Ajker Patrika

লাতিন আমেরিকা, ইউক্রেন ও তাইওয়ান নিয়ে কি গোপন সমঝোতায় তিন পরাশক্তি

জাহাঙ্গীর আলম
আপডেট : ০৪ জানুয়ারি ২০২৬, ১৪: ৩২
তিন পরাশক্তি কি তাহলে ভাগাভাগির সমঝোতা করে ফেলেছে। ছবি: সংগৃহীত
তিন পরাশক্তি কি তাহলে ভাগাভাগির সমঝোতা করে ফেলেছে। ছবি: সংগৃহীত

ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক অভিযান এবং প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে নাটকীয়ভাবে তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন আশঙ্কার মেঘ দেখা দিচ্ছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষক এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ শুধু দক্ষিণ আমেরিকায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং এর প্রভাব সুদূর ইউক্রেন এবং তাইওয়ান সংকটেও নতুন মাত্রা যোগ করবে।

বিশ্লেষকদের মতে, কংগ্রেসের অনুমোদন বা আন্তর্জাতিক সমর্থন ছাড়াই ভেনেজুয়েলায় বিমান হামলা ও অভিযান চালিয়ে আমেরিকা একটি ‘বিপজ্জনক উদাহরণ’ তৈরি করেছে। সাবেক ভারতীয় কূটনীতিক রাজীব ডোগরা সতর্ক করে বলেছেন, ট্রাম্পের এই একতরফা পদক্ষেপ চীন ও রাশিয়াকে আগ্রাসনের ব্যাপারে আরও উৎসাহিত করতে পারে।

চীন মনে করতে পারে, আমেরিকা যদি তার প্রভাব বলয় রক্ষায় অন্য দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করতে পারে, তহালে চীনের জন্যও তাইওয়ান দখল করাও যুক্তিযুক্ত। বেইজিং এই পদক্ষেপকে ওয়াশিংটনের ‘ভণ্ডামি’ হিসেবে প্রচার করতে পারে।

রাশিয়া এই অভিযানকে শক্ত প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করতে পারে যে, শক্তিশালী দেশগুলো তাদের প্রতিবেশী ছোট দেশগুলোর ওপর যেকোনো সময় হামলা চালাতে পারে। এতে মস্কোর জন্য ইউক্রেনে তাদের অবস্থানকে আন্তর্জাতিক স্তরে বৈধ দাবি করার সুযোগ তৈরি হবে।

ভেনেজুয়েলায় শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন এবং তেল সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ নিতে গিয়ে আমেরিকা তার সামরিক শক্তি ও মনোযোগের বড় একটি অংশ সেখানে ব্যয় করছে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে শক্তির ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

এ ছাড়া আমেরিকা ভেনেজুয়েলায় দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতিতে ব্যস্ত হয়ে পড়লে ইউক্রেনের জন্য প্রয়োজনীয় অস্ত্র, গোয়েন্দা তথ্য এবং আর্থিক সহায়তা কমে যেতে পারে। এটি সরাসরি রাশিয়াকে যুদ্ধের ময়দানে সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে যাবে।

যেখানে ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির কারণে তাইওয়ান বহু দিন ধরেই আশঙ্কা করছে, আমেরিকা হয়তো দূরপ্রাচ্যের চেয়ে নিজের পাশের অঞ্চল লাতিন আমেরিকাকে বেশি গুরুত্ব দেবে। বলাবাহুল্য, দক্ষিণ চীন সাগরে মার্কিন নৌবাহিনীর উপস্থিতি কমে গেলে বেইজিং সামরিক উসকানি আরও বাড়িয়ে দেবে।

চীন ও রাশিয়ার পাল্টাপাল্টি প্রতিশোধের ঝুঁকি

ভেনেজুয়েলার সঙ্গে রাশিয়া ও চীনের গভীর সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। এই দেশগুলো ভেনেজুয়েলাকে লাতিন আমেরিকায় আমেরিকার বিরুদ্ধে একটি কৌশলগত ঘাঁটি হিসেবে দেখে। ফলে এই হামলার জবাবে তারা অন্য ফ্রন্টে ‘প্রক্সি’ বা সরাসরি আঘাত হানতে পারে। দুই পরাশক্তি সম্ভাব্য যে প্রতিশোধমূলক প্রতিক্রিয়া হতে পারে সেটি এমন:

রাশিয়া ইউক্রেনে আক্রমণের তীব্রতা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিতে পারে কিংবা কৃষ্ণ সাগর বা বাল্টিক অঞ্চলে মার্কিন ড্রোন ও বিমান লক্ষ্য করে উসকানিমূলক পদক্ষেপ নিতে পারে। ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হামলার প্রতিক্রিয়ায় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, ‘কোন অজুহাতে তারা যুগোস্লাভিয়া, ইরাক, সিরিয়া এবং লিবিয়ায় বোমা হামলা চালিয়েছিল? নিরাপত্তা পরিষদের কি নিষেধাজ্ঞা ছিল? না। তারা শুধু এটা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এবং সেটা করেছে। আন্তর্জাতিক আইনে এটাই সব: তারা যা ইচ্ছা তাই করে।’

অপরদিকে চীন তাইওয়ানকে সামগ্রিকভাবে অবরুদ্ধ করার মাধ্যমে আমেরিকার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। প্রখ্যাত সাংবাদিক মেহদি হাসান এক্স হ্যান্ডলে লিখেছেন, ‘যদি সি চিনপিং এখনই তাইওয়ান আক্রমণ করেন এবং সেখানকার প্রেসিডেন্টকে উৎখাত করেন, তাহলে কোন যুক্তিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আপত্তি জানাবে? অথবা কিছু বলার মতো কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা কি তাদের থাকবে?’

কিছু সামরিক বিশেষজ্ঞ সতর্ক করেছেন, এই ত্রিভুজ উত্তেজনা শেষ পর্যন্ত তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে মোড় নিতে পারে—এমন সম্ভাবনা প্রবল হচ্ছে।

অবশ্য কূটনৈতিক মহলে একটি জল্পনা ছড়িয়েছে যে, হয়তো বড় শক্তিগুলোর মধ্যে কোনো গোপন ‘সমঝোতা’ হয়েছে। ভেনেজুয়েলা অভিযানে রাশিয়া বা চীনের পক্ষ থেকে বড় কোনো প্রতিরোধ না আসা এই ধারণাকে উসকে দিচ্ছে।

এটি হতে পারে উনিশ শতকের সেই পুরোনো রাজনীতি, যেখানে বড় শক্তিগুলো বিশ্বকে ভাগাভাগি করে নিয়েছে। রাশিয়ার জন্য ইউক্রেন এবং চীনের জন্য তাইওয়ানকে ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের অবাধ আধিপত্যের কোনো অলিখিত চুক্তি হয়ে থাকতে পারে। যদিও এর কোনো দালিলিক প্রমাণ নেই, তবে ট্রাম্পের ‘বিজনেস-লাইক’ কূটনৈতিক ধরন এই জল্পনার গুরুত্ব বাড়াচ্ছে।

অবশ্য সব বিশ্লেষক এই ডমিনো তত্ত্বের (একটি দেশের ঘটনা আরেকটি দেশে সমসম্ভাব্য হয়ে ওঠা) সঙ্গে একমত নন। আমেরিকার অনেক সমর্থক মনে করেন, এটি কোনো সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন নয়, বরং ‘নারকো-টেররিজম’ বা মাদক-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে একটি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ। তাঁরা মনে করেন, এটি বৈশ্বিক যুদ্ধের কারণ হওয়ার চেয়ে বরং লাতিন আমেরিকায় দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা আনবে।

ভেনেজুয়েলার এই অভিযান কি সত্যিই বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করবে, নাকি এটি কেবল একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের সমস্যার সমাধান হিসেবে শেষ হবে—তা সময়ই বলে দেবে। তবে ইউক্রেন ও তাইওয়ান যে এখন যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগের কেন্দ্র থেকে কিছুটা সরে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়ল, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, আজকের পত্রিকা

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত