Ajker Patrika

সীমান্তবর্তী ১০ প্রতিষ্ঠানে ফল বিপর্যয়, চোরাচালানসহ চার কারণ

মাঈনুদ্দিন খালেদ, নাইক্ষ্যংছড়ি (বান্দরবান)
আপডেট : ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১৯: ৩৬
সীমান্তবর্তী ১০ প্রতিষ্ঠানে ফল বিপর্যয়, চোরাচালানসহ চার কারণ
ছবি: সংগৃহীত

কক্সবাজার ও বান্দরবানের সীমান্তবর্তী ১০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এইচএসসি ও আলিমের ফলাফল বিপর্যয়ের পেছনে চোরাচালানসহ চারটি কারণকে দায়ী করেছেন স্থানীয় শিক্ষক, রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ ও সচেতন ব্যক্তিরা। তাঁদের ভাষ্য, সীমান্ত এলাকায় চোরাচালানে শিক্ষার্থীদের জড়িয়ে পড়া, অভিভাবকদের অসচেতনতা, শিক্ষকসংকট ও শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় অনীহা ফল খারাপের প্রধান কারণ।

আজ রোববার বিভিন্ন শিক্ষক, রাজনীতিবিদ ও সচেতন ব্যক্তির সঙ্গে আলাপকালে এসব অভিযোগ উঠে আসে।

ফলাফল বিপর্যয়ের মুখে পড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে নাইক্ষ্যংছড়ি হাজি এম এ কালাম সরকারি কলেজ, গর্জনিয়া ফইজুল উলুম ফাজিল ডিগ্রি মাদ্রাসা, গর্জনিয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, বাইশারী স্কুল ও কলেজ এবং নাইক্ষ্যংছড়ি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ।

প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের খুব কাছাকাছি অবস্থিত। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, এসব প্রতিষ্ঠানের আশপাশে প্রকাশ্যে চোরাকারবার চলে ও সীমান্ত এলাকায় মাদকের বিস্তার রয়েছে। শিক্ষার্থীদের অনেকে এসব কর্মকাণ্ডের প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না বলে অভিযোগ তাঁদের।

নাইক্ষ্যংছড়ি হাজি এম এ কালাম সরকারি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ জাফর আলম বলেন, দেশের পূর্ব সীমান্ত তথা বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে চোরাচালান আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। এতে চোরাকারবারে জড়িয়ে গেছে শিক্ষার্থীরাও। তারা সারা রাত-দিন সে কাজে লিপ্ত থাকে। স্কুল-কলেজে যায় না।

জাফর আলম বলেন, চোরাকারবারে জড়িত শিক্ষার্থীদের হাতে দামি মোবাইল থাকে। অবসর সময় তারা মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত থাকে, বইপুস্তকও ছুঁয়ে দেখে না। অনেক শিক্ষার্থী রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত থাকে, তবে নিজেদের ছাত্র হিসেবে পরিচয় দেয়। অভিভাবকদের অসচেতনতার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, অভিভাবকদের কলেজে আসার আহ্বান জানানো হলেও তাঁরা অভিভাবক সমাবেশে খুব কমই আসেন। কলেজে মেধাবী শিক্ষক থাকা সত্ত্বেও এ কারণে ফল পিছিয়ে পড়ছে।

নাইক্ষ্যংছড়ির সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ও রাজনীতিবিদ কামাল উদ্দিন বলেন, নাইক্ষ্যংছড়ির শিক্ষাব্যবস্থার মান শূন্যে নেমেছে। শিক্ষকসংকট, অভিভাবকদের অসচেতনতা ও প্রধান শিক্ষকদের অনেকে প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত সময় না দেওয়াকে দায়ী করেন তিনি। তাঁর দাবি, সহকারী শিক্ষকেরা টেনেটুনে বিদ্যালয় চালাচ্ছেন। শিক্ষার্থীদের অনেকে পড়ার টেবিলে বসে না এবং স্কুল-কলেজেও যায় না। মেয়েশিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

রামু উপজেলার সীমান্তবর্তী কচ্ছপিয়া ইউনিয়নের শিক্ষাবিদ অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বলেন, গর্জনিয়া, কচ্ছপিয়া, ঈদগড় ও কাউয়ারখোপ ইউনিয়ন এলাকায় শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। গণিত, ইংরেজি ও তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতার কথাও বলেন তিনি।

গর্জনিয়া ইউনিয়নের শিক্ষাবিদ ও অধ্যক্ষ ওবাদুল হাকিম বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনীতি ও এলাকায় চোরাচালান বন্ধ করতে হবে। এ ছাড়া কাছাকাছি স্থানে পরীক্ষাকেন্দ্র স্থাপনের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, দূরের কেন্দ্রব্যবস্থা বাদ দিলে ফল ভালো হবে। তাঁর ভাষ্য, শিক্ষকেরা একা ফল ভালো করতে পারবেন না।

বাইশারী স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মুহাম্মদ ওমর ফারুখ জানান, তাঁর প্রতিষ্ঠানে ফলাফল বিপর্যয়ের কারণ অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, অধিকাংশ শিক্ষার্থী ইংরেজিতে খারাপ করেছে। এ কারণে আগামী মঙ্গলবার জরুরি শিক্ষক সভা ডেকেছেন তিনি।

মুহাম্মদ ওমর ফারুখ বলেন, শিক্ষার্থীরা ইংরেজিতে দুর্বল। গ্রামাঞ্চলে ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে পড়ানোর জন্য গৃহশিক্ষকও নেই। চোরাকারবার ও মোবাইলের ব্যবহার শিক্ষার্থীদের ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

স্থানীয় অভিভাবক ও ব্যবসায়ী শফিকুল আলম বলেন, শিক্ষকদের দোষ দিয়ে লাভ নেই; এবারের ফলাফল বিপর্যয়ের জন্য অভিভাবকদের দায় বেশি। নিজের ছেলেও ঠিকভাবে কলেজে যায় না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ছেলে বেলা ১১টায় ঘুম থেকে ওঠে এবং কিছু বললে চোখ রাঙিয়ে তাকায়। চোরাকারবারে জড়িয়ে পড়ায় তিনি অসহায় বলে জানান।

চোরাকারবারে জড়িত এক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানায়, তার পরিবার খুবই গরিব। পরিবারের হাল ধরতে সে চোরাকারবারে জড়িয়ে পড়েছে। তার দাবি, শুধু সে নয়, শত শত শিক্ষার্থী সীমান্ত চোরাকারবারে জড়িয়ে কলেজ ও মাদ্রাসা ফাঁকি দেয়। পড়াশোনা ছাড়া পরীক্ষা দিলে ফেল করবেই বলে মন্তব্য করে সে।

সাবেক প্রধান শিক্ষক মাওলানা নূরুল হক বলেন, এসএসসি ও এইচএসসির ফল ভালো করতে শিক্ষার্থীদের পড়ার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে হবে। চোরাকারবার বন্ধ করে সন্ধ্যার পর শিক্ষার্থীদের বাড়ি ফেরার ব্যবস্থা করার আহ্বান জানান তিনি। মোবাইল ব্যবহারের বিষয়ে অভিভাবক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কঠোর হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

মাওলানা নূরুল হক বলেন, প্রাথমিক স্তরে গণিত ও ইংরেজির ভিত্তি শক্ত না হলে পরবর্তী স্তরে ছেলেমেয়েরা আর পড়তে চায় না। এসব বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে দেশের পূর্ব সীমান্তের শিক্ষাব্যবস্থায় ধস নামবে বলে আশঙ্কা করেন তিনি।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত