Ajker Patrika

গোপন হত্যাচেষ্টা, কেলেঙ্কারি, ৪ বছর যুদ্ধের পরও কীভাবে টিকে আছেন জেলেনস্কি

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
গোপন হত্যাচেষ্টা, কেলেঙ্কারি, ৪ বছর যুদ্ধের পরও কীভাবে টিকে আছেন জেলেনস্কি
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলদিমির জেলেনস্কি। ছবি: সিএনএন

ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের চার বছর পূর্তি হতে যাচ্ছে। এই সময়ের মধ্যে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলদিমির জেলেনস্কি একদিকে যেমন একাধিক গোপন হত্যাচেষ্টা ও রাজনৈতিক কেলেঙ্কারির মুখোমুখি হয়েছেন, তেমনি অব্যাহত যুদ্ধের চাপেও নেতৃত্ব ধরে রেখেছেন।

শুক্রবার এক নিবন্ধে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন জানিয়েছে, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রুশ ট্যাংক যখন সীমান্ত পেরিয়ে ইউক্রেনে ঢুকে পড়ে, তখন গুজব ছড়িয়ে পড়ে জেলেনস্কি কিয়েভ ছেড়ে পালিয়েছেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ভবনের সামনে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে ধারণ করা এক ভিডিও বার্তায় তিনি জানান, ‘আমরা এখানেই আছি।’ সেই বার্তাই পরে যুদ্ধবিধ্বস্ত জাতির প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে ওঠে।

রুশ পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল জেলেনস্কিকে সরিয়ে দেওয়া। ঘনিষ্ঠ সূত্রের বরাতে জানা যায়, রুশ এজেন্টরা জেলেনস্কির কার্যালয়ের আশপাশে বাসা ভাড়া নিয়ে তাঁকে হত্যার প্রস্তুতি নিয়েছিল। যুদ্ধের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্র তাঁকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব দিলে তিনি নাকি জবাব দিয়েছিলেন, ‘আমার গোলাবারুদ দরকার, লিফট নয়।’ এই উক্তিটি পরে খুব দ্রুত জনপ্রিয় এবং কিংবদন্তিতে পরিণত হয়।

জানা যায়, চার বছরে প্রায় এক ডজন হত্যাচেষ্টা থেকে বেঁচে গেছেন জেলেনস্কি। তবে শুধু যুদ্ধ নয়, তাঁকে মোকাবিলা করতে হয়েছে দুর্নীতির অভিযোগ ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দ্বন্দ্বও। গত বছর দুর্নীতিবিরোধী সংস্থার স্বাধীনতা খর্ব করার উদ্যোগে জনরোষ দেখা দিলে তিনি সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে বাধ্য হন। একই সময়ে তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের বিরুদ্ধে কেলেঙ্কারি সামনে আসে।

সামরিক ক্ষেত্রেও চ্যালেঞ্জ কম ছিল না। জনপ্রিয় সেনাপ্রধান ভ্যালেরি জালুঝনি-এর সঙ্গে মতবিরোধের জেরে ২০২৪ সালে তাঁকে সরিয়ে দেন জেলেনস্কি। পরে নতুন সেনাপ্রধান ওলেক্সান্ডার সিরস্কির নেতৃত্বে রাশিয়ার কুরস্ক অঞ্চলে আকস্মিক পাল্টা অভিযান চালায় ইউক্রেন। এই পদক্ষেপ ইউক্রেনের বাহিনীর সাময়িক মনোবল বাড়ালেও যুদ্ধের সামগ্রিক চিত্র বদলায়নি। বর্তমানে দেশটির পূর্ব ফ্রন্টে ১,২০০ কিলোমিটারজুড়ে লড়াই অচলাবস্থায় রয়েছে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও জেলেনস্কিকে জটিল ভারসাম্য রক্ষা করতে হয়েছে। বিশেষ করে বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বেশ উত্থান-পতনের মুখে পড়েছে। দেখা গেছে, হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে এক বৈঠকে তিনি প্রকাশ্যে সমালোচনার মুখে পড়লেও দেশে ফিরে তাঁর জনপ্রিয়তা উল্টো বেড়ে যায়। তবে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা পুনর্বহাল করাতে এখনো সফল হননি তিনি।

বলা হচ্ছে, জেলেনস্কির নেতৃত্বের অন্যতম শক্তি তাঁর যোগাযোগ দক্ষতা। প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা না থাকলেও জনপ্রিয় টিভি সিরিজ ‘সারভেন্ট অব দ্য পিপল’-এ অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছিলেন। পরে ২০১৯ সালে নির্বাচনে ৭৩ শতাংশ ভোট পেয়ে তিনি ক্ষমতায় আসেন। প্রতিদিন ভোরে যুদ্ধ পরিস্থিতির আপডেট নেওয়া থেকে শুরু করে নিয়মিত ভিডিও বার্তার মাধ্যমে জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ—সবকিছুতেই তিনি সরাসরি উপস্থিতি বজায় রেখে আসছেন।

তাঁর স্ত্রী ওলেনা জেলেনস্কি জানিয়েছেন, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তাঁদের জীবনে পূর্ণ সুখের কোনো মুহূর্ত আসেনি। তবে পারিবারিক ছোট ছোট আনন্দই তাঁদের টিকিয়ে রেখেছে।

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার হামলার পর গুজবের জবাবে জেলেনস্কি এভাবেই জানিয়ে দেন তিনি পালাননি। ছবি: সিএনএন
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার হামলার পর গুজবের জবাবে জেলেনস্কি এভাবেই জানিয়ে দেন তিনি পালাননি। ছবি: সিএনএন

বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধে ব্যর্থ পাল্টা আক্রমণ ও দুর্নীতির অভিযোগে জেলেনস্কির জনপ্রিয়তা ওঠানামা করলেও কখনোই ৫০ শতাংশের নিচে নামেনি। অধিকাংশ ইউক্রেনীয় এখনো মনে করেন, শান্তির পথে দেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য তিনিই উপযুক্ত ব্যক্তি।

তবে ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। রাশিয়া সর্বোচ্চ দাবিতে অনড় থাকায় শান্তি আলোচনা স্থবির হয়ে আছে। এ অবস্থায় ইউক্রেনের অবকাঠামোয় রুশ হামলা অব্যাহত থাকায় দেশটির বহু মানুষ বিদ্যুৎ ও তাপের সংকটে ভুগছেন। এমন বাস্তবতায় প্রশ্ন রয়ে গেছে—জেলেনস্কির দৃঢ়তা ও রাজনৈতিক কৌশল আর কত দিন তাঁকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখবে। তবু এত প্রতিকূলতার মাঝেও তিনি এখনো কিয়েভেই আছেন—যুদ্ধের শুরুতে দেওয়া সেই বার্তার মতোই।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত