Ajker Patrika

মার্কিন হামলা ঠেকাতে ইরানকে যেভাবে শক্তিশালী করছে চীন

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৫: ১৬
মার্কিন হামলা ঠেকাতে ইরানকে যেভাবে শক্তিশালী করছে চীন
মার্কিন হামলার মুখে ইরানকে কৌশলগতভাবে শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে ইরান। ছবি: দ্য ক্রেডল

চীনকে সাধারণত সুপারপাওয়ার হিসেবেই ধরা হয়। বহু সূচকে সেটি সত্যও। মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপিতে চীন বিশ্বের দ্বিতীয়। ক্রয়ক্ষমতা সমতা বা পিপিপি হিসাবে পরিমাপ করলে চীন প্রথম। দেশটি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য। তাদের পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার বেশ বড় এবং ক্রমবর্ধমান। বিশ্বের বেশির ভাগ দেশের প্রধান বাণিজ্য অংশীদার চীন। টানা তিন দশকের নজিরবিহীন অর্থনৈতিক অগ্রগতি সত্ত্বেও চীন ‘উচ্চ আস্থার’ সমাজ হিসেবে চরিত্র হারায়নি।

তবে সুপারপাওয়ারকে কেবল উপাধিতে নয়, কাজেও প্রমাণিত হতে হয়। প্রকৃত সুপারপাওয়ার নিজেদের স্বার্থ রক্ষা বা এগিয়ে নিতে সামরিক শক্তি ব্যবহার করে। মার্কিন প্রশাসন ইরানকে হুমকি দিচ্ছে। ২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর এবার তারা নতুন ধাপের আক্রমণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ওই হামলায় বহু ইরানি নেতা নিহত হন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ফোরদো, নাতাঞ্জ ও ইসফাহানে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ করা হয়েছে। এখন আমেরিকার লক্ষ্য ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি। ইরান বলেছে, ক্ষেপণাস্ত্র তাদের একমাত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার বিরুদ্ধে ঢাল হিসেবে কাজ করে। তাই এটি আলোচনার বিষয় নয়। তবে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হলে ইরান তাদের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ‘ডাউনব্লেন্ড’ বা নিম্নমাত্রায় রূপান্তর করার বিষয়ে আলোচনা করতে রাজি।

কিছু পশ্চিমা পর্যবেক্ষক মনে করেন, মার্কিন–ইসরায়েলি আক্রমণের মুখে দুর্বল ইরানকে সহায়তায় চীন ও রাশিয়া কিছুই করবে না। কিন্তু বেইজিং ও মস্কোর দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। চীন সরাসরি আমেরিকার সঙ্গে সামরিক সংঘাতে জড়াতে চায় না। তারা মনে করে, সে সময় পরে আসবে। তবে ইরান ও আশপাশের অঞ্চলে চীনের বড় স্বার্থ রয়েছে। তাই বিনিয়োগ ও নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে নিজেদের সুনাম রক্ষায় তাদের পদক্ষেপ নিতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল ইরানে হামলা করলে রাশিয়া ও চীনের আইনি বাধ্যবাধকতা নেই ইরানকে রক্ষা করার। কারণ তাদের মধ্যে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি নেই। তবে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তিন দেশ একটি ত্রিপক্ষীয় কৌশলগত চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এর লক্ষ্য রাজনৈতিক সহযোগিতা জোরদার করা এবং অর্থনৈতিক সংহতি গভীর করা।

রাশিয়া ও ইরান ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ২০ বছরের ‘সমগ্র কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি’ করেছে। এতে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ, অস্ত্র বিক্রি এবং অভিন্ন হুমকি নিয়ে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় হতে পারে। ইউক্রেনে যুদ্ধ নিয়ে রাশিয়া ব্যস্ত। তবু তারা ইরানকে গোয়েন্দা সহায়তা ও অস্ত্র পাঠাতে বাধ্য বোধ করতে পারে। কারণ ইরানের শাহেদ-১৩৬ ড্রোন ইউক্রেনে ন্যাটোর বিরুদ্ধে যুদ্ধে রাশিয়াকে সহায়তা দিয়েছে। মিডল ইস্ট মনিটর জানিয়েছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে রাশিয়া ও ইরান ৫৮৯ মিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তি করেছে। এতে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পুনর্গঠনের কথা রয়েছে। তবে সম্ভাব্য আসন্ন সংঘর্ষের আগে সেই সহায়তা পৌঁছাবে না।

চীনের অবস্থান আরও জটিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা করলে ৪০০ বিলিয়ন ডলারের চীন-ইরান ২৫ বছরের কৌশলগত সহযোগিতা চুক্তি হুমকির মুখে পড়বে। ঝুঁকিতে পড়বে ৬০ বিলিয়ন ডলারের চায়না–পাকিস্তান ইকোনমিক করিডর। এটি ৩ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ অবকাঠামো নেটওয়ার্ক। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের প্রধান স্তম্ভ এটি। চীন ইরানের রপ্তানিকৃত তেলের ৮০ শতাংশের বেশি কেনে। আর তাদের মোট তেল আমদানির প্রায় ১৪ শতাংশ আসে ইরান থেকে। চীন-ইরান রেলপথ সমুদ্রপথের তুলনায় ৫০ শতাংশ দ্রুত। এতে সামুদ্রিক সংকীর্ণ পথ বা চোকপয়েন্ট এড়ানো যায়। ভবিষ্যতে ‘ফাইভ ন্যাশনস রেলওয়ে করিডর’ মধ্য এশিয়া ও আফগানিস্তান হয়ে চীনকে ইরানের সঙ্গে যুক্ত করবে।

ভূরাজনীতি বিশ্লেষক নভরূপ সিং বলেন, ২০২৫ সালের জুনের যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল হামলাকে এখন চীন আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী ঘটনা হিসেবে দেখছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে চীনের কৌশলগত, অর্থনৈতিক ও লজিস্টিক স্বার্থে। ওই হামলার পর ইরানের সঙ্গে চীনের প্রযুক্তিগত সহযোগিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ইরান যুক্তরাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত জিপিএস ত্যাগ করে চীনের বেইডুয়ো স্যাটেলাইট ন্যাভিগেশন সিস্টেম গ্রহণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি সফটওয়্যারের বদলে চীনা সিস্টেম ব্যবহার করছে। সলিড ফুয়েল বা কঠিন জ্বালানিচালিত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রে ব্যবহৃত অ্যামোনিয়াম পারক্লোরেট চীন থেকে আমদানি করেছে। জানা গেছে, ইরান দূরপাল্লার ওয়াইএলসি-৮বি অ্যান্টি-স্টেলথ রাডার এবং এইচকিউ-৯বি দূরপাল্লার ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা মোতায়েন করেছে।

খবরে প্রকাশ, চীন ইসরায়েলে নতুন বিনিয়োগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। আরও বলা হচ্ছে, সংকটকালে সরবরাহ শৃঙ্খলে চীন প্রভাব খাটাতে পারে। কারণ স্বল্পমূল্যের চীনা চিকিৎসা যন্ত্রপাতির ওপর ইসরায়েলের নির্ভরতা রয়েছে। চীন যদি কিছুই না করে, তবে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ইরানকে সহায়তায় তারা অস্ত্র ও গোয়েন্দা তথ্য পাঠাচ্ছে। সম্ভবত অর্থনৈতিক সহায়তাও দেবে। তবে সরাসরি সামরিক বাহিনী পাঠাবে না। ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেবে না। পারস্পরিক প্রতিরক্ষা বাধ্যবাধকতাও সক্রিয় করবে না।

কানাডার অন্টারিওর ব্যালসিলি স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের রজার বয়েড লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত ইরানে শাসন পরিবর্তন চীন ও রাশিয়ার জন্য বিপর্যয় ডেকে আনবে। এতে রাশিয়ার দক্ষিণাঞ্চল উন্মুক্ত হয়ে যাবে। মধ্য এশিয়ার ‘স্তান’ দেশগুলোতে প্রবেশের পথ তৈরি হবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য। হরমুজ প্রণালির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে। এমনকি পাকিস্তানের সঙ্গেও সীমান্ত গড়ে উঠতে পারে।

বয়েড বেইজিংয়ের জন্য একটি অ-সামরিক বিকল্পের কথাও বলেছেন। তিনি লিখেছেন, চীন যুক্তরাষ্ট্রকে জানাতে পারে—ইরানের ওপর যে কোনো হামলার জবাবে তারা সঙ্গে সঙ্গে বিরল মাটির খনিজ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রপ্তানিতে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা দেবে। এই নিষেধাজ্ঞা যুক্তরাষ্ট্র ও হামলায় জড়িত অন্য যে কোনো দেশের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। বিশ্বে পরিশোধিত বিরল মাটির খনিজ উৎপাদনের ৯০ শতাংশের বেশি নিয়ন্ত্রণ করে চীন। স্থায়ী চুম্বক উৎপাদনেও তাদের অংশ প্রায় ৯০ শতাংশ। ফলে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে চীন এক ধরনের ‘দ্বাররক্ষক।’ তবে পুরোপুরি রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা দিলে পশ্চিমা দেশগুলো চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে আরও দ্রুত পদক্ষেপ নিতে পারে।

বর্তমান সংকটে চীনের ‘বৈজ্ঞানিক গবেষণা’ জাহাজ হিসেবে পরিচিত দা ইয়াং ই হাও ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে আরব সাগরে পৌঁছায়। এরপর থেকে এটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন–এর স্ট্রাইক গ্রুপকে অনুসরণ করে চলেছে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে রাশিয়া ও চীনের নৌবাহিনীর জাহাজ ইরানের সঙ্গে যৌথ নৌ-মহড়ায় অংশ নেবে। এ ছাড়া সমুদ্রভিত্তিক মহাকাশ-নজরদারি জাহাজ লিয়াওওয়াং–১ সম্প্রতি ওমান উপসাগরে পৌঁছেছে। এটিকে পাহারা দিচ্ছে একটি টাইপ–০৫৫ ডেস্ট্রয়ার এবং একটি টাইপ–০৫২ডি ড্রেস্ট্রয়ার। চীনের এসব গোয়েন্দা জাহাজ পশ্চিমা নৌবাহিনীর চলাচল পর্যবেক্ষণ করবে, ইরানকে গোয়েন্দা সহায়তা দেবে এবং অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা কার্যক্রম নজরে রাখবে।

বাণিজ্যিক চীনা স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, জর্ডানে যুক্তরাষ্ট্রের থাড (THAAD) ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করা হয়েছে। তাই ধরে নেওয়া যায়, চীনও তাদের গোয়েন্দা স্যাটেলাইট মোতায়েন করেছে, যাতে ইসরায়েলি ও মার্কিন বাহিনীর অবস্থান সম্পর্কে ইরানকে আরও বিস্তারিত তথ্য দেওয়া যায়। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা বিপ্লবী গার্ড বাহিনী–আইআরজিসি নাকি চীনা স্যাটেলাইট নির্মাতাদের সঙ্গে আলোচনা করেছে। লক্ষ্য ছিল রিমোট-সেন্সিং স্যাটেলাইট কেনা বা ব্যবহার করার সুযোগ পাওয়া। এতে সম্ভাব্য হামলার আগাম সতর্কতা পাওয়া যাবে। পাশাপাশি তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যভেদ ক্ষমতাও বাড়বে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে চীন ও ইরান সিএম–৩০২ সুপারসনিক জাহাজবিধ্বংসী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছেছে।

ট্রাম্প ইরানকে সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের দাবি না মানলে ‘অত্যন্ত ভয়াবহ’ পরিণতি অপেক্ষা করছে। তিনি চান, ইরান তাদের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করুক এবং মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক কমাক। ট্রাম্প ইরানকে ৩০ দিনের সময় দিয়েছেন। ফলে ইরানিরা ধারণা করছে, তিন সপ্তাহের মধ্যেই হামলা হতে পারে।

ট্রাম্প চান ২০২৬ সালের এপ্রিলে তাঁর বেইজিং সফর হোক ইরানের বিরুদ্ধে এক বিজয়ের পরপরই। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের হামলায় ইরানে কোনো চীনা নাগরিক নিহত হলে সফরটি বাতিল হতে পারে। তাইওয়ানের সঙ্গে সম্ভাব্য ২০ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্রচুক্তিও সফরটি ভেস্তে দিতে পারে, ইরান পরিস্থিতি যাই হোক না কেন। অন্যদিকে ট্রাম্প চান না, তিনি বেইজিং পৌঁছান এমন অবস্থায় যখন ইসলামিক প্রজাতন্ত্র তাকে আলোচনায় বা সমুদ্রপথে পরাস্ত করেছে।

ইরানি বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘সাহায্য আসছে।’ এই ঘোষণা তাঁর বিকল্প কমিয়ে দিয়েছে। তিনি হয় সমঝোতার পথে যাবেন, তাতে জায়নিস্টরা ক্ষুব্ধ হবে। নয়তো যুদ্ধে যাবেন, তাতে আমেরিকানদের প্রাণহানি হতে পারে। এই অঞ্চলে আব্রাহাম লিঙ্কনের পর ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ মোতায়েন করাও হামলার প্রত্যাশা বাড়িয়েছে। পেন্টাগন নাকি ইরানের বিরুদ্ধে কয়েক সপ্তাহব্যাপী ধারাবাহিক সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা করছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন এভাবে উচ্চমাত্রার সামরিক উপস্থিতি ধরে রাখতে পারবে না। তবে ইরানের বিরুদ্ধে হামলা হলে পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন বাহিনী ব্যস্ত থাকবে। তখন তাইওয়ান প্রণালিতে সংকট দেখা দিলে সেটি চীনের জন্য সুবিধাজনক হতে পারে।

ইরান বৃহত্তর খেলাটি বুঝতে পারছে। ইরানের স্ট্র্যাটেজিক কাউন্সিল ফর ফরেন রিলেশনসের সচিব জালাল দেহঘানি ফিরোজাবাদী বলেছেন, ‘ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির একটি অংশ চীনকে ঠেকানোর কৌশলের ভেতরেই নির্ধারিত।’

চীন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সবসময় সার্বভৌমত্ব ও অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতি জোর দিয়ে তুলে ধরে। ইরানকে ঘিরে সংকট হলে চীনের সহায়তা হবে কৌশলগত, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত। সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়ানো থেকে বেইজিং দূরে থাকতে চায়। তারা প্রভাব ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বাড়াতে চায়, কিন্তু এমন যুদ্ধে জড়াতে চায় না, যেখানে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের মুখোমুখি হতে হয়। অর্থাৎ তারা সীমিত মাত্রার প্রতিযোগিতায় থাকতে চায়। ওয়াশিংটন অভিযোগ করলে বেইজিং বলতে পারে, ‘আমরা রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধ করছি না, আমরা শুধু ইউক্রেনকে সহায়তা করছি’—এর চীনা সংস্করণ।

ট্রাম্পের সামনে কয়েকটি সময়সীমা আছে। এপ্রিলের চীন সফর। ২৫ মে মেমোরিয়াল ডে এবং গ্রীষ্মকালীন ছুটির মৌসুমের শুরু। যদি ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয় এবং জ্বালানির দাম বেড়ে যায়, তবে এই ছুটির মৌসুম ভেস্তে যেতে পারে। আর নভেম্বরে মধ্যবর্তী কংগ্রেস নির্বাচন। তখন ডেমোক্র্যাটরা জ্বালানির উচ্চমূল্য ও মধ্যপ্রাচ্যে প্রাণহানির জন্য তাকে আক্রমণ করতে পারে।

ট্রাম্প এমন দ্রুত ও চূড়ান্ত বিজয় চান, যাতে সময়মতো বেইজিং পৌঁছাতে পারেন। এতে ইসরায়েল ও তাদের মার্কিন মিত্ররা সন্তুষ্ট থাকবে। তাদের অর্থ নভেম্বরের নির্বাচনে তার সমর্থিত প্রার্থীদের দিকে প্রবাহিত হবে। কিন্তু একই সঙ্গে তাঁকে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ ভোটারদেরও সন্তুষ্ট রাখতে হবে। তারা ভাবতে পারে, নিজেদের ‘শান্তির প্রেসিডেন্ট’ দাবি করা ব্যক্তি তাদের ধোঁকা দিয়েছেন। বিশেষ করে, যদি তাদের সন্তানরা ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে প্রাণ হারায়। এমন যুদ্ধ হয়তো এড়ানো যেত, যদি ট্রাম্প তেহরানের সঙ্গে বারাক ওবামার করা পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার না করতেন। তখন বারাক ওবামা ডেমোক্রেটিক পার্টির পক্ষে প্রচারে নেমে বলতে পারেন, ‘আমি তো আগেই বলেছিলাম।’

চীন চায়, ইরানকে সহায়তা করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কৌশল থেকে ‘আচমকা আঘাতের’ উপাদান সরিয়ে দিতে। ইরানি নেতারা আগেই কঠিনভাবে শিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা অনেক সময় হামলার পূর্বাভাস। চীন আশা করে, আলোচনা হলে মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধ এড়ানো যাবে। কারণ, যুদ্ধ ব্যবসার জন্য ভালো নয়। তবে যদি যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা না করে ইরানের ওপর হামলা চালায়, তাহলে সেই সিদ্ধান্তে যুক্তরাষ্ট্রের নিজের ক্ষতি বাড়াতে চীন নীরবে কাজ করবে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট থেকে অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত