Ajker Patrika

আঙ্কল স্যামের দেশে রবীন্দ্রনাথ

জাহীদ রেজা নূর
আঙ্কল স্যামের দেশে রবীন্দ্রনাথ
‘আমেরিকায় রবীন্দ্রনাথ’ গ্রন্থের প্রচ্ছদ। ছবি: আজকের পত্রিকা

রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে যত তর্ক-বিতর্ক হয়েছে, বাঙালি আর কোনো ব্যক্তিত্বকে নিয়ে ততটা হয়েছে বলে মনে হয় না। বড় মানুষদের এটাই সবচেয়ে বড় অর্জন যে তাঁরা মরেও মরেন না। বেঁচে থাকেন। তাঁদের ব্যক্তিত্বের প্রবল আকর্ষণে বা বিকর্ষণে রচনা হতে থাকে বই, আলোচনা হতে থাকে টেলিভিশনে, পডকাস্টে। এক কাপ চা হাতে রকে-রেস্তোরাঁয় তাঁকে নিয়ে হতে থাকে তুমুল বিতর্ক।

বর্তমান যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হয়েছে শক্তিশালী। অতি দ্রুত নিজের মনের কথা বলে দেওয়া যায়, ছড়িয়ে দেওয়া যায় অন্তর্জালে। ফলে, তথ্যের সম্ভার থেকে সত্য-মিথ্যা যাচাই করে একটি সিদ্ধান্তে আসা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে।

এ রকম এক সময় আবদুল্লাহ জাহিদ লিখেছেন ‘আমেরিকায় রবীন্দ্রনাথ’ নামের একটি বই। বইটির নামই বলে দিচ্ছে, রবীন্দ্রনাথের যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের সময়টিকেই লেখক ধরেছেন দুই মলাটের মধ্যে। ‘সর্বত্রগামী’ হতে পারেনি তাঁর কবিতা, এ রকম একটা আক্ষেপ ছিল রবীন্দ্রনাথের। তবে আমরা বলব, একজন মানুষের পক্ষে যতটা বৈচিত্র্যময় হওয়া সম্ভব, রবীন্দ্রনাথ তার কাছাকাছি হয়েছিলেন। তাঁর দিকে তাকাতে হয় বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে। তাঁর অন্তর্দৃষ্টি নিয়ে ভাবতে হয় প্রগাঢ়ভাবে। শৈল্পিক জগতে তিনি নির্ভরতা হয়ে দেখা দেন। তাঁর কবিতার একটি পঙ্‌ক্তি কিংবা উপন্যাসের কোনো সংলাপ যে কারও জন্য হয়ে উঠতে পারে সঞ্জীবনী শক্তি।

দুর্ভাগ্যের বিষয়, রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আমরা দুই ধরনের বিপদে পড়ি। একদল মানুষ আছেন, যারা রবীন্দ্রনাথকে ভক্তি করেন অন্ধের মতো, অপর এক দলে আছেন, যারা রবীন্দ্রনাথের রচনার ছিদ্রান্বেষণে ব্যস্ত। এই দুই দলের প্রচণ্ড শক্তির কাছে পরাজিত না হয়ে নিজের মতো করে যারা রবীন্দ্রনাথকে পেতে চান, তাদের জন্য রবীন্দ্রনাথ একটি গোটা বই, যা পড়ে শেষ করা কঠিন। সেই বিশাল বইয়ের একটি অধ্যায় বুঝি রচিত হয়েছে ‘আমেরিকায় রবীন্দ্রনাথ’ বইয়ে।

২.

আবদুল্লাহ জাহিদের বইটি রবীন্দ্রনাথের যুক্তরাষ্ট্র সফরগুলোকে কেন্দ্র করে লেখা, সেটা আবার মনে করিয়ে দিই। বইয়ের ভূমিকাতেই লেখক স্পষ্ট করেছেন, ১৯১২ সাল থেকে ১৯৩০ সাল পর্যন্ত সময়কালে রবীন্দ্রনাথ মোট পাঁচবার যুক্তরাষ্ট্র সফর করেছেন। প্রতিবার তিনি একই রকম সম্মান পেয়েছেন, এমন নয়। কারা কখন তাঁর পাশে ছিল, কারা তাঁকে পাশে পেয়ে নিজেদের সম্মানিত বোধ করেছেন, কারা তাঁকে নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করেছেন, তার পরিষ্কার আলোচনা আছে বইটিতে। এই সমস্ত কিছুর বিশদ বিবরণ উঠে এসেছে বলে বইটির প্রতি আকৃষ্ট হবেন পাঠক।

লেখক জানিয়ে দেন, শৈশবে রবীন্দ্রনাথ যখন আমেরিকার রাষ্ট্রনায়ক বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিনের আত্মজীবনী পাঠ করেছিলেন, তখন থেকেই আমেরিকা তাঁকে কৌতূহলী করে তুলেছিল। কিন্তু ১৯১২ সালের আগে তিনি সে দেশটায় যাননি কখনো। আমাদের মনে রাখতে হবে, ১৯১২ সাল হলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ঠিক আগের সময়টা। অর্থাৎ পৃথিবী তখন একটি নতুন ভয়াবহতার মুখোমুখি হচ্ছে। আর ১৯৩০ সালের আগেই রুশ দেশে ঘটে গেছে বিপ্লব। সর্বহারার একনায়কতন্ত্র গড়ে তোলার জন্য একদল মানুষ তখন সোচ্চার হয়েছে। ১৯১৭ সালের সেই দুনিয়া কাঁপানো সময়টি কীভাবে আলোড়ন তুলেছিল রবীন্দ্রনাথের মনে, সে কথাও কিছুটা জানা যায় তাঁর লেখা ‘রাশিয়ার চিঠি’ থেকে। ফলে, সময়ের বিচারে পৃথিবীতে ঘটে যাওয়া বড় বড় ঘটনাগুলোর অভিঘাত তখন লেগেছিল রবীন্দ্রনাথের মনে। যুক্তরাষ্ট্র সফরেও রয়েছে তার রেশ। যে কথা না বললেই নয়, ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছিল যুক্তরাষ্ট্র। ১৯১৬ সালের সফর তাই সাহিত্য আলোচনায় ছিল মুখরিত। নানা দিক থেকেই তিনি তখন প্রশংসার সাগরে ভাসছেন।

১৯২০-২১ সালের তৃতীয় সফর এবং ১৯২৯ সালের চতুর্থ সফর ছিল হতাশাজনক। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে মার্কিনিদের উত্তেজনা তত দিনে কমে এসেছে। বিশেষ করে এই সময়টায় রবীন্দ্রনাথের ব্রিটিশবিরোধী মনোভাবে নাখোশ হচ্ছিল যুক্তরাষ্ট্র, কারণ ব্রিটিশদের সঙ্গে তখন তাদের সখ্য। রবীন্দ্রনাথ ব্রিটিশদের সমালোচনা করে মার্কিনিদের রাগ জাগিয়ে তুলেছিলেন। বইয়ের লেখক ভূমিকাতেই ১৯২৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সময় মার্কিন ইমিগ্রেশন অফিসারের অবাক করা প্রশ্নের প্রসঙ্গটি এনেছেন। এই ইমিগ্রেশন অফিসার নোবেল বিজয়ী কবিকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তিনি লিখতে পড়তে জানেন কিনা!

তবে তুলনামূলকভাবে যুক্তরাষ্ট্রে কবির শেষ সফরটি ছিল উৎসাহব্যঞ্জক। এ সময় নিউইয়র্ক টাইমসে কবিকে নিয়ে ২১টি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। রাশিয়া থেকে তিনি এসেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে। দেখা করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হার্ভার্ট হুভারের সঙ্গে। সেটা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ‘গ্রেট ডিপ্রেশন’ বা ‘মহামন্দা’র সময়। রবীন্দ্রনাথ তখন নিউইয়র্কের ব্রডওয়েতে তাঁর বিদায় সভার অর্থ শহরের কর্মহীন মানুষদের জন্য দান করেন।

যুক্তরাষ্ট্র কতভাবে কবির কাছে ধরা দিয়েছে, তা নিয়েই ‘আমেরিকায় রবীন্দ্রনাথ’ বইটি এগিয়েছে। দুই মলাটের মাঝে যুক্তরাষ্ট্রে রবীন্দ্রনাথ যেন স্থান পেয়েছে অনায়াসে। রবীন্দ্রনাথের জীবনে কিংবা এ সময় রবীন্দ্রনাথের সঙ্গ যারা পেয়েছেন, তাদের জীবনে রবীন্দ্রনাথ কীভাবে উঠে এসেছেন, তার অনেকটাই পাঠক ছুঁতে পারবেন এই বইয়ের মাধ্যমে। কোথাও কোথাও ছড়ানো ছিটানোভাবে ঘটনাগুলোর বর্ণনা আছে। কিন্তু আলাদা আলাদা ঘটনাকে একই সূত্রে গাঁথার জন্য আবদুল্লাহ জাহিদ ধন্যবাদ পেতেই পারেন।

৩.

আবদুল্লাহ জাহিদের বইটি এগিয়েছে খুব সরলভাবে। বইটিতে রয়েছে গবেষণার ছাপ, কিন্তু তা গবেষণার নির্ধারিত ফরম্যাটে লেখা হয়নি। বর্ণনায় গল্পের সহজতা আছে, প্রয়োজনীয় তথ্যগুলো দেওয়া হয়েছে বটে, কিন্তু তা বোঝা হয়ে চেপে বসেনি ঘাড়ে। পাঠক শুরুতেই কৌতূহলী হয়ে উঠবেন রবীন্দ্রনাথের লন্ডন হয়ে আমেরিকা যাওয়ার প্রসঙ্গ ওঠার পরপরই কেন বইটিতে ‘কাবুলিওয়ালা’ নামের গল্পটি নিয়ে কথা উঠে এল। প্রখ্যাত ব্রিটিশ চিত্রশিল্পী উইলিয়াম রটেনস্টাইন ১৯১০ সালে কলকাতায় এসেছিলেন এবং সেখানেই রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ভাবনাকে ওলট-পালট করে দিয়েছিলেন। মডার্ন রিভিউ পত্রিকায় রটেনস্টাইন রবীন্দ্রনাথের ‘কাবুলিওয়ালা’ গল্পটির অনুবাদ পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলেন। গল্পটির অনুবাদ করেছিলেন মার্গারেট এলিজাবেথ নোবেল, যিনি সিস্টার নিবেদিতা নামে পরিচিত ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ও সিস্টার নিবেদিতার মধ্যে ছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ। রবীন্দ্রনাথ উনিশ শতকের শেষদিকে লিখেছিলেন গল্পটা, মডার্ন রিভিউতে গল্পটির অনুবাদ ছাপা হয়েছিল ১৯১২ সালে। রটেনস্টাইন এই গল্পটি পড়ে এতটাই আলোড়িত হন যে তিনি রবীন্দ্রনাথকে চিঠি লিখে আরও রচনার অনুরোধ করেন।

এই আকর্ষণ থেকেই রবীন্দ্রনাথকে লন্ডনে আমন্ত্রণ জানানোর ব্যাপারে উদ্যোগী হয়ে ওঠেন রটেনস্টাইন। রবীন্দ্রনাথও লন্ডনের উদ্দেশে ভারত ছাড়েন। পথিমধ্যে তিনি জাহাজে বসে করতে থাকেন গীতাঞ্জলির অনুবাদ। তাই এ কথা বললে ভুল হবে না, রটেনস্টাইনের আমন্ত্রণে ইংল্যান্ডে যাওয়ার এই ছোট্ট ঘটনাটিকেই রবীন্দ্রনাথের নোবেলপ্রাপ্তির প্রথম পদক্ষেপ বলা হলে ভুল হবে না। লন্ডনের সেই সফরেই ইংরেজিতে অনূদিত গীতাঞ্জলির প্রথম প্রকাশনা হয়। অনুবাদকর্মটি যেন প্রকাশিত হয়, সে জন্য খুবই খেটেছিলেন কবি। অক্টোবরের মধ্যে বইটি প্রকাশিত হবে বলে ধারণা করা হলেও প্রকাশনার তারিখ পিছিয়ে যায়। তাই অবকাশ কাটানোর ভাবনা মাথায় আসে কবির। তিনি এই অবসর সময়টা যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয়ে পড়াশোনায় ব্যস্ত তাঁর ছেলে রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে কাটাবেন। একেবারেই আকস্মিক ছিল সে সিদ্ধান্ত। ইলিনয় রাজ্যের আরবানা নামের শান্ত এক গ্রামীণ এলাকায় সময়টা কাটান রবীন্দ্রনাথ। নোবেল তখনো পাননি। তাই তাঁকে নিয়ে সে রকম আলোড়ন সৃষ্টি হয়নি সে যাত্রায়। কিন্তু এজরা পাউন্ডের কল্যাণে শিকাগোর দি পোয়েট্রি সাময়িকীর সম্পাদক হ্যারিয়েট মনরোর কাছে ইতিমধ্যে কবিতার মাধ্যমে পরিচিতি হয়ে উঠেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। সেই রবীন্দ্রনাথের ছেলে যুক্তরাষ্ট্রেরই একটি অঙ্গরাজ্য থেকে হ্যারিয়েট মনরোকে চিঠি লিখে জানাচ্ছেন, রবীন্দ্রনাথ এখন ইলিনয়তে আছেন! ভাবা যায়!

‘আমেরিকায় রবীন্দ্রনাথ’ বইটিতে রবীন্দ্রনাথের প্রতিটি যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণের কথাই ঠাঁই পেয়েছে, তাই পাঠক বুঝতে পারবেন, বৃহৎ পরিসরে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আলোচনা তখন হয়নি বটে, কিন্তু কোনো কোনো সভায় রবীন্দ্রনাথ তাঁর কথা তুলে ধরেছেন। কিছু মানুষের হৃদয় ছুঁয়েছেন।

৪.

রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে মার্কিন প্রশাসন যে গোয়েন্দাগিরি করেছিল, সেই তথ্যের সমাহার যেখানে করা হয়েছে, সেখানে এসে অনেকেই নতুন কিছু জানছেন বলে মানবেন। তাঁর এ সফরের সময় জল বেশ ঘোলা হয়েছিল। প্রেসিডেন্টকে লেখা রবীন্দ্রনাথের চিঠিটি তো এখানে আছেই, আরও আছে প্রাসঙ্গিক সব তথ্য।

আমরা যে সময় নিয়ে কথা বলছি, পৃথিবীর ইতিহাসে তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি সময় বলেই বিবেচিত হবে চিরকাল। একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ঘটনার এত ঘনঘটা পৃথিবী কমই দেখেছে। সে সময় ইউরোপে বিপ্লবীরা সংগঠিত হচ্ছে, সমাজতন্ত্রের প্রতি সমর্থন বাড়ছে। মার্কস ও ইঙ্গেলসের রচনাবলী পড়া হচ্ছে কৌতুহল নিয়ে। ওদিকে চলছে প্রথম মহাযুদ্ধ। আমেরিকা সে যুদ্ধে যোগ দেবে কি দেবে না, তা নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব রয়েছে।

নোবেলপ্রাপ্তির পর রবীন্দ্রনাথ যুক্তরাষ্ট্র সফরে গেলে তা আলোড়ন তুলেছিল সংস্কৃতি মহলে। সেটা ছিল ১৯১৬ সাল। ১৯১৭ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি ছিলেন সে দেশে। সে সময়ই জট পাকানো কিছু ঘটনার কারণে রবীন্দ্রনাথের নাম উঠেছিল মার্কিন গোপন নথিতে। পাঠক বইটি পড়ার সময় গদর পার্টি, হিন্দুস্তান গদর, হিন্দু-জার্মান কন্সপিরেসি ইত্যাদি শব্দগুলোর সঙ্গে পরিচিত হবেন। এখানে তার বিশদ উল্লেখ করা হলো না। কীভাবে রবীন্দ্রনাথের নাম এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত হলো, তা কৌতূহলী পাঠক বইটি পড়েই জেনে নেবেন। তবে পাঠককে স্বস্তি দেওয়ার জন্য এখানে বলে রাখা যায়, ওই ষড়যন্ত্র রবীন্দ্রনাথের নাম যুক্ত হওয়ার খবরে বিস্মিত হয়ে রবীন্দ্রনাথ ১৯১৮ সালের ১১ মে মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসনের কাছে একটি চিঠি লিখেছিলেন। একই বিষয়ে তিনি প্রেসিডেন্টকে টেলিগ্রামও পাঠিয়েছিলেন। তত দিনে অবশ্য মামলার রায় বেরিয়ে গেছে। তৎকালীন ভারতবর্ষের ভাইসরয় লর্ড চেমসফোর্ডের তরফ থেকে কবিকে জানানো হয়, কথিত ওই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে কবির কোনো সংযোগ ছিল না এবং তিনি অভিযোগমুক্ত।

প্রেসিডেন্টের কাছে রবীন্দ্রনাথের চিঠি নিয়ে যখন কথা হচ্ছে, তখন আরেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের কাছে লেখা তাৎপর্যপূর্ণ টেলিগ্রামটির কথাও মনে করিয়ে দেওয়া যায়। ১৯৪০ সালে নাৎসি বাহিনীর হাতে প্যারিসের পতন হলে কালিম্পং থেকে রবীন্দ্রনাথ প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন ডি রুজভেল্টকে একটি টেলিগ্রাম পাঠান। সেখানে কবি লিখেছিলেন, ‘আজ আমরা সহসা ভীতিজনকভাবে ধ্বংসাত্মক শক্তির সামনে দাঁড়িয়ে আছি, যা হঠাৎ করে বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ভারতে প্রতি মুহূর্তে আমি আমাদের সংগতির ক্ষুদ্রতা এবং আমাদের কণ্ঠের দুর্বলতাটিকে এতটাই প্রবল মনে করি যে, তা মন্দের জোয়ারে সভ্যতার স্থায়িত্বকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ...আমার এ কয়েকটি লাইনের মাধ্যমে আমার কেবল এই আশা প্রকাশ করা যে, এমনকি এটা অপ্রয়োজনীয় হলেও, মহাবিশ্বের বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে আমেরিকা তার মিশনে ব্যর্থ হবে না, যা খুবই নিকটবর্তী।’

৫.

ডব্লিউ বি ইয়েটস আর এজরা পাউন্ডকে নিয়ে বইয়ে আলাদা দুটি অধ্যায় রয়েছে। তার প্রয়োজন ছিল। যুক্তরাষ্ট্রে রবীন্দ্রনাথের পা পড়ার আগে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে ইয়েটস আর এজরা পাউন্ডের উচ্ছ্বাস প্রকাশের ঘটনা কারও অজানা নয়। কিন্তু এরপর কেন তারা হঠাৎ করে রবীন্দ্রনাথের ওপর থেকে ভালোবাসা ফিরিয়ে নিলেন, তা পরিষ্কার করার দরকার ছিল। সেটাই করা হয়েছে এই দুই অধ্যায়ে। হালকা ইঙ্গিত দেওয়া আছে, রবীন্দ্রনাথ নোবেল পুরস্কার পেয়ে যাবেন, সেটা হয়তো এই দুই কবি কল্পনা করেননি। ফলে, হঠাৎ করে বিশ্বসভায় রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে কৌতূহল সৃষ্টি হওয়ায় ইয়েটস আর এজরা পাউন্ড দুজনেই কিছুটা ব্যাকফুটে চলে যান। রবীন্দ্রনাথ জাহাজে বসে গীতাঞ্জলি অনুবাদ করেছিলেন ইংরেজিতে। ইয়েটস তার প্রয়োজনীয় সংশোধন করেছেন। একেবারে অন্যরকম সম্মান নিয়ে দেখছিলেন তিনি রবীন্দ্রনাথের লেখা। এজরা পাউন্ডও বড় বিস্ময় নিয়ে তাকিয়েছেন রবীন্দ্রনাথের দিকে। মার্কিন মুল্লুকে দি পোয়েট্রির সম্পাদক হ্যারিয়েট মনরোকে চিঠি লিখে তিনি জানাচ্ছেন, রবীন্দ্রনাথের কবিতার জন্য সাময়িকীতে জায়গা রাখতে। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে এতই যাদের উচ্ছ্বাস, তারা হঠাৎ করে উল্টো পথে হাঁটা শুরু করলেন কেন, তা জেনে পাঠক তৃপ্ত হবেন।

যে পাউন্ড মার্কিন মুল্লুকে রবীন্দ্রনাথকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন, তিনিই ফোর্টনাইটলি রিভিউতে ১৯১৩ সালের মার্চ মাসে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথকে ইতালির রেনেসাঁর কবি ও দার্শনিক দান্তে এবং সাহিত্যিক বোকাসিও’র সঙ্গে তুলনা করেছেন। সে প্রবন্ধেই তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, রবীন্দ্রনাথ কেন গুরুত্বপূর্ণ। অবশ্য সে সময়ও রবীন্দ্রনাথের কিছু সমালোচনা করেছেন তিনি। তবে মূল সংকট কীভাবে তৈরি হয়েছিল তা জানা যাবে পাউন্ডকে নিয়ে লেখা অধ্যায় থেকে। আগে থেকে বলে দিয়ে রস ভঙ্গ করতে চাই না।

৬.

হ্যারিয়েট মনরো, হ্যারিয়েট মুডি, বসন্তকুমার রায়ের কথা আলাদাভাবেই লিখতে হবে। আবদুল্লাহ জাহিদ সেই কাজটি করেছেন। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে এই মানুষদের যোগাযোগের কথা বলতে গিয়ে তিনি তাদের পরিচয়ও তুলে ধরেছেন। কোন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তাদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠতা হয়, সেটিও বলেছেন। ছোট ছোট কিছু ঘটনার বর্ণনা এবং অন্য লেখকদের বই থেকে তুলে আনা বিবরণ ঘটনাগুলোর অবয়ব গড়ে দিয়েছে।

হ্যারিয়েট মনরো এবং হ্যারিয়েট মুডিকে নিয়ে আমেরিকা প্রবাসী আরেক লেখক হাসান ফেরদৌস একটি বই লিখেছেন। তাতে বিস্তারিতভাবে তাঁদের সম্পর্কে জানা যাবে। কিন্তু আবদুল্লাহ জাহিদ স্বল্প পরিসরে আটোসাঁটোভাবে তাদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের যোগাযোগকে যথাযোগ্যভাবে তুলে ধরেছেন।

১৯৩১ সালে রবীন্দ্রনাথের সত্তরতম জন্মদিনে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে ফরাসি সাহিত্যিক রোমা রোলাঁর পরামর্শে ‘দ্য গোল্ডেন বুক অব ঠাকুর’ নামে যে বইটি প্রকাশিত হয়েছিল, তাতে বিশ্বখ্যাত অনেক বিশিষ্টজনের লেখা ছাপা হয়েছিল। সেখানেই হ্যারিয়েট মনরো রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে পরিচয়ের যে বর্ণনা দিয়েছেন, তাতে স্পষ্ট হয়, প্রাচ্যের এই কবি ও কাব্যের প্রতি বহু আগে থেকেই তিনি আকৃষ্ট হয়েছিলেন।

হ্যারিয়েট মনরোর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের যোগাযোগ হয় ১৯১২ সালে, অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের নোবেল প্রাপ্তির আগে। এই যোগাযোগের ক্ষেত্রে এজরা পাউন্ডের অবদান কম নয়। মার্কিন কবি এজরা পাউন্ড তখন ছিলেন লন্ডনে। হ্যারিয়েট মনরো শিকাগো থেকে কবিতা সাময়িকী ‘পোয়েট্রি’ প্রকাশ করছেন। সে সময় ইয়েটস-এর কবিতা পাওয়া যাবে না জানিয়ে এজরা পাউন্ড হ্যারিয়েট মনরোকে লিখেছিলেন, বাঙালি কবি রবীন্দ্রনাথের কিছু কবিতা সংগ্রহের চেষ্টা করছেন তিনি। কিছুদিন পর রোমাঞ্চিত পাউন্ড জানাচ্ছেন মনরোকে, রবীন্দ্রনাথের কিছু কবিতা তাঁর হাতে এসেছে। বলেছেন, ‘এটা স্কুপ। ঠাকুরের জন্য পরবর্তী সংখ্যায় স্থান সংরক্ষণ করুন।’

১৯১২ সালের ডিসেম্বর সংখ্যায় রবীন্দ্রনাথের ছয়টি কবিতা ছাপা হয়েছিল। এর কিছুদিন পরেই ইলিনয় থেকে রবীন্দ্রনাথের ছেলে রথীন্দ্রনাথের একটি চিঠি পেয়ে অবাক হন মনরো। কবি তখন ইলিনয়তে আছেন। মনরো তাঁকে শিকাগোতে আসার আমন্ত্রণ জানান। শিকাগোতে এসে আরেক হ্যারিয়েট, অর্থাৎ হ্যারিয়েট মুডির বাড়িতে রবীন্দ্রনাথ অবস্থান করেন। হ্যারিয়েট মনরো তাঁর আত্মজীবনীকে কবিকে নিয়ে যে কথাগুলো লিখেছেন, তার মধ্য থেকে কিছু অংশ এখানে তুলে দিলে পাঠক বুঝতে পারবেন, রবীন্দ্রনাথের কোন বৈশিষ্ট্যগুলোর প্রতি মনরো আকৃষ্ট হয়েছিলেন। মনরো লিখছেন, ‘তাঁর ছাইরঙা বাঙালি কোর্তা, মুখভরা কাঁচাপাকা দাড়িতে, রবীন্দ্রনাথ ছিলেন প্রাচ্যের এক প্রবীণ প্রাজ্ঞজন। তাঁর চেহারার গড়ন ছিল আর্যদের মতো, গায়ের রং হিস্পানিকদের চেয়ে সামান্য কালো। মিসেস মুডির বাসায় ফায়ারপ্লেসের সামনে আমরা জড়ো হতাম তাঁর (রবীন্দ্রনাথের) কথা শুনতে। তিনি নিজের কবিতা পড়ে শোনাতেন অথবা প্রাচ্যের নিয়ম-নীতির কথা শোনাতেন। মনে হতো আমরা যেন বুদ্ধের পায়ের নিচে বসে আছি। তাঁর ইংরেজি ছিল আমাদের মুখের ভাষার চেয়েও অধিক শুদ্ধ, কিন্তু আমরা সবচেয়ে বেশি ভালো বাসতাম তাঁর চড়া সুরের বাংলা কবিতা ও গান শুনতে। পশ্চিমা সভ্যতা বিষয়ে তাঁর কৌতুককর মন্তব্য শুনতেও আমাদের খুব ভালো লাগত। পশ্চিমে ধর্মকে যেভাবে জীবন থেকে বিযুক্ত করা হয়েছে, তা তাঁকে বিস্মিত করত। ইংরেজের হাতে তাঁর স্বদেশের পরাধীনতায় তিনি খুবই ক্রুদ্ধ ও বিরক্ত ছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ভারত এর আগে আরও অনেকবার বিদেশিদের পদানত হয়েছে, কিন্তু তাদের বিজয় শেষ হতে না হতেই জীবন পুনরায় আগের মতোই স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। কিন্তু ইংরেজদের ভারত জয় ভিন্ন ব্যাপার। এটা যেন মস্ত এক লোহার হাতুড়ি, তা বারবার মানুষের চৈতন্যের ওপর আঘাত হানছে।’

এত বড় একটি উদ্ধৃতি দেওয়া হলো কেবল এই কথা জানাতে যে, হ্যারিয়েট মনরো তাঁর পর্যবেক্ষণে রবীন্দ্রনাথের কতগুলো দিক তুলে এনেছেন! বিশেষ করে ধর্ম-জীবন ও বাস্তবতার স্বরূপ নিয়ে ভাবনার ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছেন, ঔপনিবেশিক শাসন সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ ঘটিয়েছেন, এবং বাংলা ভাষার প্রতি তাঁর মমত্বেরও প্রকাশও তাঁর পর্যবেক্ষণে ধরা পড়েছে। রবীন্দ্রনাথের গোটা জীবনের চিন্তার ক্ষেত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, তাঁর সৃষ্টির একটা বড় অংশেই রয়েছে এই চিন্তাধারার প্রকাশ।

হ্যারিয়েট মুডি এবং রবীন্দ্রনাথ দুজনেই একে অপরের কাছ থেকে জীবনের পাঠ নিয়েছেন। চিঠি লেখার সময় রবীন্দ্রনাথ মুডিকে ‘প্রিয় বন্ধু’ সম্বোধন করেছেন। নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর মুডিকে যে চিঠি লিখেছেন, তাতে উল্লেখ করেছেন, ‘আমি জনতার কৌতূহলে ভারাক্রান্ত। এই নষ্ট দিনগুলির বোঝা আমাকে না কাজ করতে দেয়, না দেয় বিশ্রাম, এটা আমার জন্য এক বিরাট চাপ। এই পুরস্কার আমার দেশের জন্য সম্মান এনে দিয়েছে। আমার স্কুলের জন্যও পুরস্কার। কিন্তু আমার জন্য তা প্রবল অশান্তির কারণ হয়ে উঠেছে, যা আমাকে বরণ করে নিতে হচ্ছে।’

বসন্ত কুমার রায়ের কথাও অনেকের কাছে নতুন বলে মনে হতে পারে। উইসকনসিন বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার ছিলেন তিনি। ‘রবীন্দ্রনাথ টেগোর: দ্য ম্যান অ্যান্ড হিজ পোয়েট্রি’ নামে একটি বই লিখেছিলেন ১৯১৫ সালে। বইটি ছেপেছিল নিউইয়র্কের ডড মিড অ্যান্ড কোম্পানি। ১৯১৫ সালেরই ১৮ এপ্রিল নিউ ইয়র্ক টাইমস সেই বছরের উল্লেখযোগ্য যে ৩০০টি বইয়ের নাম প্রকাশ করে, তার মধ্যে বসন্ত কুমার রায়ের বইটিও স্থান করে নিয়েছিল। তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, ১৯১২ সালে রবীন্দ্রনাথ যখন প্রথম যুক্তরাষ্ট্রে এলেন, তখন তার এই নিভৃত আমেরিকা-বাসের সময়ই বসন্ত কুমার রায় রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। তিনি বেশি বেশি লেখা ইংরেজিতে অনুবাদ করতে অনুরোধ করেছিলেন কবিকে। এর কারণ হিসেবে বলেছিলেন, ‘ইংল্যান্ডের পত্র-পত্রিকায় যেমন বলা হয় বাঙালি মানেই শুধু বোমাবাজি আর রাজদ্রোহ—এ কথাটি যে সত্য নয়, মানুষ সেটা বুঝতে পারবে।’ সে সময়েই বসন্ত কুমার রায় নোবেল পুরস্কারের কথা উঠিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ প্রশ্ন করেছিলেন, ‘এশিয়ানরা কি এই পুরস্কারের জন্য মনোনীত হতে পারে?’

বসন্ত কুমার রায় বলেছিলেন, ‘সন্দেহাতীতভাবে সেটা আপনারই পাওয়া উচিত।’

পরের বছরই নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ।

বসন্ত কুমার রায়কে নিয়ে আরও অনেক কথাই শোনা যায়। বিশেষ করে রবিজীবনীর ৬ষ্ঠ খণ্ডে প্রশান্তকুমার পাল লিখেছেন, ‘...বিদেশে রবীন্দ্রপ্রতিভার প্রচার প্রয়াসের জন্য তিনি অভিনন্দনযোগ্য। কিন্তু রবীন্দ্রপ্রচারের পাশাপাশি আত্মপ্রচার ও আরও কিছু গোলমাল ঘটেছিল, যা উপযুক্ত তথ্যের অভাবে স্পষ্ট করা দুরূহ।’

রবীন্দ্রনাথ বসন্ত কুমারকে পছন্দ করেননি, এটা যেমন সত্য, তেমনি সত্য, ১৯৩০ সালে শেষবারের মতো যখন রবীন্দ্রনাথ যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়েছিলেন, তখন বিদায়ের যে অনুষ্ঠানটি হয়েছিল রিজ কার্লটন হোটেলে, সেখানে বক্তার তালিকায় ছিল বসন্ত কুমার রায়ের নাম। তত দিনে হয়তো রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দূরত্ব কমে গিয়েছিল তাঁর।

৭.

লেখক বইটিতে নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথ বিষয়ক প্রতিবেদন ও সাক্ষাৎকারগুলো অনুবাদ করে দিয়েছেন। মূল পত্রিকার কিছু ছবিও রয়েছে সেখানে। দেখা যাচ্ছে, নিউইয়র্ক টাইমস কবিকে নিয়ে বিভিন্ন সময়েই আগ্রহের দরজা খোলা রেখেছিল। ১৯১৬ সালের ১০ অক্টোবর কবি জয়েস কিলমারের নেওয়া সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হয়। সে সাক্ষাৎকারে কিলমারের একটি মন্তব্য প্রনিধানযোগ্য। তিনি লিখছেন, ‘উইলিয়াম বাটলার ইয়েটসের ভাষায়, “আমার জানামতে এখন পর্যন্ত কোনো ইংরেজ কবি রবীন্দ্রনাথের মতো উচ্চতায় পৌঁছাতে পারেননি।”

‘মি. ইয়েটস বা তাঁর মতো অন্য উৎসাহীরা ভারতীয় কবিকে এক মহান রহস্যময় এবং আধ্যাত্মিক চিন্তার নেতা হিসেবে বিশ্বাস করেন। তবে তাঁর রচনার নিরপেক্ষ পাঠ থেকে এবং তাঁর সঙ্গে কথোপকথনের মাধ্যমে দেখা যায়, তিনি শুধু একজন দার্শনিক অথবা ধর্মীয় নেতা নন, পশ্চিমা চিন্তার তীব্র ধারকসহ পড়ালেখা জানা অসাধারণ উজ্জীবিত একজন মানুষ।’

বড় হলেও উদ্ধৃতিটা তুলে দেওয়া জরুরি মনে করেছি। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে যারা ভাবেন, তারা এই কথাগুলো মনে রেখে রবীন্দ্রনাথকে বিশ্লেষণ করলে ভালো করবেন।

নিউইয়র্ক টাইমসের সংবাদদাতা হার্ভার্ড ম্যাথিউ-এর নেওয়া সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হয় ১৯২৯ সালের ১০ মে। এই সাক্ষাৎকারটিতে ভারতবর্ষের দুর্দশা নিয়ে অনেক কথা ছিল। পাঠক নিজ গরজেই পুরো সাক্ষাৎকারটি পড়বেন নিশ্চয়, আমি শুধু প্রাসঙ্গিক কিছু ভাবনা উদ্রেককারী রবীন্দ্রভাষ্য উপস্থাপন করছি। প্রশান্ত মহাসাগরের পানিতে ভাসমান জাহাজ তাইয়ো মারু’তে যুক্তরাষ্ট্রের সাংবাদিকদের সঙ্গে কথোপকথনে রবীন্দ্রনাথ যে কথাগুলো বলেন, তার গভীরতা আশা করি সবাই বুঝতে পারবেন।

রবীন্দ্রনাথ সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘প্রশাসন একটি উদ্দীপ্ত জাতিকে তার ঐতিহ্য এবং জীবনের পুরো কাঠামো থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে এবং তারা সেখানকার মানুষদের বুঝতে পারছি না।’

‘ভারতের স্বাধীনতা নির্ভর করছে ভবিষ্যতের ওপর, তাই এখন এ সম্পর্কে বিবেচনা করা নিরর্থক। বিদেশি মাসন থেকে মুক্ত করার আগে ভারতকে অনেক চড়াই উতরাই পার হতে হবে। তবে তিনি মনে করেন, ভারত একদিন তার সমস্যা কাটিয়ে উঠে একটি মহান জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে এবং ভবিষ্যতে বিশ্বে তার স্থান করে নেবে।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা তিনি বলেছিলেন। বলেছিলেন, ‘অন্য কোনো বিদেশি জাতির চেয়ে ব্রিটিশদের তৈরি আইন ভালো।’ তবে রবীন্দ্রনাথ ব্রিটিশ প্রশাসনের ভূমিকায় হতাশ। তারা ভারতীয়দের সঙ্গে মানবিক যোগাযোগ হারিয়ে ফেলেছে এবং তাদের হৃদয়হীন, নির্দয় ও অবমাননাকর আচরণ মানুষের দুর্দশার কারণ হয়েছে। তাদের তৈরি বিধিবিধানগুলো আইনশৃঙ্খলা এনেছে কিন্তু গ্রামগুলোর কেন্দ্রে থাকা মানুষের জীবনব্যবস্থাকে কেড়ে নিয়েছে। ভারতের দারিদ্র্যের মূল কারণ গ্রামে যে প্রাচীন সম্পদগুলো ছিল, তার স্থানচ্যূতি। মানুষ তাদের কেন্দ্রের ভারসাম্য হারিয়েছে। গ্রামের দুর্দশা অবিশ্বাস্য। জনগণ তাদের জীবনের প্রতি আগ্রহ হারিয়েছে। তারা দুর্ভিক্ষ, কলেরা, ম্যালেরিয়া, ইনফ্লুয়েঞ্জাসহ যে কোনো কিছুতে সহজেই আক্রান্ত হয় ব্রিটিশরা নিষ্ক্রিয়ভাবে তাদের মরতে দেয়। অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন পুরো ভারতীয় জীবনের কাঠামোকে স্থানচ্যূত করেছে। প্রথমে বিষয়টা এতটা স্পষ্ট ছিল না, তবে প্রতিদিনই অবক্ষয়ের চিহ্ন প্রকট হয়ে উঠছে এবং অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ছে। দেরিতে হলেও সরকার আমি যা বলছি, তার সত্যতা উপলব্ধি করতে শুরু করেছে। রাজকীয় কৃষি কমিশনের মতো সংস্থাগুলো কাজ করতে শুরু করেছে।’

আরও একটি প্রসঙ্গ দিয়ে আপাতত রবীন্দ্র-ভাবনার বিষয়টি শেষ করব। তিনি বলেছিলেন, ‘জনগণের শিক্ষার জন্য কার্যত ব্রিটিশরা কিছুই করেনি। প্রশাসনের জন্য যথেষ্ট খরচ করলেও তারা মানুষের শিক্ষা, পয়ঃপ্রণালি ও স্বাস্থ্যসেবার জন্য খুব সামান্য অর্থই ব্যয় করেছে।’

ব্রিটিশদের শাসন ব্যবস্থা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের কথাগুলো কতটা গভীর ছিল, সেটা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। ১৯১৯ সালে রবীন্দ্রনাথ যখন জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাযজ্ঞের প্রতিবাদে ব্রিটিশদের দেওয়া নাইটহুড প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, তখনো বোঝা গিয়েছিল ব্রিটিশ শাসনের অমানবিক জায়গাগুলো তাঁর চোখ এড়ায়নি।

এ ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জন রবীন্দ্রনাথের যে সাক্ষাৎকারগুলো নিয়েছিলেন, সেগুলোও ছাপা হয়েছিল নিউইয়র্ক টাইমসে। আবদুল্লাহ জাহিদ নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত সবগুলো সাক্ষাৎকার ও প্রতিবেদন এক জায়গায় এনেছেন এবং অনুবাদ করেছেন। পাঠক এই সাক্ষাৎকারগুলোর বৈচিত্র্য এবং ভাবনার পরিধি নিয়ে একধরনের মূল্যায়নে যেতে পারেন।

৮.

যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে রবীন্দ্রনাথের আঁকা চিত্র প্রদর্শনী নিয়ে যে অধ্যায়টি রচিত হয়েছে, তা খুবই চিত্তাকর্ষক। চিত্রকলা ছিল রবীন্দ্রনাথের শেষ বয়সের প্রেম। ৬৭ বছর বয়সে (১৯২৮ সাল) তিনি আঁকাআকির প্রতি আকৃষ্ট হন। তবে এই প্রেমের অঙ্কুরোদ্গম হয়েছিল আরও কিছুদিন আগে। আর সেই প্রক্রিয়ায় আর্জেন্টিনার ভিক্তোরিয়া ওকাম্পোর অবদান অনেক। ১৯২৪ সালে পেরুর স্বাধীনতা সংগ্রামের শত বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে কবি যাচ্ছিলেন জাহাজে করে। জাহাজেই তিনি লিখতে শুরু করলেন পূরবী কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো। তখন তিনি শারীরিকভাবে অসুস্থ। অভ্যাসমতো কোনো শব্দ বা পঙ্‌ক্তি পছন্দ না হলে তিনি কালির আঁচড়েই তা কেটে ফেলতেন। এভাবেই কাটাকুটি করতে করতেই তৈরি হয়ে যায় ছবি। কবিতা আর ছবি যেন মিলেমিশে থাকে। শারীরিক অবস্থা খুব খারাপ হয়ে গেলে পেরু সফর অসমাপ্ত রেখে আর্জেন্টিনায় অনির্ধারিত যাত্রাবিরতি করেন। সেখানেই দেখা হয় ফরাসি অনুবাদে গীতাঞ্জলিতে মুগ্ধ ভিক্তোরিয়া ওকাম্পোর সঙ্গে। কবি ভিক্তোরিয়া ওকাম্পোর আতিথেয়তায় আর্জেন্টিনায় থাকেন দেড় মাস। এই ভিক্তোরিয়া ওকাম্পোই কবিকে চিত্রকর হিসেবে পরিচিত করে তুলেছিলেন।

এখানে আর কথা বাড়ানো ঠিক হবে না। ওকাম্পো সম্পর্কে যারা কৌতূহলী হয়ে উঠবেন, তারা শঙ্খ ঘোষের ‘ওকাম্পোর রবীন্দ্রনাথ’ বইটি পড়ে দেখতে পারেন। ওকাম্পোকে রবীন্দ্রনাথের ‘বিজয়া’ নামটি দেওয়ার প্রসঙ্গটিও জানা যাবে। শেষ বয়সের প্রেম কি শুধু চিত্রকলাই—এই প্রশ্ন নিয়েও ভাবার একটা পরিসর তৈরি হবে।

৯.

আলোচনা থেকে লিওনার্ড এলমহার্স্টসহ আরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বাদ পড়ে গেলেন। বাদ রাখার একটা কারণ আছে। সবকিছুই আগে বলে দিলে ‘আমেরিকায় রবীন্দ্রনাথ’ বইটি পড়ার জন্য আগ্রহ থাকবে কী করে? মার্কিন সফরের সময়গুলোয় রবীন্দ্রনাথের ভাবনা এবং রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে ভাবনাগুলোকে একসূত্রে গেঁথেছেন আবদুল্লাহ জাহিদ। । যুক্তরাষ্ট্র থেকে রবীন্দ্রনাথ স্বজনদের সঙ্গে যে চিঠিপত্রের আদান-প্রদান করেছেন, তারও সন্নিবেশ ঘটিয়েছেন লেখক। মার্কিন দেশে যাওয়ার পর সেখানকার জীবন ব্যবস্থা সম্পর্কে টাটকা সব খবর সেখানে পাওয়া যাবে।

বইটি পড়ার পরে মার্কিন বা ইউরোপিয়ান যে লেখকেরা রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে পূর্ণাঙ্গ বই লিখেছেন, তাদের লেখাগুলো সংগ্রহ করার ব্যাপারেও আগ্রহ জাগতে পারে। বহু দেশ ভ্রমণ করেছেন রবীন্দ্রনাথ। ইতালিতে গিয়েছেন মুসোলিনির আমন্ত্রণে। সেখানে প্রগতিশীল মানুষের সংস্পর্শে এসে বুঝতে পেরেছেন মুসোলিনীর নিষ্ঠুরতার কথা। সে বিষয়ে পরে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘ইটালিতে আমি নিজেকে অশুচি হতে দিয়েছি, তার শুদ্ধির অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে আমাকে যেতে হবে।’ এ ব্যাপারে প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ ইটালির পত্রপত্রিকায় রবীন্দ্রনাথের নামে ছাপা হওয়া খবরগুলোয় কেবলই প্রশস্তি দেখছিলেন। কাগজগুলো দেখলে মনে হয়, রবীন্দ্রনাথ বুঝি মুসোলিনির প্রশংসাই করে যাচ্ছেন। নেতিবাচক কথার ইঙ্গিত থাকলেই তারা তা লুকিয়ে ফেলেছেন। রবীন্দ্রনাথ তো এ কথাও বলেছিলেন যে, ‘শুধু বাইরের সফলতাই একমাত্র কাম্যবস্তু নয়, রাষ্ট্রের মানুষগুলোর মন কীভাবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে সেইটাই সাফল্যের প্রধান পরিচয়।’ কিন্তু সে কথা কি ছেপেছিল কোনো ইটালিয় পত্রিকা? একেবারেই না।

আবার সোভিয়েত ইউনিয়ন সফরের সময় সোভিয়েত ব্যবস্থার প্রশস্তি করার ফাঁকে সে ব্যবস্থার ত্রুটিগুলো যখন দেখিয়ে দিলেন রবীন্দ্রনাথ, তখন সোভিয়েতরাও সেগুলো ছাপতে চায়নি। রবীন্দ্রনাথ রাশিয়ার চিঠি লিখেছিলেন। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নে যখন রবীন্দ্রনাথের সোভিয়েত সফরের ওপর নথিপত্র প্রকাশিত হলো, তখন দেখা গেল ১৩ নম্বর চিঠিটি বাদ পড়েছে। কেন বাদ পড়ল। পাঠক, চিঠির কয়েকটি ছত্র পড়লেই তা বুঝতে পারবেন। রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, ‘মানুষের ব্যষ্টিগত ও সমষ্টিগত সীমা এরা যে ঠিকমতো ধরতে পেরেছে, তা আমার বোধ হয় না। সে হিসেবে এরা ফ্যাসিস্টদেরই মতো। এই কারণে সমষ্টির খাতিরে ব্যষ্টিকে দুর্বল করে সমষ্টি সবল করা যায় না, ব্যষ্টি যদি শৃঙ্খলিত হয়, তবে সমষ্টি স্বাধীন হতে পারে না। এখানে জবরদস্ত মানুষের একনায়কত্ব চলছে। এইরকম একের হাতে দশের চালনা দৈবাৎ কিছুদিনের মতো ভালো ফল দিতেও পারে, কিন্তু কখনোই চিরদিন পারে না...’।

কথাগুলো কতটা সত্য ছিল, তা আজকের বিশ্বের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। সোভিয়েত ইউনিয়নের ভালো দিকগুলোর প্রচার করেছে রাশিয়া, কিন্তু যে শঙ্কার কথা তুলে এনেছেন রবীন্দ্রনাথ, সেগুলো বেমালুম এড়িয়ে গেছে। আবদুল্লাহ জাহিদের বইয়ে যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের ধারণার ক্ষেত্রেও যথেষ্ট কঠোরভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে দেশটি। তাই মনে হয়, কবি যখন দ্রষ্টার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, তখন শাসকেরা তাঁকে নিয়ে বিদ্রূপ করা কিংবা তাঁর ব্যাপারে মৌন থাকা কিংবা নিদেনপক্ষে সমালোচনার জায়গাগুলোকে ঢেকে দেওয়ারই চেষ্টা করে।

‘আমেরিকায় রবীন্দ্রনাথ’ বইটির বহুল প্রচার কামনা করি। এই বই গবেষকদের জন্য যেমন একই বিষয়ে একই জায়গার অনেক তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের সুযোগ করে দেবে, তেমনি সাধারণ পড়ুয়া পাঠকের জন্য রবীন্দ্র জীবনের একটি অধ্যায়কে উন্মোচিত করবে।

৩৪৬ পৃষ্ঠার বইটি ছেপেছে ভাষাচিত্র। প্রচ্ছদ আনিসুল হকের। গায়ের দাম ১০০০ টাকা।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত