Ajker Patrika

৪০ বছর বাড়ির উঠোনে শিকলবন্দী শফিকুল, পরিবারের দাবি, ঘরে তোলার ‘পরিবেশ’ নেই

খোরশেদ আলম সাগর, লালমনিরহাট
আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২৬, ২২: ১৩
৪০ বছর বাড়ির উঠোনে শিকলবন্দী শফিকুল, পরিবারের দাবি, ঘরে তোলার ‘পরিবেশ’ নেই
শিকলে বন্দী বৃদ্ধ শফিকুল ইসলাম। ছবি: আজকের পত্রিকা

বাড়ির বাইরের উঠানের এক কোনায় বারান্দায় বসে আছেন বৃদ্ধ শফিকুল ইসলাম (৮০)। রোদ, ঝড়, বৃষ্টি যা-ই হোক, এখান থেকে তাঁর নড়ার উপায় নেই। পায়ে যে মোটা শিকল! জীবনের অর্ধেকটা সময় কেটে গেছে তাঁর এই শিকলে বন্দী থেকে। এলাকার সম্পদশালীদের অন্যতম হয়েও এই বৃদ্ধের ঠাঁই হয়নি সামনে থাকা পাকা বাড়ির এক কোনায়ও।

শফিকুল ইসলাম লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার চন্দ্রপুর ইউনিয়নের লতাবর গ্রামের বাসিন্দা। উত্তর বালাপাড়া আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ের সামনের পাকা বাড়িটিতে শফিকুলের স্ত্রী সন্তানেরা বসবাস করেন। আর তাঁর ঠাঁই হয়েছে সেই বাড়ি বাইরের উঠানের ৫০ গজ দূরে বাঁশঝাড়ের নিচে গুদামের বারান্দায়। ৪০ বছর আগে মানসিক ভারসাম্য হারালে তাঁর ঠাঁই হয় এখানে। সেই থেকে আজও বাঁশঝাড়ের নিচে কাঠের চৌকিতে কখনো বসে, কখনো শুয়ে কাটছে তাঁর জীবন।

পরিবার ও স্থানীয়রা জানান, ৪০ বছর আগে স্বাভাবিক জীবন ছিল উপজেলার চন্দ্রপুর ইউনিয়নের লতাবর গ্রামের শফিকুল ইসলামের। হালচাষ করে চার ছেলে-মেয়ে আর স্ত্রীকে নিয়ে চলত তাঁর সংসার। ফসল উৎপাদন করে অনেক জমিও কিনেছিলেন। হঠাৎ মানসিক ভারসাম্য হারালে প্রথমে স্থানীয় কবিরাজের মাধ্যমে চিকিৎসা শুরু করলেও তাতে উন্নতি হয়নি। এরপর থেকে তিনি `শফিকুল পাগলা’ নামেই পরিচিত হয়ে ওঠেন। একপর্যায়ে চিকিৎসার জন্য তাঁকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। সেখান থেকে পাবনা মানসিক হাসপাতালে পাঠালে অবস্থার অবনতি ঘটে এবং চিকিৎসকেরা তাঁকে বাড়ি পাঠিয়ে দেন।

এর পর থেকে পায়ে শিকল পরিয়ে বাড়ির গুদামঘরের উঠানের এক কোনায় শফিকুলকে রাখা হয়। উঠানেই থাকা-খাওয়া, শৌচকাজ সারেন তিনি। বিড়বিড় করে একাই কথা বলেন। কেউ এগিয়ে গেলে অপলক তাকিয়ে থাকেন। কখনো কখনো শিকল খুলে দেওয়ার আকুতি জানান। কিন্তু হারিয়ে যাবেন বা কাউকে আঘাত করবেন—এই ভয়ে কেউ খুলে দেন না। পরিবারে একমাত্র বড় ছেলে মাহবুবুর রহমানই তাঁর কাছে ঘেঁষেন। তিনিই বাবাকে খাবার দেন, সপ্তাহে এক দিন গোসল করান এবং বারান্দার মলমূত্র পরিষ্কার করে দেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শফিকুলের এক বাল্যবন্ধু বলেন, ‘যুবক বয়সে শফিকুল প্রচণ্ড পরিশ্রমী আর সাহসী ছিলেন। পারিবারিক চাপে হঠাৎ মানসিক ভারসাম্য হারান। সেই থেকে শিকলবন্দী। একজন মানুষ মানসিক ভারসাম্যহীন হলেই তাঁকে এভাবে বাইরে ফেলে রাখতে হবে কেন? তা ছাড়া জমিজমা বিক্রি করে ভালো চিকিৎসাও তো করানো যায়।’

শফিকুলের স্ত্রী মালেকা বেগম বলেন, স্বামীর কষ্ট দেখে খারাপ লাগলেও বাড়িতে নেওয়ার মতো পরিবেশ নেই।

শফিকুলের বড় মেয়ে চন্দ্রপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য রেহানা বেগম বলেন, ‘আমার জন্মের ৫ বছর পর থেকে বাবা মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়ে শিকলবন্দী। ঘরে রাখলে ঘর নষ্ট করে, মশারি বা গরম কাপড় দিলে ছিঁড়ে ফেলে। তাই বারান্দায় রাখা হয়েছে। যথেষ্ট জমি থাকলেও তা বিক্রির সুযোগ নেই। তাই টাকার অভাবে চিকিৎসা করানো সম্ভব হয়নি। বাবার কষ্ট দেখে মায়া লাগলেও কিছু করার নেই।’

চন্দ্রপুর ইউনিয়ন পরিষদের আরেক সদস্য আমির হামজা বলেন, জন্মের পর থেকে দেখে আসছি শফিকুল ইসলাম শিকলবন্দী। ছেড়ে দিলেই হারিয়ে যান, তাই বেঁধে রাখা হয়েছে। বিষয়টা অমানবিক। তবে উন্নত চিকিৎসার মাধ্যমে তাঁর সুস্থতার ব্যবস্থা করা দরকার বলেও মনে করেন তিনি।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত