Ajker Patrika

বেহাল মহাসড়ক: ভোগান্তির আরেক নাম কুমিল্লা-সিলেট সড়ক

  • ২০২২ সালের প্রশস্তকরণ প্রকল্প নেওয়া হলেও বাস্তবায়িত হয়নি
  • কুমিল্লার ৫৪ কিলোমিটারের মধ্যে ২১ কিলোমিটারই খানাখন্দে ভরা
  • বৃষ্টি হলে বোঝা যায় না খানাখন্দ, বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি
দেলোয়ার হোসাইন আকাইদ, কুমিল্লা 
বেহাল মহাসড়ক: ভোগান্তির আরেক নাম 
কুমিল্লা-সিলেট সড়ক
দীর্ঘদিন সংস্কার না করায় খানাখন্দে ভরে গেছে কুমিল্লা-সিলেট সড়ক। সেই সঙ্গে বৃষ্টির পানি জমে পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে উঠেছে। এতে যানবাহনের গতি কমে বেড়েছে যানজট। সম্প্রতি দেবিদ্বার উপজেলার বানিয়াপাড়া এলাকায়। ছবি: আজকের পত্রিকা

নেওয়া হয়েছিল সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্প। সেই কাজ শুরু হয়নি; বরং খানাখন্দে ভরে গেছে সড়ক। কমেছে গতি, বেড়েছে যানজট। এই চিত্র কুমিল্লা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কের। সম্প্রতি ভারী বৃষ্টিতে মহাসড়কের খানাখন্দ ডুবে থাকায় ঘটছে দুর্ঘটনাও। ভোগান্তি বেড়েছে যাত্রী ও চালকদের।

কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কটি দিয়ে এই দুই জেলা ছাড়াও হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কিশোরগঞ্জ সংযুক্ত। চট্টগ্রাম থেকে সিলেটে যাত্রী কিংবা পণ্য পরিবহনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ এবং যাতায়াতে সময়ও কম লাগে। তবে চালকেরা বলছেন, বেহাল এই সড়কের কারণে যানবাহন বেশির ভাগই ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ হয়ে দীর্ঘ পথ ঘুরে যায়।

এই মহাসড়কের কুমিল্লার ময়নামতি ক্যান্টনমেন্ট থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পর্যন্ত দূরত্ব প্রায় ৬৫ কিলোমিটার। এর মধ্যে প্রায় ৫৪ কিলোমিটার সড়ক কুমিল্লা সড়ক বিভাগের আওতাধীন। সম্প্রতি ময়নামতি থেকে কংশনগর, দেবিদ্বার, পান্নারপুল, ভিংলাবাড়ী ও কোম্পানীগঞ্জ পর্যন্ত অন্তত ২১ কিলোমিটার অংশ ঘুরে দেখা গেছে, মহাসড়কের কোথাও সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় গর্ত। কোথাও উঠে গেছে পিচের কার্পেটিং। বৃষ্টির পানি জমে অনেক স্থানে গর্তের গভীরতা বোঝার উপায় থাকে না। ফলে ঝুঁকি নিয়েই বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, মাইক্রোবাস ও মোটরসাইকেল চলাচল করছে।

চালকদের অভিযোগ, বেহাল মহাসড়কের কারণে গাড়ির যন্ত্রাংশের ক্ষতি যেমন বাড়ছে, তেমনি সময়ও নষ্ট হচ্ছে। বিশেষ করে পণ্যবাহী যানবাহনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

ফারজানা ট্রান্সপোর্টের বাসচালক মফিজ মিয়া বলেন, এই মহাসড়ক এখন মানুষের কাছে মহাদুর্ভোগের আরেক নাম। এমনিতেই ভাঙা ও গর্তে ভরা সড়কটিতে প্রতিদিনই যানজট লেগে থাকে। এর মধ্যে কোনো গাড়ি বিকল হলে ভোগান্তির শেষ থাকে না। অনেক সময় যানজটে পড়ে তিন থেকে চার ঘণ্টা পর্যন্ত আটকে থাকতে হয়।

এই মহাসড়কে ট্রাক চালান জাহাঙ্গীর হোসেন। তিনি বলেন, সড়কের গর্ত এড়িয়ে চলতে গিয়ে অনেক সময় গাড়িকে হঠাৎ গতি কমাতে বা পাশের লেনে যেতে হয়। এতে পেছনে থাকা যানবাহনের সঙ্গে সংঘর্ষের আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে রাতে এবং বৃষ্টির সময় ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়ে যায়।

আরও যত সংকট স্থানীয় পরিবহনসংশ্লিষ্টদের মতে, সিলেট থেকে চট্টগ্রামমুখী পাথরবাহী ওভারলোড ট্রাকের চাপও সড়কের ক্ষতির অন্যতম কারণ। এর পাশাপাশি অতিরিক্ত থ্রি-হুইলার চলাচলের কারণে মহাসড়কে যানবাহনের চাপ বেড়েছে। ফলে একদিকে সড়ক দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে যানজটও দীর্ঘ হচ্ছে।

দেবিদ্বার থেকে প্রতিদিন কুমিল্লা নগরে যাতায়াত করেন সাংবাদিক সাইফ উদ্দিন রনী। তিনি বলেন, বেশির ভাগ সময় সকালে বাসে উঠলে দেবিদ্বার পৌঁছাতে দুপুর হয়ে যায়। অথচ স্বাভাবিক সময়ে এই পথ যেতে সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা লাগার কথা। এ পথে যাতায়াতকারী হাজার হাজার মানুষ এমন ভোগান্তিতে পড়েছে।

কোম্পানীগঞ্জ এলাকার ব্যবসায়ী মনির হোসেন জানান, সড়কের দুরবস্থার প্রভাব স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যেও পড়ছে। পণ্য পরিবহনে বেশি সময় লাগায় পরিবহন ব্যয় বাড়ছে। অনেক ব্যবসায়ীকে নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হচ্ছে।

সড়ক ও জনপথ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় কুমিল্লা-ব্রাহ্মণবাড়িয়া আঞ্চলিক মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রকল্পের আওতায় মূল মহাসড়কটি চার লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। ধীরগতির যানবাহনের জন্য দুই পাশে সার্ভিস লেন রাখার পরিকল্পনাও রয়েছে। কুমিল্লার ময়নামতি থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ধরখার পর্যন্ত প্রায় ৫৪ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়কের প্রস্থ প্রায় ১৮ ফুট। চার লেনে উন্নীত করা হলে তা প্রায় ৬০ ফুটে উন্নীত হওয়ার কথা। প্রকল্পটির ২০২২ সালে কাজ শুরু হয়ে ২০২৬ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নানা জটিলতায় মূল প্রকল্পের কাজ শুরু হয়নি।

সম্প্রতি সংসদে কুমিল্লা-৪ আসনের এনসিপির সংসদ সদস্য মো. আবুল হাসনাতের জরুরি জনগুরুত্বসম্পন্ন মনোযোগ আকর্ষণ নোটিশের জবাবে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, দ্রুত সংস্কার ও প্রশস্তকরণের মাধ্যমে কুমিল্লা-ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহাসড়কের মানুষের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মন্ত্রী জানান, মহাসড়কটি চার লেনে উন্নীত করার প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সরকার বিকল্প অর্থায়নের পথ খুঁজছে। পাশাপাশি জরুরি ভিত্তিতে ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো সংস্কার ও উন্নয়নের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

মন্ত্রী জানান, দেবিদ্বার, কংশনগর ও ভিংলাবাড়ী এলাকায় মোট ৮০৪ মিটার রিজিড পেভমেন্ট নির্মাণকাজ চলছে। পাশাপাশি ময়নামতি, ফুলগাছতলা, কোম্পানীগঞ্জ, কাঠেরপুল, কুটিচৌমুহনীসহ বিভিন্ন স্থানে আরও ১ হাজার ৮৪৫ মিটার সড়ক প্রশস্ত ও টেকসই করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া কুমিল্লা থেকে দেবিদ্বার পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার সড়ক ৩৪ ফুটে প্রশস্ত করার লক্ষ্যে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।

তবে এই নির্মাণকাজে দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। সম্প্রতি মহাসড়কের কয়েকটি অংশে সংস্কারকাজ শুরু হলেও ধীরগতির কাজ, এক লেন বন্ধ রেখে যান চলাচল এবং কোথাও কোথাও নিম্নমানের কাজের অভিযোগে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। সংস্কারকাজ চলায় অনেক স্থানে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টির পানি জমে গর্তের গভীরতা বোঝা না যাওয়ায় বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) কুমিল্লার সভাপতি শাহ মো. আলমগীর খান বলেন, গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়ক শুধু কুমিল্লা-সিলেট নয়, পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি জেলার যোগাযোগ ও পণ্য পরিবহনের অন্যতম প্রধান রুট। তাই দায়সারা সংস্কার নয়, টেকসই ও মানসম্মত সংস্কারের পাশাপাশি দ্রুত কাজ শেষ করতে হবে। রাষ্ট্রের যেকোনো উন্নয়ন ব্যয়ের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

সড়ক বিভাগের কুমিল্লার নির্বাহী প্রকৌশলী খন্দকার গোলাম মোস্তফা বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ২১ কিলোমিটার অংশ পাঁচটি প্যাকেজে সংস্কার করা হচ্ছে। এসব কাজে আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে ১২৫ কোটি টাকা। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সংস্কারকাজ শেষ হবে বলেও দাবি করেন তিনি।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত