Ajker Patrika

ডিঙাপোতা হাওর: দেওরাজান নদের বুকে চরে গরু, চলে যান

  • দুই যুগ আগেও নদটি প্রবহমান ছিল, ছিল হাওরের জীবনের অংশ
  • খননের অভাবে ধীরে ধীরে পলি জমে এখন এটি ধু-ধু বালুচর
  • স্থানীয় মানুষেরা নদের জায়গাটিকে এখন ‘দেওরাজান বালুচর’ নামে চেনেন
নেত্রকোনা প্রতিনিধি
ডিঙাপোতা হাওর: দেওরাজান নদের বুকে চরে গরু, চলে যান
সময়ের ব্যবধানে যেন নিজের নামই হারিয়ে ফেলেছে নেত্রকোনার দেওরাজান নদ। স্থানীয়দের কাছে এটি এখন ‘দেওরাজান বালুচর’ নামে পরিচিত। এর বুকে গরু চরান কৃষক, চলে যানবাহন। ছবি: আজকের পত্রিকা

ডিঙাপোতা হাওরের বুক চিরে একসময় নীরবে বয়ে চলত একটি নদ। নাম দেওরাজান। আজ সেই নদের বুকে আর ঢেউ খেলে না, পানির কলকল ধ্বনিও শোনা যায় না। নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার তেঁতুলিয়া বাজারের পূর্বপাশে দাঁড়িয়ে নদটির দিকে তাকালে এখন চোখে পড়ে বিস্তীর্ণ বালুচর। সময়ের ব্যবধানে এই নদ যেন নিজের নামই হারিয়ে ফেলেছে। স্থানীয়দের কাছে এটি এখন ‘দেওরাজান বালুচর’ নামে পরিচিত। নদের বুকে এখন কৃষক গরু চরায়, চলে নানা যানবাহন।

স্থানীয় বয়স্ক ব্যক্তিরা বলেন, এই বালুর নিচেই চাপা পড়ে আছে একটি নদের ইতিহাস। তেঁতুলিয়া ইউনিয়নের দত্তখিলা নদ থেকে জলটুনাই পর্যন্ত ৪-৫ কিলোমিটার দীর্ঘ দেওরাজান নদ একসময় ছিল গভীর ও প্রাণবন্ত। ২৫-৩০ বছর আগেও নদের গভীরতা ছিল ১৫-২০ ফুট। বর্ষায় নদভরা পানি, শুষ্ক মৌসুমেও স্বাভাবিক প্রবাহ—সব মিলিয়ে হাওরের মানুষের জীবনের স্রোতধারা ছিল যেন এই নদ।

দেওরাজানের পানি দিয়েই ডিঙাপোতা হাওরের কয়েক হাজার একর বোরো জমিতে সেচ দেওয়া হতো। কৃষকের সোনালি স্বপ্নের ফসল বেড়ে উঠত এই নদের পানিতে। জেলেরা জাল ফেলত এখানে, গবাদিপশু নামানো হতো গোসলে, নৌকায় করে পরিবহন করা হতো ফসল। নদ ছিল জীবিকা আর জীবনের অংশ। কিন্তু সময়মতো খননকাজ না হওয়ায় ধীরে ধীরে পলি জমতে শুরু করে। বছরের পর বছর অবহেলায় নদের বুক ভরাট হয়ে যায় বালুতে। এখন নদ যেখানে ছিল, সেখানে শুধু বালু আর বালু।

এদিকে নদ হারিয়ে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে হাওরের কৃষিতে। নদে পানি না থাকায় কৃষকেরা বাধ্য হয়ে অগভীর সেচপাম্পের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানি তুলছেন। এতে একদিকে বাড়ছে উৎপাদন খরচ, অন্যদিকে দ্রুত নামছে পানির স্তর। উপজেলার তেঁতুলিয়া গ্রামের আলী হোসেন নামের এক প্রবীণ কৃষক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘এই নদ ছাড়া আমরা হাওর কল্পনাই করতে পারতাম না। নদটা চোখের সামনে মরে গেল, আমরা কিছুই করতে পারলাম না।’

একই গ্রামের আরেক প্রবীণ কৃষক তোতা মিয়া বলেন, দুই-তিন যুগ আগেও এই নদ প্রবহমান ছিল। এই নদের পানি দিয়ে হাওরের কয়েক হাজার একর জমি চাষ হতো। খননের অভাবে ধীরে ধীরে পলি জমে নদটি ভরাট হয়ে গেছে। তরুণ প্রজন্ম নদটির নামই ভুলতে বসেছে। স্থানীয়রা এটিকে এখন দেওরাজান বালুচর নামে ডাকে।

হাওরের পরিবেশ ও প্রতিবেশবিষয়ক বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিকের আঞ্চলিক সমন্বয়ক ওহিদুর রহমান বলেন, দেওরাজান নদ শুধু একটি জলধারা ছিল না, এটি ছিল একটি জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র। নদটি খনন করে পূর্বের নাব্যতা ফিরিয়ে আনলে হাওরের জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাবে, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমবে এবং কৃষকেরাও উপকৃত হবেন।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আমেনা খাতুন বলেন, ‘পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে নদের বিষয়টি নিয়ে কথা বলব। জায়গাটি নির্ধারণের জন্য ভূমি কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে যোগাযোগ করে এই নদ খননের বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘আমাদের উপসহকারী প্রকৌশলীদের মাধ্যমে নদের খোঁজ নিয়ে খননের বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত