্পের মাঠ কর্মকর্তাকে দায়ী করেন তিনি।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত