Ajker Patrika

বনের জলে বিষ, বাড়ছে ঝুঁকি

  • মাছ ধরার জন্য বেড়েছে বিষাক্ত রাসায়নিকের প্রয়োগ
  • বন বিভাগ বলছে, অভিযান বাড়ানো হয়েছে
  • স্থানীয়রা বলছেন, শুঁটকিও বানানো হয় বনে। এতে দেওয়া হয় কীটনাশক
শরণখোলা (বাগেরহাট) প্রতিনিধি
বনের জলে বিষ, বাড়ছে ঝুঁকি
সম্প্রতি অবৈধভাবে মাছ ধরতে গিয়ে বন বিভাগের কর্মীদের হাতে এক জেলে আটক। ছবি: সংগৃহীত

সুন্দরবনের ভেতরে কিংবা এর আশপাশের নদীগুলোয় মাছ ধরার জন্য যত জাল ব্যবহার করা হচ্ছে, তার চেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে বিষাক্ত রাসায়নিক। মাছের শুঁটকি বানাতেও বনের ভেতরে দেওয়া হচ্ছে কীটনাশক। এতে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে সুন্দরবনের জলজ বাস্তুতন্ত্র ও জীববৈচিত্র্য। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভাবে চলতে থাকলে মাছ, কাঁকড়া এবং অন্যান্য জলজ প্রাণী একসময় হারিয়ে যাবে। বন উজাড় হবে।

বেশ কয়েক বছর ধরে সুন্দরবনের ভেতরে রাসায়নিক ব্যবহার করে মাছ ধরার প্রবণতা বেড়েছে। সম্প্রতি সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে বিষ দিয়ে ধরা মাছ, কীটনাশক, বিষাক্ত রাসায়নিক, নৌকা ও জাল জব্দ করেছে বন বিভাগ। তবে এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত কাউকে আটক করতে না পারায় প্রশ্ন উঠেছে পুরো চক্রের নিয়ন্ত্রণ ও তৎপরতা নিয়ে।

সুন্দরবনসংলগ্ন জেলে ও বনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অসাধু জেলেরা জোয়ারের শুরুতে ছোট খালের মুখে কীটনাশক ও বিষাক্ত রাসায়নিক ঢেলে দেয়। বিষ পানিতে মিশে স্রোতের সঙ্গে খালের ভেতরে ছড়িয়ে পড়লে কিছুক্ষণের মধ্যে চিংড়ি ও অন্যান্য মাছ দুর্বল হয়ে পানিতে ভেসে ওঠে। পরে সেগুলো সংগ্রহ করা হয়। স্থানীয়দের দাবি, একবার কোনো খালে বিষ প্রয়োগ করা হলে দীর্ঘ সময় সেখানে মাছের উপস্থিতি কমে যায়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিষ দিয়ে মাছ শিকার করা এক জেলে বলেন, ‘মাছ কমে যাওয়ায় অনেকে অল্প সময়ে বেশি মাছ পাওয়ার জন্য বিষ ব্যবহার করছে।’

প্রভাবশালীরা জড়িতস্থানীয় কয়েকজন জেলে এবং মৎস্য ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন, কিছু অসাধু ও প্রভাবশালী মৎস্য ব্যবসায়ী জেলেদের বিষ দিয়ে মাছ ধরতে উৎসাহিত করেন। এমনকি তাঁরাই জেলেদের কাছে কীটনাশক এবং বিষাক্ত রাসায়নিক সরবরাহ করেন। স্থানীয় বাজারের কিছু দোকানেও গোপনে এসব রাসায়নিক বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।

তবে শুধু মাছ শিকারেই থেমে নেই অসাধু জেলে চক্র। সুন্দরবনের গভীরে টংঘর ও মাচা তৈরি করে আগুন জ্বালিয়ে বিষ দিয়ে ধরা ছোট চিংড়ি দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে শুঁটকি। অভিযানে এসব টংঘরও ধ্বংস করা হয়, শুঁটকিও ধ্বংস করা হয়; তবে জড়িতদের বিরুদ্ধে নেওয়া হয় না কোনো ব্যবস্থা।

যদিও বন বিভাগের দাবি, গত বছরের তুলনায় চলতি বছর সুন্দরবনে বিষ দিয়ে মাছ ধরার প্রবণতা অনেকটা কমেছে। নিয়মিত অভিযান, ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারি, ফুট প্যাট্রলিং এবং বিভিন্ন শাখা খালের মুখে বেড়া দেওয়ায় অপরাধীদের বনে ঢোকা অনেকটা কঠিন হয়েছে।

সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, সব ধরনের অপরাধ দমনে বন বিভাগ নিয়মিত অভিযান ও টহল পরিচালনা করছে। স্মার্ট প্যাট্রলিং, ফুট প্যাট্রলিং এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে অন্যান্য বছরের তুলনায় চলতি বছর বনে অপরাধ অনেকটা কমেছে। তিনি আরও বলেন, বনে অপরাধ দমনে স্থানীয় মানুষের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অপরাধীদের বিষয়ে বন বিভাগকে স্থানীয়রা যেন সহযোগিতা করেন, সেই আহ্বান জানান।

তবে স্থানীয়রা বলছেন, বন বিভাগের এমন কার্যক্রম থাকলেও বিষ প্রয়োগ থেমে নেই। স্থানীয়দের ভাষ্য, বিষ প্রয়োগের কারণে সুন্দরবনের সিলন টেংরা, চিত্রা, রিঠা, কাইন মাগুর, বাটা, পারশেসহ বিভিন্ন দেশীয় মাছের প্রজাতি হুমকির মুখে পড়েছে। এসব মাছ এখন কম পাওয়া যায়।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন রিসোর্স টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের সহযোগী অধ্যাপক ড. শেখ তারেক আরাফাত বলেন, সুন্দরবনে বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরা শুধু একটি অবৈধ পদ্ধতি নয়, এটি পুরো জলজ বাস্তুতন্ত্রের জন্য মারাত্মক হুমকি। বিষ প্রয়োগের ফলে মাছের ডিম, রেণু, পোনা, চিংড়ি, কাঁকড়া, শামুক, ঝিনুকসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণী এবং ক্ষুদ্র জীব ধ্বংস হতে পারে। এতে পানির স্বাভাবিক গুণগত মানও নষ্ট হয়।

শেখ তারেক আরাফাত বলেন, কিছু রাসায়নিক দীর্ঘদিন পানি, কাদা এবং তলদেশের পলিতে থাকার পর বাস্তুতন্ত্রের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত