Ajker Patrika

অনুগতরাও কেন বিক্ষোভে

ইরানে ব্যবসায়িক সিন্ডিকেট ও চোরাচালান রুট— দুটোই বিপ্লবী গার্ডের নিয়ন্ত্রণে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ১২ জানুয়ারি ২০২৬, ১৮: ০৭
তেহরানের মাশাদ বাজারে বিক্ষোভ। ছবি: সংগৃহীত
তেহরানের মাশাদ বাজারে বিক্ষোভ। ছবি: সংগৃহীত

ইরানে চলমান গণবিক্ষোভের মুখে প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে মুখ খুলেছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনী। তবে বিক্ষুব্ধ জনগণের দাবি দাওয়ার চেয়ে তাঁর বক্তব্যে ফুটে উঠেছে এক কঠোর বিভাজনরেখা। তিনি ‘বৈধ’ দাবি এবং ‘বিদ্রোহের’ মধ্যে পার্থক্য টেনে বিক্ষোভকারীদের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন।

খামেনী বলেছেন, ‘আমরা বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে কথা বলি, কর্মকর্তাদের উচিত তাদের সঙ্গে আলোচনা করা; কিন্তু দাঙ্গাবাজদের সঙ্গে আলোচনার কোনো ফায়দা নেই। দাঙ্গাবাজদের তাদের উপযুক্ত জায়গায় পাঠাতে হবে।’

খামেনী তাঁর বক্তব্যে তেহরান বাজারের ব্যবসায়ীদের প্রশংসা করে তাঁদের ইসলামিক রিপাবলিকের ‘সবচেয়ে অনুগত গোষ্ঠী’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি দাবি করেন, রাষ্ট্রের শত্রুরা বাজারকে ব্যবহার করে ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারবে না। কিন্তু তাঁর এই আশ্বাসের বিপরীতে তেহরান বাজারের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে এখনো বিক্ষোভ থামেনি এবং নিরাপত্তা বাহিনী কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে রাষ্ট্রবিরোধী স্লোগান বন্ধের চেষ্টা চলমান। এমনকি খামেনীকে সরাসরি লক্ষ্য করে স্লোগান দিতেও দেখা গেছে।

১৯৭৯ সালের বিপ্লবে শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভীকে ক্ষমতাচ্যুত করতে এই বাজারের ব্যবসায়ীরাই ছিল প্রধান চালিকাশক্তি। গত চার দশক ধরে তাঁরা রক্ষণশীল রাজনৈতিক বলয়ের মূল ভিত্তি ছিলেন। বিনিময়ে তাঁরা আমদানি লাইসেন্স, অগ্রাধিকারমূলক বিনিময় হার এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে একচেটিয়া আধিপত্য পেয়ে আসছিলেন।

কিন্তু গত দুই দশকে পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। বিশেষ করে বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এবং বড় ধর্মীয় ফাউন্ডেশনগুলোর (বনিয়াদ) অর্থনৈতিক উত্থান বাজারের ব্যবসায়ীদের কোণঠাসা করে ফেলেছে। এক সময় যারা সরকারের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ছিলেন, তাঁরাই আজ পদ্ধতিগত ব্যর্থতার শিকার।

বাজার নিয়ন্ত্রণে আইআরজিসির উত্থান

২০০৫ সালে মাহমুদ আহমাদিনেজাদ ক্ষমতায় আসার পর ‘বেসরকারিকরণের’ ছদ্মবেশে রাষ্ট্রের মূল অর্থনৈতিক কাঠামো আইআরজিসির নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। সংবিধানের ৪৪ নম্বর অনুচ্ছেদের নতুন ব্যাখ্যার মাধ্যমে প্রধান প্রধান রাষ্ট্রীয় সম্পদগুলো ‘পাবলিক নন-গভর্নমেন্টাল এনটিটি’ হিসেবে আইআরজিসি ও বনিয়াদের ছায়া প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এর ফলে অবকাঠামো, পেট্রোকেমিক্যাল, ব্যাংকিং ও টেলিকম খাতের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় সামরিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের হাতে, যাদের অনেকেই সাবেক আইআরজিসি কর্মকর্তা।

এই পরিবর্তনের ফলে ইরানের রাজনৈতিক অর্থনীতিতে আইআরজিসি একটি প্রভাবশালী অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। মোস্তাজাফান ফাউন্ডেশন বা ইমাম রেজা মাজার ফাউন্ডেশনের মতো বড় বনিয়াদগুলো আইআরজিসির সঙ্গে মিলে একটি বিশাল ব্যবসায়িক সিন্ডিকেট গড়ে তোলে। এই নতুন শক্তিশালী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্লকটি ‘প্রিন্সিপলিস্ট’ হিসেবে পরিচিতি পায়, যারা বাজারের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাবকে ধুলোয় মিশিয়ে দেয়।

২০১২ সাল থেকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার ফলে ব্যাংকিং ব্যবস্থা সংকুচিত হওয়ায় বাজারের ব্যবসায়ীদের দুর্দিন শুরু হয়। কিন্তু এই সংকট আইআরজিসির জন্য আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়ায়। তারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকা বন্দর ও বিমানবন্দর ব্যবহার করে ‘নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর’ বিকল্প চোরাচালান রুট গড়ে তোলে। বাজারের প্রথাগত আমদানিকারকদের বদলে আইআরজিসি নিজেই প্রধান সরবরাহকারীতে পরিণত হয়। এই তথাকথিত ‘নিষেধাজ্ঞা অর্থনীতি’ একদিকে আইআরজিসিকে আরও ধনী করে তোলে, অন্যদিকে বাজারের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের পথে বসিয়ে দেয়। এই বঞ্চনা থেকেই ২০০৮ সালে শুরু হওয়া ছোটখাটো ধর্মঘট এখন পূর্ণাঙ্গ গণবিদ্রোহে রূপ নিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, খামেনীর সাম্প্রতিক মন্তব্য আসলে আত্মবিশ্বাস নয় বরং গভীর উদ্বেগের বহিঃপ্রকাশ। দীর্ঘকাল ধরে যে বাজার ছিল স্থিতিশীলতার গ্যারান্টি, আজ তাঁদের খোলাখুলি অবাধ্যতা নির্দেশ করছে যে ইরান সরকারের শাসনের ভিত ভেতর থেকে দুর্বল হয়ে পড়েছে।

তাত্ত্বিকভাবে, নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে বা আইআরজিসির ক্ষমতা কমিয়ে বাজারকে আবারও পক্ষে আনা সম্ভব হলেও বাস্তবে তা প্রায় অসম্ভব। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে উত্তেজনা এবং আইআরজিসির বিশাল প্রভাব কমানোর রাজনৈতিক ঝুঁকি—এই দুইয়ের চাপে পড়ে ইরান সরকার এখন দমন-পীড়নকেই একমাত্র পথ হিসেবে বেছে নিচ্ছে। এক সময়ের অনুগত ভিত্তিকে শত্রু বানিয়ে ইরান সরকার এখন টিকে থাকার শেষ চেষ্টা করছে।

আল-জাজিরার নিবন্ধ অবলম্বনে

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত