Ajker Patrika

পর্যটন বন্ধ: জীবিকায় টান সেন্ট মার্টিনবাসীর

  • দুই দশকে পর্যটননির্ভর নানা ব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন স্থানীয়রা
  • বর্তমানে পর্যটন নিষেধাজ্ঞায় বিপাকে পড়েছেন তাঁরা
  • বন্ধ হয়ে গেছে অর্ধেকের বেশি হোটেল ও রিসোর্টের কার্যক্রম
মাইনউদ্দিন শাহেদ, কক্সবাজার
পর্যটন বন্ধ: জীবিকায় টান সেন্ট মার্টিনবাসীর
ফাইল ছবি

দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিনের মানুষ বংশপরম্পরায় মাছ শিকার ও কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল। তবে গত দুই দশকে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে দ্বীপের অর্থনীতির ধরন বদলে গেছে। পূর্বপুরুষের পেশা ছেড়ে রাতারাতি পর্যটননির্ভর নানা ব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন স্থানীয়রা। বদলে যাওয়া এই পেশাই এখন তাঁদের জীবিকার সংকটে ফেলে দিয়েছে।

অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন এবং প্লাস্টিকদূষণের কারণে দ্বীপের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। এমন বাস্তবতায় সেন্ট মার্টিনের পরিবেশ রক্ষা ও পর্যটন নিয়ন্ত্রণে গত দুই বছরে সরকার নানা বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। তবে স্থানীয়রা বলছেন, এতে করে পর্যটকের সংখ্যা কমলেও পরিবেশের খুব একটা উন্নতি হয়নি। আবার কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েছেন অনেকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিশু-কিশোরদের পড়ালেখা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

সেন্ট মার্টিনে প্রতিবছর ১ অক্টোবর থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত পর্যটন মৌসুম ধরা হয়। তবে ২০২৩ সাল থেকে মিয়ানমারের রাখাইনে সংঘাতের কারণে টেকনাফ থেকে নাফ নদী হয়ে সেন্ট মার্টিনে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এরপর কক্সবাজার থেকে জাহাজ চলাচল করছিল। ২০২৪ সালের অক্টোবরে দ্বীপের পরিবেশ-প্রতিবেশ পুনরুদ্ধারে পর্যটন মৌসুম ছোট করে ভ্রমণে ১২টি নির্দেশনা জারি করে সরকার। এসব শর্ত মেনে গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে কক্সবাজার থেকে জাহাজে দৈনিক দুই হাজার পর্যটক দ্বীপে ভ্রমণ ও রাতযাপনের অনুমতি পায়। ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত ভ্রমণ করে ১ লাখ ১০ হাজার পর্যটক।

চলতি মাসের ১ তারিখ থেকে সেন্ট মার্টিনে পর্যটক ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে সরকার। আগামী ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত এটি কার্যকর থাকবে। নভেম্বরে ভ্রমণের সুযোগ থাকলেও রাতযাপনের অনুমতি থাকছে না।

২ মাসের রোজগারে বছর চলবে কীভাবে

দ্বীপে ২০০টির বেশি হোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে। এগুলোতে ৮ থেকে ১০ হাজার পর্যটকের থাকার ব্যবস্থা আছে। চলতি মৌসুমে এগুলোর অর্ধেকের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এ ছাড়া শতাধিক রেস্তোরাঁও বন্ধ হয়ে গেছে।

পর্যটন খাতকে কেন্দ্র করে ক্যামেরাম্যান ও ট্যুরিস্ট গাইড হিসেবে কাজ করছিলেন স্থানীয় অনেক তরুণ। তিন শতাধিক ইজিবাইক ও ভ্যান এবং শতাধিক মোটরসাইকেল নিয়ে পর্যটকদের সেবায় নিয়োজিত হন অনেকে। তাঁদের সবাই এখন বিপাকে পড়েছেন।

মারমেইড রিসোর্টের মালিক তৈয়ব উল্লাহ বলেন, চলতি মৌসুমের দুই মাসে স্থানীয় আবাসিক রিসোর্ট ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করতে পারেননি। ট্যুর অপারেটরদের সঙ্গে ঢাকা ও চট্টগ্রামভিত্তিক বড় রিসোর্টগুলো জাহাজের টিকিটসহ প্যাকেজ করে ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেছে। সি প্রবাল রিসোর্টের মালিক আবদুল মালেক বলেন, ‘দ্বীপের বিচ ভিউ হোটেল-রিসোর্ট ছাড়া বাকিগুলোর অধিকাংশই বন্ধ রাখতে হয়েছে।’

সাগরে মাছের আকাল, আরাকান আর্মির ভয়

সেন্ট মার্টিন জেটিঘাটের পাশে বালিয়াড়িতে মাচাংয়ে সামুদ্রিক মাছ শুকান দ্বীপের উত্তর পাড়ার বাসিন্দা হাবিবুর রহমান (৬৫)। তিনি বলেন, সাগরে কয়েক বছর ধরে মাছের আকাল চলছে। এখন শুঁটকি তৈরির মাছও পাওয়া যাচ্ছে না। আবার গভীর সাগরে যেতে চাইলে মগবাগির (আরাকান আর্মি) ভয় আছে। তারা অস্ত্র তাক করে যখন-তখন ধরে নিয়ে যায়। দু-তিন বছর ধরে এই পরিস্থিতি চলছে।

সেন্ট মার্টিনের ইউপি চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, সাগরে মাছ ধরার সময় ধরে নিয়ে যাওয়া ৩৬ জন জেলে এখনো আরাকান আর্মির হাতে জিম্মি। তাঁর অভিযোগ, পরিবেশ রক্ষায় পর্যটন মৌসুমে পরিবেশ অধিদপ্তর ও প্রশাসন সক্রিয় হলেও বাকি ১০ মাস কেউ স্থানীয়দের খবর রাখে না। এখানকার প্রায় ১০ হাজার বাসিন্দার বিকল্প আয়ের কী ব্যবস্থা হবে, তা স্পষ্ট নয়।

২০১২ সাল থেকে সেন্ট মার্টিনে আন্ডারওয়াটার ফটোগ্রাফি করেন শরীফ সারওয়ার। গত ২০ নভেম্বর থেকে তিনি ৫৭ দিন দ্বীপে ছিলেন। দ্বীপের পরিবেশ-প্রতিবেশ নিয়ে হতাশার কথা জানালেন তিনি। তবে পর্যটনের ব্যাপ্তি কমানোয় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের উন্নতি হয়েছে বলে মনে করছে পরিবেশ অধিদপ্তর। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকদের দায়িত্বশীল আচরণের ওপর জোর দেন প্রতিষ্ঠানটির কক্সবাজার কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত