Ajker Patrika

সরকারি অফিসের কেউ নন তিনি, টাকার বিনিময়ে দিচ্ছেন ভূমি বন্দোবস্তের ফরম

ইসমাইল হোসেন কিরন,  হাতিয়া (নোয়াখালী)  
আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৯: ০৭
সরকারি অফিসের কেউ নন তিনি, টাকার বিনিময়ে দিচ্ছেন ভূমি বন্দোবস্তের ফরম
নিঝুমদ্বীপ বন্দরটিলা বাজারে সহকারীদের সাথে নিয়ে নিজ অফিসে কাজ করছে আবদুল মালেক। ছবি: আজকের পত্রিকা

বন্দরটিলা বাজারে রয়েছে তাঁর নিজস্ব অফিস। কর্মীও নিয়োগ দিয়েছেন সেখানে। তাঁরা সেখানে হাতিয়ার নিঝুম দ্বীপে ভূমিহীনদের জমি বন্দোবস্তের ফরম বিতরণ ও জমা নেওয়ার কাজ করছেন টাকার বিনিময়ে। জমি দেওয়ার কথা বলে বিভিন্ন সময় ভূমিহীনদের নিয়ে সংগঠনও গড়ে তুলেছেন তিনি। অথচ হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞার কারণে নিঝুম দ্বীপে সরকারিভাবে জমি বন্দোবস্ত কার্যক্রম বন্ধ দীর্ঘদিন ধরে। ভূমিহীনদের নিয়েই ভূমিহীনদের ঠকানোর এই মূল হোতা হলেন আবদুল মালেক।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নিঝুম দ্বীপ ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের আদর্শ গ্রামের মৃত আবদুল শহীদের ছেলে আবদুল মালেক (৭০) দীর্ঘদিন ধরে ভূমিহীনদের নিয়ে কাজ করছেন। জমি দেওয়ার কথা বলে বিভিন্ন সময় ভূমিহীনদের নিয়ে সংগঠন গড়ে তুলেছেন তিনি। এ জন্য কয়েকবার জেলেও গিয়েছেন।

নিঝুম দ্বীপ বন্দরটিলা বাজারের ব্যবসায়ী সমীর উদ্দিন বলেন, সরকার পরিবর্তনের পর আবদুল মালেক নতুনভাবে এ কার্যক্রম শুরু করেছেন। বন্দরটিলা বাজারে অফিস নিয়ে কর্মী নিয়োগ দিয়ে ভূমিহীনদের জন্য ফরম বিতরণ ও জমা নেওয়া হচ্ছে। হিসাব রাখার জন্য বেতনভুক্ত কর্মচারীও রাখা হয়েছে।

সমীর উদ্দিনের ভাষ্য, গ্রামের ভূমিহীন মানুষকে বোঝাতে মাঠপর্যায়ে কর্মী রয়েছেন। কর্মীরা বিভিন্ন মানুষের কাছে ফরম পৌঁছে দেন এবং কয়েক দিন পর পূরণ করা ফরম সংগ্রহ করেন। কেউ কেউ সরাসরি অফিসে গিয়েও ফরম জমা দিচ্ছেন।

নিঝুম দ্বীপ নামার বাজারের কাপড় ব্যবসায়ী ফখরুল ইসলাম (৫৫) জানান, কয়েক দিন আগে মালেক তাঁকে ৫০টি ফরম দিয়েছিলেন। নিজের পরিবারের আট সদস্যের নামে আটটি ফরম জমা দিয়েছেন তিনি। প্রতিটি ফরমের জন্য তাঁর কাছ থেকে ১ হাজার ১০০ টাকা করে নেওয়া হয়েছে।

ফখরুল ইসলাম আরও জানান, বন্দোবস্তের কাজ শুরু হলে আরও চার হাজার টাকা করে দিতে হবে বলে তাঁকে জানানো হয়েছে। গত এক সপ্তাহ ধরে তাঁর কাছে থাকা ফরম বিতরণ করে সদস্য সংগ্রহের জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

নিঝুম দ্বীপের সমাজকর্মী ফুয়াদ হোসেন বলেন, সহজ-সরল মানুষকে ফরম দিয়ে প্রথমে ১ হাজার ১০০ টাকা নেওয়া হয়। পরে অফিসের নারী কর্মীদের মাধ্যমে মোবাইল ফোনে কাজ এগোচ্ছে বলে আরও চার হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ করেন তিনি।

ফুয়াদ হোসেনের দাবি, এভাবে পুরো নিঝুম দ্বীপ থেকে এক হাজার সদস্য সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে মালেকের নিজস্ব কর্মী রয়েছে। জমি দেওয়ার কথা বলে সাধারণ মানুষকে সদস্য করে টাকা নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ তাঁর।

ফুয়াদ হোসেন বলেন, ভূমি বন্দোবস্তের সরকারি নিয়ম রয়েছে এবং উপজেলা ভূমি অফিস এ কার্যক্রম দেখভাল করে। সরকারি দপ্তরকে না জানিয়ে অফিস খুলে এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

জাহাজমারা ভূমি অফিসের সহকারী ভূমি কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির বলেন, হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞার কারণে নিঝুম দ্বীপে ভূমি বন্দোবস্ত কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ। আবদুল মালেক যা করছেন, তা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বিষয় এবং তাঁর সঙ্গে ভূমি অফিসের কোনো যোগাযোগ নেই।

হুমায়ুন কবির আরও বলেন, বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাসেল ইকবাল মালেকের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা করার নির্দেশ দিয়েছেন। ভূমি অফিস মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে অভিযুক্ত আবদুল মালেক বলেন, সরকার গৃহহীন মানুষকে ঘর ও জমি দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এ কারণে তিনি ভূমিহীনদের সংঘবদ্ধ করে রাখছেন। সংগৃহীত ফরম সরকারের কাছে জমা দেওয়া হবে, যাতে সরকারের কাজ সহজ হয়।

আবদুল মালেক আরও বলেন, জমি দেওয়া না হলে সংগঠনের মাধ্যমে আন্দোলন করে দাবি আদায় করা হবে। টাকা নেওয়ার বিষয়টি সদস্যদের সঞ্চয় হিসেবে জমা নেওয়া হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।

ইউএনও ও ভূমি কর্মকর্তা রাসেল ইকবাল বলেন, সরকারি জমি বন্দোবস্ত দেওয়ার ক্ষমতা জেলা প্রশাসকের। এর বাইরে কেউ এ কাজ করলে তা প্রতারণা হবে।

রাসেল ইকবাল জানান, নিঝুম দ্বীপের মালেকের বিষয়ে তিনি শুনেছেন। দ্রুত তাঁকে আইনের আওতায় আনা হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত