Ajker Patrika

ময়মনসিংহের তারাকান্দা

কলেজের ভবনসহ জমি বেচে দিলেন অধ্যক্ষ

  • ফজলুল হক চৌধুরী মহিলা কলেজের তিন তলা ভবনসহ ৮ শতক জমি বিক্রি অধ্যক্ষের।
  • ১ কোটি ৩৩ লাখ ৫৪ হাজার টাকায় ওই জমি ও ভবন বিক্রি করা হয়।
  • ভবনের ভেতরের দেয়াল ও দরজা-জানালা ভাঙার পর বাধার মুখে কাজ বন্ধ।
  • জমি ও ভবন বিক্রির কারণে কলেজটির বিএমটি শাখার শিক্ষার্থীরা অন্যত্র চলে গেছেন।
ইলিয়াস আহমেদ, ময়মনসিংহ  
কলেজের ভবনসহ জমি বেচে দিলেন অধ্যক্ষ
তারাকান্দায় ফজলুল হক চৌধুরী মহিলা কলেজের তিনতলা ভবনের ভেতরের অনেকাংশ ভেঙে ফেলা হয়েছে। আজকের পত্রিকা

ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলায় ফজলুল হক চৌধুরী মহিলা কলেজের তিন তলা ভবনসহ ৮ শতক জমি বিক্রি করে দিয়েছেন অধ্যক্ষ হোছেন আলী চৌধুরী। কোনো ধরনের অনুমতি ছাড়াই তিনি ১ কোটি ৩৩ লাখ ৫৪ হাজার টাকায় স্থানীয় এক নারীর কাছে ওই জমি ও ভবন বিক্রি করে দেন। সম্প্রতি ভবন ভাঙার কাজ শুরু হলে বিষয়টি জানাজানি হয়। পরে বাধার মুখে ভাঙার কাজ বন্ধ রাখা হয়।

কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অভিযোগ, তারাকান্দা বাসস্ট্যান্ডসংলগ্ন এলাকায় ২০০৯ সালে ফজলুল হক চৌধুরী মহিলা কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়। স্বামীর নামে নামকরণ করা ওই কলেজে ২০১১ সালের ১০ জানুয়ারি ৮ শতক জমি দান করে দেন জায়েদা খাতুন। দলিলে সাক্ষী হন জায়েদার ছেলে হোছেন আলী চৌধুরী ও তাঁর ভাই শওকত আলী চৌধুরী। হোছেন আলী চৌধুরী পরবর্তী সময়ে কলেজটির অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পান। তিনি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের উপজেলা কমিটির সহদপ্তর সম্পাদক পদে ছিলেন। সম্প্রতি পদত্যাগ করেছেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, ২০২২ সালের ৬ জুন বেসরকারি কলেজটি সরকারের মান্থলি পে অর্ডার-এমপিওভুক্ত হওয়ার আগে জেলা পরিষদের অর্থায়নে এখানে তিন তলা ভবন নির্মাণ করা হয়। কিন্তু শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলে প্রায় তিন শ জনের জায়গা সংকুলান না হওয়ায় ২০২৪ সালে অন্যত্র ৩৮ শতাংশ জমি কিনে কলেজের কার্যক্রম সেখানে সরিয়ে নেওয়া হয়। তবে এই ক্যাম্পাসে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে বিজনেস ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড টেকনোলজি (বিএমটি) শাখার কার্যক্রম চলছিল। এই শাখায় ২২ জন শিক্ষার্থী ছিলেন। কিন্তু ভবন ও জমি বিক্রি করে দেওয়ার এসব শিক্ষার্থী অন্য কলেজে চলে যান। এ ঘটনায় শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন।

কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অভিযোগ, কলেজটি এমপিওভুক্ত হওয়ার তিন মাস পর ২০২২ সালের ১২ সেপ্টেম্বর অধ্যক্ষ ভবনসহ ৮ শতক জমি বিক্রি করে দেন। ১ কোটি ৩৩ লাখ ৫৪ হাজার টাকায় স্থানীয় বাসিন্দা আয়েশা আক্তার ওই ভবন ও জমি কিনে নেন।

কলেজের অধ্যক্ষ হোছেন আলী চৌধুরীর দাবি, তাঁর মা কলেজে জমি লিখে দেওয়ার তিন মাস আগে ২০১০ সালের ১২ অক্টোবর একই জমি তাঁকে লিখে দিয়েছিলেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, জমি কিনে নেওয়া আয়েশা আক্তার মাসখানেক আগে শ্রমিক দিয়ে ভবনটি ভাঙা শুরু করেন। ভেতরের দেয়াল, দরজা-জানালসহ বিভিন্ন অংশ ভেঙে ফেলা হয়েছে। বিষয়টি দেখতে পেয়ে স্থানীয় লোকজন বাধা দিলে সপ্তাহখানেক আগে ভাঙার কাজ বন্ধ রাখা হয়।

কলেজের ইতিহাস বিভাগের প্রভাষক হান্নান তালুকদার বলেন, ‘কলেজের নামে সরকারি একটি বড় ভবন নির্মাণের বরাদ্দ আসার পর এখানে জায়গাস্বল্পতার কারণে আমরা মধুপুর এলাকায় ৩৮ শতাংশ জায়গা কিনে সেখানে কার্যক্রম শুরু করি।

আর প্রথম ক্যাম্পাসে বিএম শাখার ক্লাস হতো।’

হান্নান তালুকদার আরও বলেন, ‘এখানে নারীদের একটি হোস্টেল করার চিন্তাভাবনা ছিল আমাদের। কিন্তু হঠাৎ দেখি কলেজের ভবন ভাঙা হচ্ছে। এরপর খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অধ্যক্ষ ভবনসহ জায়গা বিক্রি করে দিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে আমরা প্রতিবাদ শুরু করলে আমিসহ দুজন শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।’

সমাজকর্ম বিভাগের প্রভাষক জান্নাতুল নাসরিন বলেন, ‘কলেজের শুরু থেকেই আমি এখানে শিক্ষকতা করছি। কখনো ভাবিনি, জায়গাটি কলেজের নয়। স্যার প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে প্রতারণা করবেন, কোনো দিন ভাবতেও পারিনি। এখন আমরাও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছি। বাধ্য হয়ে অধ্যক্ষ স্যারের প্রতি অনাস্থা জানিয়েছি। আমরা এমন দুর্নীতিবাজ শিক্ষককে চাই না। আশা করছি ইউএনও স্যার এবং এমপি স্যার সুন্দর একটি সমাধান দেবেন।’

কলেজটির এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক ও তারাকান্দা বণিক সমিতির সাবেক সভাপতি সায়েদুল ইসলাম মণ্ডল বলেন, ‘আমরা হোছেন আলী চৌধুরীকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রেমিক ভাবলেও তাঁর ভেতর এত জটিলতা, সেটা বুঝতে পারিনি। তিনি এক নারীর কাছ থেকে চার লাখ

টাকা নিয়েও চাকরি দেননি। এমনকি টাকাও ফেরত দেননি। এমন দুর্নীতিবাজ শিক্ষক দেশ ও সমাজের জন্য ক্ষতিকর। আমরা তাঁর শাস্তির দাবি জানাই।’

জানা গেছে, চলমান উত্তেজনা নিরসনে গত সোমবার উভয় পক্ষকে কার্যালয়ে ডেকে কথা বলেন তারাকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আমিনুল ইসলাম। তবে কলেজের জমি ও ভবন বিক্রির বিষয়ে স্পষ্ট কারণ ব্যাখ্যা করতে পারেননি অধ্যক্ষ। এ জন্য ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে বলে ইউএনও জানিয়েছেন।

ইউএনও বলেন, কলেজের নামে ৮ শতাংশ জমি লিখে দেওয়ার আগে সেই জমি অধ্যক্ষ হোছেন আলীর মা তাঁকে লিখে দিয়েছিলেন—এমনটি তিনি দাবি করেছেন। ওই মালিকানায় জমিটি বিক্রি করা হয়। তবে পুরো ঘটনা স্পষ্টভাবে জানতে তদন্ত

কমিটি গঠন করা হচ্ছে। পরে প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অভিযোগের বিষয়ে ফজলুল হক চৌধুরী মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ মো. হোছেন আলী চৌধুরী দলিল নিয়ে ভুল-বোঝাবুঝি হয়েছে বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলে দেখব, কী করা যায়।’

এ বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য মুহাম্মদুল্লাহ বলেন, ‘কলেজ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে চিন্তাভাবনা নিয়ে আমরা কাজ করছি। এখানে অধ্যক্ষের দায় থাকলে অবশ্যই তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

সদ্য অবসরপ্রাপ্ত ময়মনসিংহ বিভাগীয় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অঞ্চলের পরিচালক অধ্যাপক এ কে এম আলিফ উল্লাহ আহসান বলেন, ‘কলেজটির অবস্থা একেবারেই শোচনীয় শুধু অধ্যক্ষের কারণে। এ বিষয়ে অভিযোগ পেয়ে ডিজি এবং সচিবের কাছে তা লিখিতভাবে জানাতে পরামর্শ দিয়েছি।’

তারাকান্দা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আশরাফুল আলম আজকের পত্রিকাকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এসব বিষয় নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে কোনো ব্যবস্থাপনা কমিটিও নেই। তাই ইউএনও স্যারের পরামর্শক্রমে বিধি মোতাবেক অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত