Ajker Patrika

আল-জাজিরার নিবন্ধ /যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলকে যেভাবে দীর্ঘ যুদ্ধের চোরাবালিতে আটকে ফেলেছে ইরান

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলকে যেভাবে দীর্ঘ যুদ্ধের চোরাবালিতে আটকে ফেলেছে ইরান
জনসাধারণের জন্য প্রদর্শিত ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের ডামি। ছবি: এএফপি

পূর্ব তেহরানের বাসিন্দা সেপেহর তাঁর অ্যাপার্টমেন্টের সামনের দরজাটি খোলা রাখেন। এটি এক ধরনের নিষিদ্ধ, কিন্তু হিসেবি এক অভ্যাস। যেন ইসরায়েলি–মার্কিন হামলায় আবার বিস্ফোরণের বিকট শব্দে জানালা কেঁপে উঠলেই তিনি ও তাঁর পরিবার দৌড়ে ভূগর্ভস্থ কার পার্কে আশ্রয় নিতে পারেন।

জ্বলন্ত তেল স্থাপনা থেকে ওঠা ঘন ও বিষাক্ত ধোঁয়া যখন এক কোটি মানুষের শহর তেহরানকে ঢেকে ফেলছে, তখন সীমাহীন এক যুদ্ধের বাস্তবতা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সেপেহর বলেন, ‘যুদ্ধটা হয়তো কয়েক সপ্তাহ চলতে পারে। তাই খুব খারাপ না হলে আমি আর আমার পরিবার শহর ছাড়ব না। আপাতত জীবন চলেই যাচ্ছে।’

ইরান এবং বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের মানুষের কাছে এই পরিস্থিতি এক ভুতুড়ে দেজাভ্যুর মতো মনে হচ্ছে। আজ বুধবার ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক আগ্রাসনের ১২ তম দিন। ২০২৫ সালের জুনে সংঘাতের সময় যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে এক নাজুক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়, যা টানা ১২ দিনের তীব্র বোমাবর্ষণের অবসান ঘটায়।

সে সময় ইসরায়েলি হামলায় ইরানে শীর্ষ সামরিক নেতাসহ শত শত বেসামরিক মানুষ নিহত হন। অন্যদিকে ইসরায়েলে নিহত হয় ২৮ জন। কাতারে যুক্তরাষ্ট্রের আল উদেইদ বিমানঘাঁটিতে ইরানের প্রতীকী ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ছিল সেই ১২ দিনের যুদ্ধের শেষ অধ্যায়।

কিন্তু এবার পরিস্থিতি অঞ্চল এবং বিশ্ব উভয়ের জন্য অনেক বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। বর্তমান সংঘাত গত বছরের সীমিত যুদ্ধের সঙ্গে খুব কমই মিল রাখে। কৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে। আগে যেখানে লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত করা, এবার তা রূপ নিয়েছে ইরানের নেতৃত্বকে নির্মূল করার ‘ডিক্যাপিটেশন’ হামলায়। এই পরিবর্তন আগের যুদ্ধের অলিখিত নিয়ম ভেঙে দিয়েছে এবং অঞ্চলটিকে ঠেলে দিয়েছে এক অনির্দিষ্ট, ক্ষয়ক্ষতির দীর্ঘ যুদ্ধে, যেখানে কূটনৈতিক সমাধানের কোনো পথ খোলা নেই।

কূটনীতির মৃত্যু

২০২৫ সালের জুনের যুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী মূলত নাতাঞ্জ, ফোরদো এবং ইস্পাহানের নির্দিষ্ট পারমাণবিক ও সামরিক স্থাপনাগুলোকেই লক্ষ্যবস্তু করেছিল। যদিও তেহরানও ব্যাপক হামলার মুখে পড়ে। ধ্বংসযজ্ঞ ভয়াবহ হলেও লক্ষ্য নির্দিষ্ট থাকায় আলোচনার সুযোগ ছিল।

ওমানের মধ্যস্থতায় জেনেভায় চলা পরোক্ষ পারমাণবিক আলোচনা সেই সময় সংঘাত প্রশমনে ভূমিকা রাখে। তীব্র কূটনৈতিক তৎপরতার পর ২৪ জুন যুদ্ধ শেষ হয়। কিন্তু এবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের লক্ষ্য ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলের প্রথম হামলায় তেহরানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এবং তাঁর পরিবারের কয়েকজন সদস্য নিহত হন। এই হামলার পেছনে ধারণা ছিল, রাষ্ট্রপ্রধানকে সরিয়ে দিলে সরকার দ্রুত আত্মসমর্পণ করবে।

কিন্তু তা ঘটেনি।

বরং খামেনির দ্বিতীয় ছেলে মুজতবা হোসেইনি খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে। শক্তিশালী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এবং গুরুত্বপূর্ণ নেতারা তাঁর প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কখনো ইরানের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ দাবি করেছেন, কখনো দেশটির জনগণকে বিদ্রোহের আহ্বান জানিয়েছেন, আবার কখনো পক্ষ বদলালে সামরিক কমান্ডারদের সাধারণ ক্ষমা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন।

ওয়াশিংটন ও ইসরায়েল দাবি করছে তারা ৫ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে এবং ইরানের বিমান ও নৌবাহিনীকে ধ্বংস করে দিয়েছে। তবুও তেহরানের সরকার ভেঙে পড়েনি। ইরানের দাবি, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দেশটির প্রায় ১০ হাজার বেসামরিক স্থাপনায় বোমা হামলা চালিয়েছে এবং এতে ১ হাজার ৩০০ জনের বেশি সাধারণ মানুষ নিহত হয়েছেন।

ধাক্কা সামলে টিকে থাকা: ‘মোজাইক প্রতিরক্ষা’ কৌশল

ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করলে রাষ্ট্রযন্ত্র ভেঙে পড়বে, এই ধারণা ইরানের সামরিক নীতিকে গুরুতরভাবে ভুলভাবে বোঝার ফল। বিশ্লেষকদের মতে, তেহরান গত দুই দশক ধরে ঠিক এই ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য একটি কাঠামো তৈরি করেছে।

আইআরজিসির তৈরি ‘বিকেন্দ্রীকৃত মোজাইক প্রতিরক্ষা’ ধারণায় কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বিভিন্ন আঞ্চলিক স্তরে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ‘চতুর্থ উত্তরসূরি’ পরিকল্পনা। ফলে শীর্ষ নেতারা নিহত হলেও বা কেন্দ্রীয় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলেও স্থানীয় যুদ্ধ ইউনিটগুলো নিজস্ব সিদ্ধান্তে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে।

ফলস্বরূপ ইরানি নেতৃত্ব দ্রুত মুজতবা খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নিয়োগ দেয়। একই সঙ্গে ইরানের বিশাল ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনী হামলা অব্যাহত রাখে। স্বল্প ও মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোনের ঝাঁক ব্যবহার করে ইরান সময়কেই এক ধরনের কৌশলগত অস্ত্রে পরিণত করেছে। তাদের লক্ষ্য ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র মজুত কমিয়ে আনা এবং ধারাবাহিক হামলার মাধ্যমে অর্থনীতিকে অচল করে দেওয়া।

বিস্তৃত ও ব্যয়বহুল যুদ্ধক্ষেত্র

কূটনৈতিক সমাধানের কোনো পথ না থাকায় যুদ্ধটি পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। ২০২৫ সালে ইরানের পাল্টা হামলা মূলত ইসরায়েল এবং নির্দিষ্ট কিছু মার্কিন স্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালে তেহরান সংঘাতের মানচিত্র আরও বিস্তৃত করেছে এবং নয়টি দেশে হামলা চালিয়েছে।

বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব, ওমান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় সব দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ও বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা হয়েছে। ইরানি সামরিক বাহিনী হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলও সীমিত করেছে। এর ফলে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে এবং অস্থিরভাবে ওঠানামা করছে। বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এই সীমাহীন যুদ্ধের অর্থনৈতিক চাপও বিপুল।

সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) হিসাব অনুযায়ী, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র প্রথম ১০০ ঘণ্টাতেই যুক্তরাষ্ট্রের খরচ হয়েছে প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার, যার বেশির ভাগই ছিল বাজেটের বাইরে। গাজা ও লেবাননে দীর্ঘ যুদ্ধের অর্থনৈতিক চাপে আগে থেকেই বিপর্যস্ত ইসরায়েলেও অভ্যন্তরীণ চাপ বাড়ছে। প্রতিদিন সাইরেন বাজায় লাখ লাখ মানুষকে বাংকারে আশ্রয় নিতে হচ্ছে।

মানবিক মূল্য

রাজনীতিবিদ ও জেনারেলরা যখন ‘জয়’ শব্দটির নতুন সংজ্ঞা নিয়ে তর্ক করছেন, তখন সাধারণ মানুষ বহন করছে যুদ্ধের প্রকৃত মূল্য। এখন পর্যন্ত ইরানে অন্তত ১ হাজার ২৫৫ জন নিহত হয়েছেন। লেবাননে নিহত ৫৭০ জন। ইসরায়েলে ১৩ জন এবং আটজন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন।

ইরানে নিহতদের মধ্যে ২০০ শিশু এবং ১১ জন স্বাস্থ্যকর্মী রয়েছেন। দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর মিনাবে এক হামলায় শাজারে তাইয়্যেবেহ নামের একটি মেয়েদের প্রাথমিক বিদ্যালয় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। এতে ১৬৫ জন নিহত হয়, যাদের বেশির ভাগই ছিল ছোট ছাত্রী।

যুক্তরাষ্ট্র বলেছে তারা হামলাটি তদন্ত করছে। তবে স্বাধীন বিশ্লেষকদের মতে ঘটনাস্থলে পাওয়া টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ ইঙ্গিত দেয় যে হামলার জন্য দায়ী ওয়াশিংটনই। ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি দাবি করেছেন যুদ্ধ ‘খুব শিগগিরই’ শেষ হয়ে যাবে।

কিন্তু বাস্তবতা অন্য কথা বলছে। মিনাবের ধ্বংসস্তূপের ভেতর এক শোকাহত মানুষ সাত বছরের এক শিশুর দেহাবশেষ বুকে জড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ করে চিৎকার করছিলেন। তার মতো কোটি মানুষের কাছে এই যুদ্ধের কৌশল, সামরিক নীতি কিংবা কাগুজে পরিকল্পনা কোনো সান্ত্বনা দেয় না। দেয় শুধু দীর্ঘায়িত শোক, ক্ষতি এবং অন্তহীন যন্ত্রণা।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

হঠাৎ বাড়তি রড-সিমেন্টের দাম

ভারতে প্রথম স্বেচ্ছামৃত্যুর অনুমতি দিলেন সুপ্রিম কোর্ট

আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সরিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র—নিশ্চিত করলেন দ. কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট

সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণ নিয়ে মুখোমুখি সরকারি ও বিরোধী দল

হরমুজ প্রণালিতে মাইন বিছানো শুরু ইরানের, নজিরবিহীন পরিণতির হুমকি ট্রাম্পের

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত