Ajker Patrika

উত্তাল পদ্মায় ভেসে গেলেন সবাই, ২০ দিনের তানিশার বেঁচে ফেরার গল্প

আব্দুল বাশির, চাঁপাইনবাবগঞ্জ
আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩: ৩৭
উত্তাল পদ্মায় ভেসে গেলেন সবাই, ২০ দিনের তানিশার বেঁচে ফেরার গল্প
বিএসএফের হস্তান্তরের পর বিজিবি সদস্য ফরিদপুর বিওপি কোম্পানি কমান্ডার শহিদুল ইসলামের হাতে শিশু তানিশা খাতুন। ছবি: সংগৃহীত

ভরা পদ্মা। বিকেলে হঠাৎ উত্তাল হয়ে ওঠে নদী। সেই উত্তাল জলরাশির ওপর ছোট্ট একটি নৌকা ছুটছিল বাড়ির পথে। নৌকায় মায়ের কোলে ছিল মাত্র ২০ দিনের শিশু তানিশা। হঠাৎ ডুবে যায় নৌকাটি। মুহূর্তের মধ্যে পানিতে ভেসে যান নৌকায় থাকা ১২ জন। তাঁদের সঙ্গে ভেসে যায় তানিশাও।

চারদিকে তখন শুধু পানি আর পানি। প্রবল স্রোত ও ঝড়ের মধ্যে কেউ নৌকার পাটাতন, কেউ বস্তা, কেউ ভাসমান কাঠ কিংবা বৈঠা ধরে বাঁচার চেষ্টা করছিলেন। শিশুটিকে বাঁচাতে মরিয়া হয়ে তানিশাকে আঁকড়ে ধরেছিলেন মা তানিয়া খাতুন। কিন্তু প্রবল স্রোতে একপর্যায়ে তাঁর হাত থেকে ছুটে যায় শিশুটি। পানিতে তলিয়ে যাওয়া তানিশাকে আবার খুঁজে পান মা। এরপর তাঁকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রাখেন।

এদিকে তানিশার নানা ইব্রাহিমও নাতনিকে বাঁচাতে এক হাত উঁচু করে ধরে সাঁতরে চলেন। অন্যরা নৌকার কাঠের পাটাতন, ধানের গুঁড়া, বস্তা ও বৈঠা ধরে ভেসে থাকার চেষ্টা করেন। এভাবে প্রায় এক ঘণ্টা ২০ মিনিট ভেসে থাকার পর স্রোত তাঁদের ভারতীয় জলসীমার দিকে নিয়ে যায়।

ভাসমান অবস্থায় তানিশাসহ ১০ বাংলাদেশিকে দেখতে পেয়ে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের সদস্যরা স্পিডবোট নিয়ে তাঁদের উদ্ধারে এগিয়ে আসেন। পরে তাঁদের নদীর তীরে নিয়ে যাওয়া হয়। তখন মায়ের কোলে থাকা ২০ দিনের তানিশা পানি খেয়ে প্রায় নিস্তেজ হয়ে পড়েছিল।

গতকাল শনিবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার বাখের আলী থেকে জোহুরপুর বেলপাড়ায় যাওয়ার পথে পদ্মা নদীতে এ নৌকাডুবির ঘটনা ঘটে। নৌকায় থাকা ১২ জনের মধ্যে ছিল তানিশা। সে সদর উপজেলার জোহুরপুর বেলপাড়া এলাকার মো. সোহেল ও তানিয়া খাতুন দম্পতির মেয়ে।

উদ্ধারকাজে থাকা ব্যক্তিদের বরাত দিয়ে বাখের আলী বিজিবি ক্যাম্পের সুবেদার শরিফুল ইসলাম বলেন, নৌকাডুবির পর তানিশাকে তাঁর মা শক্ত করে ধরে রেখেছিলেন। একই সঙ্গে নৌকার ধানের গুঁড়া, বৈঠা ও কাঠের পাটাতনের ওপর ভর করে তাঁরা ভেসে ছিলেন। একপর্যায়ে প্রবল স্রোতে শিশুটি মায়ের হাত থেকে ছুটে পানিতে তলিয়ে যায়। পরে তানিয়া খাতুন তাকে খুঁজে পান এবং আবারও শক্ত করে আঁকড়ে ধরেন।

ফরিদপুর বিওপির কোম্পানি কমান্ডার শহিদুল ইসলাম বলেন, শিশুটির নানা সাঁতার জানতেন। অন্যদিকে নারীরা নৌকার পাটাতন, বৈঠা ও বস্তা ধরে ভেসে ছিলেন। তাঁরা এক ঘণ্টার বেশি সময় পানিতে ভেসে ছিলেন।

নারায়ণপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য রবিউল ইসলাম রবু বলেন, প্রথমে তানিশাকে তাঁর মা তানিয়া খাতুন আঁকড়ে ধরেছিলেন। প্রবল স্রোত ও ঝড়ের কারণে একপর্যায়ে শিশুটি তাঁর হাত থেকে ছুটে পানিতে ডুবে যায়। পরে তানিয়া তাকে খুঁজে পেয়ে দুই পা দিয়ে আঁকড়ে ধরে পানির ওপরে তুলে রাখেন। শিশুটির কষ্ট দেখে তানিশার নানা ইব্রাহিম নাতনিকে এক হাত উঁচু করে ধরে সাঁতরে প্রাণে বাঁচেন। এভাবে প্রায় এক ঘণ্টা ২০ মিনিট পানিতে ভেসে থাকার পর বিএসএফ সদস্যরা তাঁদের উদ্ধার করেন।

ভারতীয় অংশে বিএসএফ যখন তাঁদের উদ্ধার করে, তখন সেখানে ছিলেন মুর্শিদাবাদ জেলার লালগোলা থানার তারানগরের বাসিন্দা শ্যামলাল মণ্ডল। তিনি বলেন, বিএসএফের সদস্যরা বাংলাদেশিদের উদ্ধার করে নদীর তীরে নিয়ে আসেন। তখন ২০ দিনের তানিশা প্রায় নিস্তেজ হয়ে পড়েছিল। পরে বিএসএফ সদস্যরা দ্রুত শিশুটিকে স্থানীয় একটি চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে যান। চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করে জানান, শিশুটি সুস্থ আছে।

বিজিবির ৫৩ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী মুস্তাফিজুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘গতকাল ৭১ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের খান্দুয়া ক্যাম্পের সদস্যরা স্পিডবোট নিয়ে বাংলাদেশিদের উদ্ধার করেন। রাতেই উদ্ধার হওয়া ১০ বাংলাদেশিকে বিএসএফ সদস্যরা বিজিবির কাছে হস্তান্তর করেন। পরে বিজিবি তাঁদের স্বজনদের জিম্মায় ছেড়ে দেয়।’

কাজী মুস্তাফিজুর আরও বলেন, উদ্ধার হওয়া ১০ বাংলাদেশির মধ্যে তানিশাসহ নয়জন রাতে সুস্থ অবস্থায় দেশে ফিরেছে।

উত্তাল পদ্মার বুক থেকে ফিরে আসার এ ঘটনায় ২০ দিনের তানিশার বেঁচে থাকাকে অলৌকিক বলছেন স্থানীয়রা। প্রবল স্রোত ও মৃত্যুভয়ের মধ্যে কখনো মায়ের বুক, কখনো নানার উঁচু করে ধরা এক হাত, আবার কখনো নৌকার পাটাতন, বস্তা কিংবা ভাসমান কাঠ হয়ে উঠেছিল তাঁদের বাঁচার অবলম্বন। শেষ পর্যন্ত স্বজনদের প্রাণপণ চেষ্টায় পদ্মার বুক থেকে জীবিতই ফিরে এসেছে ছোট্ট তানিশা।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত