চুয়েটে অচলাবস্থা, সংকট নিরসন কমিটিতেও নেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) অচলাবস্থা চলছে প্রায় এক মাস। উপাচার্য নিয়োগকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া আন্দোলন, শিক্ষার্থীদের সর্বাত্মক শাটডাউন এবং শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মবিরতিতে এখনো স্থবির বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম। সংকট নিরসনে সিন্ডিকেট সভা হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় সংকট নিরসনে কমিটিও হয়েছে গতকাল সোমবার। কিন্তু সিন্ডিকেট সভায় যেমন চুয়েটের কোনো শিক্ষক প্রতিনিধি ছিলেন না, সংকট নিরসন কমিটিতেও রাখা হয়নি চুয়েটের কাউকে। ফলে সংকট নিরসনে গঠিত ৬ সদস্যের ওই কমিটি কতটুকু সফল হবে, তা নিয়ে শুরুতেই সংশয় তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, চুয়েটকে বাইরে রেখে সংকটের সমাধান কীভাবে সম্ভব তা নিয়ে সন্দিহান তাঁরা। ক্ষোভ ঝেড়েছেন আন্দোলনকারীরাও।
১৬ অক্টোবর অনলাইনে অনুষ্ঠিত চুয়েটের সিন্ডিকেট সভায় ১৫ সদস্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন মাত্র ছয়জন। তাঁদের মধ্যে উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম ছাড়া চুয়েটের কোনো শিক্ষক প্রতিনিধি ছিলেন না। অর্থাৎ কার্যকর ১৫ সদস্যের মধ্যে অনুপস্থিত ছিলেন ৯ জন, যা মোট সদস্যের ৬০ শতাংশ। অনলাইনে অনুষ্ঠিত সভায় সংকট নিরসনে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে নিরপেক্ষ ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠনের সুপারিশ পাঠানো এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
এরপর ১৮ অক্টোবর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যানকে চিঠি দিয়ে কমিটি গঠনের বিষয়ে জরুরি সুপারিশ চায়। ইউজিসির সদস্য পর্যায়ের প্রতিনিধিদের নিয়ে তদন্ত বা পর্যালোচনা কমিটি গঠন এবং সংকটের বিস্তারিত পর্যালোচনা করে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা নিরসন এবং ক্যাম্পাসে শ্রেণিকক্ষভিত্তিক স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম পুনরায় চালুর লক্ষ্যে ১৯ অক্টোবর পাঁচ সদস্যের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন একটি পরামর্শক কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)। আজ ২০ অক্টোবর ওই কমিটিতে আরেকজন অন্তর্ভুক্ত হন।
ইউজিসির কমিটি গঠনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সংস্থাটির পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা বিভাগের পরিচালক জামিনুর রহমান। কমিটিতে ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ-আল-মামুনকে আহ্বায়ক এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক ড. মো. মহিবুল আহসানকে সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া দেশের তিনটি শীর্ষস্থানীয় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকেও রাখা হয়েছে। তাঁরা হলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) উপাচার্য অধ্যাপক একরামুল হক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) উপাচার্য মোহাম্মদ আল ফোরকান, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিভাসু) উপাচার্য অধ্যাপক ইউসুপ ইলাহী চৌধুরী। এ ছাড়া রয়েছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের (মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ) অতিরিক্ত সচিব (বিশ্ববিদ্যালয়) মো. মাহবুবুল হক পাটোয়ারি।
এই বিষয়ে চুয়েট শিক্ষক সমিতির যুগ্ম সম্পাদক সামিউন বাসির বলেন, চুয়েটের সমস্যা নিরসনে গঠিত কমিটিতে চুয়েটেরই কেউ নেই। এর থেকেও বড় প্রশ্ন হলো, যে সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে এই কমিটি গঠন করা হয়েছে, সেই সভার বৈধতা কতটুকু? কারণ, ওই সিন্ডিকেট সভাতেও চুয়েটের কেউ ছিলেন না।
একই বিষয়ে আন্দোরত শিক্ষার্থীদের একজন চুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের ২১ ব্যাচের শিক্ষার্থী আহনাব শাহরিয়ার অর্ণব জানান, ‘আমাদের দাবি তো একেবারে পরিষ্কার। সায়েম স্যারকে পুরর্বহাল ও ক্যাম্পাসে না ফেরার শর্তে শিক্ষার্থীদের কাছে মুচলেকা দিয়ে যাওয়া ভিসিকে (শেখ শরীফুল আলম) আর নয়।’
এই বিষয়ে কথা বলতে ভিসি শেখ শরীফুল আলমের দুইটি নম্বরে ফোন করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।
চুয়েটে অচলাবস্থার সূত্রপাত গত ২১ সেপ্টেম্বর রাতে। ওই দিন শিক্ষা মন্ত্রণালয় সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে অপসারণ করে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেয়। দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় সাবেক উপাচার্যকে অপসারণের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ২২ সেপ্টেম্বর থেকে সর্বাত্মক শাটডাউন শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। পরে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা কর্মবিরতি ও অসহযোগ কর্মসূচিতে যুক্ত হন। বন্ধ হয়ে পড়ে ক্লাস, পরীক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম। ছয়টি বিভাগের চূড়ান্ত পরীক্ষা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রয়েছে। দীর্ঘ অচলাবস্থায় শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন ও ভবিষ্যৎ শিক্ষাপঞ্জি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এই সংকটের মধ্যে ১২ অক্টোবর সকাল সাড়ে ৮টায় একটি মাইক্রোযোগে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ছাত্রদলের কয়েকজন নেতা। পরে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা তাঁদেরকে প্রশাসনিক ভবনে অবরুদ্ধ করে রাখেন। ওই ভবনে বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। প্রায় ৩০ ঘণ্টা পর ১৩ অক্টোবর জেলা প্রশাসন ও পুলিশের সহায়তায় তাঁকে ক্যাম্পাস থেকে বের করে আনা হয়। পরে তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর সার্কিট হাউস থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার উদ্যোগ নেন তিনি। ১৬ অক্টোবর সেখান থেকেই অনলাইনে সিন্ডিকেট সভায় সভাপতিত্ব করেন।









