Ajker Patrika

ভালোবাসায় অমলিন অরূপ কুমার রায়

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
আপডেট : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২২: ৪৭
ভালোবাসায় অমলিন অরূপ কুমার রায়
অরূপ কুমার রায়। ছবি: সংগৃহীত

‎তুখোড় মেধাবী ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সুযোগও এসেছিল। অরূপ কুমার রায় বেছে নিলেন ব্যবসা। যদিও মনের মধ্যে সৃজনশীলতা ও সংস্কৃতির প্রতি টান ছিল প্রগাঢ়। ভাষা শিক্ষা, সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ, বন্ধুত্ব, সততাকে পুঁজি করে গড়ে তুলেছিলেন নিজের জীবন। মানুষটির পরিবারে কেউ ছিল না!

অকৃতদার অরূপ কুমার বেঁচে ছিলেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, বন্ধুজন আর প্রিয়জনদের পরিবার করে। ১৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় পাড়ি জমালেন ওপারে। রেখে গেছেন তাঁর স্মৃতি, কাজ, ভালোবাসা আর মূল্যবোধ।

‎শেষ যাত্রায় তাঁর সঙ্গী ছিলেন সেই বন্ধুরাই। তাঁরাই সব দায়িত্ব তুলে নেন নিজেদের কাঁধে—হাসপাতালে নেওয়া, শেষকৃত্য আয়োজন, পিন্ডদানসহ সবকিছু।

বন্ধু ফজলে রহীম খান শাহরিয়ার জানালেন, মৃত্যুর কিছুদিন আগে তাঁর ব্লাড ক্যানসার ধরা পড়ে। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ১৫ সেপ্টেম্বর তাঁকে নেওয়া হয় এভারকেয়ার হাসপাতালে। সেখানেই তাঁর পৃথিবীযাত্রার ইতি ঘটে। পরে সবুজবাগের শ্রীশ্রী বরদেশ্বরী কালীমাতা মন্দিরের শ্মশানঘাটে সম্পন্ন হয় তাঁর শেষকৃত্য। ১৮ সেপ্টেম্বর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে পিণ্ডদানের আয়োজন করা হয়।

‎বাবা শ্যাম মোহন রায় ও মা স্বপ্না রায় থাকতেন কেরানীগঞ্জে। অরূপ কুমার রায় তাঁদের একমাত্র সন্তান। চলে আসেন পুরান ঢাকায়। ছাত্রজীবন থেকে অত্যন্ত মেধাবী অরূপ মাধ্যমিক পাস করেন সেন্ট গ্রেগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে। ১৯৭৬ সালে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে অংশ নিয়ে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছিলেন। একই প্রতিষ্ঠান থেকে উচ্চমাধ্যমিকে উত্তীর্ণ হন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগ থেকে ১৯৮৪ সালে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করেন।

বাল্যবন্ধু ফজলে রহীম খান জানান, ভালো ফল করায় পড়াশোনা শেষে তাঁর সামনে শিক্ষকতারও সুযোগ এসেছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু শিক্ষকতা বেছে না নিয়ে তিনি যুক্ত হন ব্যবসার সঙ্গে।

‎অরূপ কুমার রায়ের জীবনের উজ্জ্বল অধ্যায়গুলোর একটি ছিল সংস্কৃতির প্রতি গভীর অনুরাগ। ফরাসি ভাষার ওপর তাঁর ছিল অসাধারণ দখল। তিনি অনর্গল ফরাসি বলতে ও লিখতে পারতেন। ফরাসি ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি এই ভালোবাসাই তাঁকে আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দো ঢাকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করে। তিনি এই সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের কোষাধ্যক্ষ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

‎সংস্কৃতির প্রতি তাঁর আগ্রহ শুধু একজন অনুরাগীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ছিলেন একজন সক্রিয় সাংস্কৃতিক সংগঠক। শিল্প, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক নানা আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সংস্কৃতিকে উপভোগ করার পাশাপাশি এর চর্চা ও বিকাশে নিজের জায়গা থেকে ভূমিকা রাখার চেষ্টা করেছেন। ২০১২ সালে আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ আয়োজিত শিল্পী মোহাম্মদ ফখরুল ইসলামের স্মরণসভায় তিনি আলোচক হিসেবে অংশ নিয়েছিলেন।

‎বন্ধুদের স্মৃতিতে অরূপ ছিলেন একজন সৎ মানুষ। দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের অভিজ্ঞতা থেকে ফজলে রহীম খান শাহরিয়ার বলেন, অরূপের সততা ছিল তাঁর চরিত্রের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। নীতি ও মূল্যবোধের প্রশ্নে তিনি ছিলেন আপসহীন।

‎ব্যক্তিজীবনে অরূপ রায় বিয়ে করেননি। কিন্তু বন্ধুত্ব, সংস্কৃতি এবং মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল বিস্তৃত। যাঁরা তাঁকে কাছ থেকে চিনেছেন, তাঁদের কাছে তিনি ছিলেন একজন নিরহংকার, সংস্কৃতিমনা ও সৎ মানুষ।

‎মানুষ চলে গেলে থেকে যায় তাঁর কাজ, ভালোবাসা ও মূল্যবোধ। অরূপ কুমার রায়ও তাঁর মেধা, সততা, ফরাসি ভাষার প্রতি ভালোবাসা এবং সংস্কৃতির প্রতি গভীর অনুরাগের ছাপ রেখে গেছেন। আর এসবের মধ্য দিয়েই তাঁর বন্ধু, স্বজন ও সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষের স্মৃতিতে বেঁচে থাকবেন আজীবন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত