Ajker Patrika

দেশসেরা এক শিক্ষকের গল্প

শেখ-ফরিদ, সোনারগাঁ (নারায়ণগঞ্জ)
দেশসেরা এক শিক্ষকের গল্প
শিক্ষার্থীদের নিয়ে প্রাত্যহিক সমাবেশে দেশসেরা প্রধান শিক্ষক বি আর বিলকিস। গতকাল সকালে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার ভট্টপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ছবি: আজকের পত্রিকা

ঘড়ির কাঁটায় সকাল ৯টা। বিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে দাঁড়িয়ে বাঁশি বাজিয়ে শিক্ষার্থীদের সারবদ্ধভাবে ভেতরে প্রবেশ করান প্রধান শিক্ষক। পরে শুরু হলো প্রাত্যহিক সমাবেশ। শিক্ষার্থীদের জাতীয় সংগীত পরিবেশন ও শারীরিক কসরতের মধ্য দিয়ে শেষ হয় এই পর্ব। এরপর শিক্ষার্থীরা আবার সারবদ্ধভাবে যার যার শ্রেণিকক্ষে চলে যায়। তখন প্রতিটি ক্লাসে পাঠদানের জন্য শিক্ষক পাঠান প্রধান শিক্ষক।

গতকাল রোববার সকালে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার ভট্টপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা গেল এমন চিত্র। বিদ্যালয়ের এই প্রধান শিক্ষক বি আর বিলকিস। তিনি এই বিদ্যালয়কে এনে দিয়েছেন ঈর্ষণীয় সাফল্য। সেই সঙ্গে তিনি নিজে ১২ বার উপজেলার, ৮ বার জেলার, ২ বার বিভাগের এবং একবার দেশসেরা প্রধান শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছেন। বিলকিস যেন এই বিদ্যালয়ের বাঁশিওয়ালা।

সর্বশেষ জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক প্রতিযোগিতা ২০২৬-এ দেশের শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক (মহিলা) নির্বাচিত হয়েছেন বি আর বিলকিস। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের চূড়ান্ত মূল্যায়নে শিক্ষাক্ষেত্রে অসামান্য অবদান, বিদ্যালয়ের শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং দক্ষ প্রশাসনিক নেতৃত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে এই গৌরবময় পদকে ভূষিত করা হয়।

ভট্টপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে একটি আদর্শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে বিলকিস দীর্ঘদিন ধরে নিরলসভাবে কাজ করছেন। তাঁর সুনিপুণ পরিচালনায় বিদ্যালয়টি স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে বারবার প্রশংসিত হয়েছে। ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর হার কমানো, মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমের সর্বোত্তম ব্যবহার এবং শিক্ষার্থীদের সহশিক্ষা কার্যক্রমে উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রে তিনি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

একের পর এক স্বীকৃতির বিষয়ে জানতে চাইলে বি আর বিলকিস বলেন, ‘যেকোনো কাজের স্বীকৃতি আনন্দের। এই অর্জন শুধু আমার একার নয়; এটি বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং সোনারগাঁ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা পরিবারের সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল। এই সম্মাননা আমাকে ভবিষ্যতে প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান আরও বৃদ্ধি করতে এবং শিশুদের মেধা বিকাশে আরও বেশি নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করার অনুপ্রেরণা জোগাবে।’

গুণী এই প্রধান শিক্ষক জানান, ভট্টপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বর্তমানে শিক্ষার্থী ১ হাজার ২০ জন। বিদ্যালয়ের উপস্থিতি ৯৮ থেকে ৯৯ শতাংশ। বিদ্যালয়ে ১৩ জন শিক্ষক রয়েছেন। শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা ক্লাসেই বাস্তবায়ন করা হয়। শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য শিক্ষকদের মাধ্যমে বছরের শুরুতে তিন স্তরের শিক্ষার্থী বাছাই করা হয়; যেমন উত্তম, মধ্যম ও পিছিয়ে পড়া।

বিলকিস আরও জানান, পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ক্লাসের ব্যবস্থা থাকে। শিক্ষকদের সংখ্যা অনুযায়ী পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের ভাগ করে দেওয়া হয়। প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষ পর্যবেক্ষণ করা হয়। পড়াশোনার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা, গান, ব্যায়াম ও গল্প বলার চর্চা করা হয়। বিদ্যালয়ে রয়েছে বাংলা ক্লাব, গণিত ক্লাব ও ইংরেজি ক্লাব। অলিম্পিয়াড ও বিজ্ঞান মেলার আয়োজন করা হয়। প্রয়োজনে রাতে শিক্ষার্থীদের বাড়ি গিয়ে পড়াশোনার খোঁজ নেওয়া হয়। অভিভাবকেরাও সহায়তা করে থাকেন।

এই বিদ্যালয় থেকে ২০২৫ সালে ৩৪ শিক্ষার্থী প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। তাদের মধ্যে ৩০ জন বৃত্তি পেয়েছে।

প্রধান শিক্ষক সম্পর্কে বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক শামীমা আক্তার বলেন, ‘প্রধান শিক্ষকের শ্রেষ্ঠ হওয়ার পেছনে রয়েছে শৃঙ্খলা। তিনি শিক্ষাবান্ধব শিক্ষক। সময়ের কাজ সময়ে করতে পছন্দ করেন। তিনি বিদ্যালয়ের সময়ের বাইরে নিজের জন্য সময় না দিয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য সময় ব্যয় করেন। আমরাও তাঁর মতো হওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছি।’

আরেক শিক্ষক মাহমুদা আক্তার জানান, তিনি এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। এখন এই বিদ্যালয়ের শিক্ষক। তাঁর চোখে দেখা একজন কঠোর পরিশ্রমী শিক্ষক বিলকিস। তিনি সব সময় বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের মানোন্নয়নে উদ্ভাবনী চিন্তা করে থাকেন। শিক্ষকদের নিয়ে সাপ্তাহিক ও পাক্ষিক সভা করেন। বিদ্যালয় ও শিক্ষার্থীদের মান কীভাবে আরও উন্নত করা যায়, তার ব্যবস্থা করেন।

বি আর বিলকিস সম্পর্কে শিক্ষক কবির হোসেন বলেন, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের প্রতি রয়েছে তাঁর আন্তরিকতা। দক্ষতার সঙ্গে বিদ্যালয়ের পাঠদান ও কার্যক্রম পরিচালনা করেন। নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মানোন্নয়নে কাজ করেন।

পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী তৌসিফ হোসাইন বলে, ‘প্রধান শিক্ষক আমাদের খুব যত্ন করেন। আমরা প্রধান শিক্ষককে ছাদবাগান করা ও স্কুল পরিচ্ছন্নতার কাজে সহযোগিতা করি।’

পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র শাফায়েত ইসলাম মুহিতের মা সাথী আক্তার বলেন, ‘আমার ছেলে মুহিত বৃত্তি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বি আর বিলকিস আমার বাসায় এসে খোঁজ নিচ্ছেন ছেলের পড়াশোনার খেয়াল রাখছি কি না। তা ছাড়া আমার সন্তান পড়াশোনা বাদ দিয়ে টিভি দেখছে কি না, ফোন ব্যবহার করছে কি না, সেদিকেও খেয়াল রাখছেন।’

বি আর বিলকিস ১৯৯৩ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। পরে আবার পরীক্ষার মাধ্যমে ২০০৩ সালে প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ পান। তাঁর বাড়ি সোনারগাঁয়ের সাদিপুর ইউনিয়নের কোনাবাড়ি গ্রামে। উপজেলার পঞ্চমীঘাট উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং রাজধানীর লালমাটিয়া কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। পরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর করেন তিনি।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত