Ajker Patrika

সিএনএনের নিবন্ধ /ইরান যুদ্ধ: ট্রাম্পের ‘দুনিয়া শাসনের’ বাসনা থেকে ভাঙচুরের মুখে বিশ্বব্যবস্থা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
ইরান যুদ্ধ: ট্রাম্পের ‘দুনিয়া শাসনের’ বাসনা থেকে ভাঙচুরের মুখে বিশ্বব্যবস্থা
ট্রাম্পের দুনিয়া শাসনের আকাঙ্ক্ষা পৃথিবীকে এক গভীর ভাঙচুরের মুখে ফেলে দিয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্র মিত্রদের সঙ্গে যে আচরণ করেছিল, তা যেন সেই কুখ্যাত জ্যাকেটের স্লোগানেরই প্রতিধ্বনি। যে জ্যাকেট একসময় ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প পরেছিলেন, ‘আমি আপনাকে পুছি না। আপনি কেন পুছেন?’ ট্রাম্প প্রশাসন শুধু যে জোটভিত্তিক কৌশলকে উপেক্ষা করেছে, তা-ই নয়। ১৯৯০–৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধ কিংবা ২০০৩ সালের ইরাক আগ্রাসনের সময়ের মতো আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বৈধতা অর্জনের চেষ্টাও তারা করেনি। বরং ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে তারা হামলা শুরু করে অনেক ঘনিষ্ঠ মিত্রকেও না জানিয়ে।

উদাহরণ হিসেবে ধরা যায় ইতালির সরকারের এক জ্যেষ্ঠ সদস্যের ঘটনা। ইউরোপের বহু দেশের তুলনায় ইতালি ট্রাম্পের মতাদর্শের কাছাকাছি। কিন্তু সেই কর্মকর্তাই দুবাই সফরে গিয়ে আচমকা খবর পান যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ‘ভাবুন তো, সমন্বয়ের কতটা অভাব ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্রদের এক দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রী তখন ঘটনাস্থলের কাছেই ছিলেন, অথচ কিছুই জানতেন না।’

নয় দিন পর এই যুদ্ধ বিশ্বকে আরও গভীরভাবে টেনে নিয়েছে সেই বিভ্রান্তিকর ঘূর্ণিপাকে, যা ইতিমধ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঝড়তোলা রাজনীতির যুগে আমেরিকার রাজনৈতিক বাস্তবতাকে সংজ্ঞায়িত করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রাথমিক হামলা—যাতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হয়েছেন—মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের সরকারগুলো হঠাৎ এক যুদ্ধের মুখোমুখি হয়, যা তাদের নয়, এবং যেটি অধিকাংশ দেশই চায়নি। কর্মকর্তারা দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে আটকে পড়া নিজেদের নাগরিকদের উদ্ধারে নেমে পড়েন।

জ্বালানির দাম আকাশছোঁয়া হয়ে উঠেছে, দুর্বল অর্থনীতিগুলো আরও বিপর্যস্ত হচ্ছে। অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে উত্তেজনা বাড়ছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে পড়ে। মরুভূমির বুকে গড়ে ওঠা কাচের ঝকঝকে শহরগুলোর বিলাসী শান্তি ভেঙে যায়। একই সঙ্গে বন্ধ হয়ে যায় বৈশ্বিক বিমান চলাচলের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

এখন অনেক মিত্র দেশ বাড়তে থাকা অর্থনৈতিক ক্ষতির মধ্যে বিরক্ত হয়ে উঠছে। তাদের আশঙ্কা, ইরান ভেঙে পড়লে শরণার্থী সংকট তৈরি হতে পারে। নিজেদের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এরপর কী ঘটবে? তবে ট্রাম্প প্রশাসনের বিজয়োল্লাস কিংবা সমালোচকদের এই যুদ্ধকে ইরাকের মতো কাদায় আটকে পড়া সংঘাতের সঙ্গে তুলনা—এসবের মাঝেও বাস্তবতা হলো, যুদ্ধের শেষ কী হবে তা এখনই ন্যায্যভাবে বিচার করা খুব চটজলদি হয়ে যাবে।

অবিরাম মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলা—যা সামরিক পরিকল্পনায় রাজনৈতিক পরিকল্পনার চেয়ে অনেক বেশি সুসংগঠিত বলে মনে হচ্ছে—তেহরানের প্রতিবেশীদের জন্য হুমকি হয়ে ওঠার ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিতে পারে। এতে বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য লাভবান হতে পারে। ট্রাম্পকে আঞ্চলিক শক্তিমান নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। ইসরায়েলকে অস্তিত্বগত হুমকির স্থান থেকে মুক্তি দিতে পারে। আর প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে চলা ইসলামিক রিপাবলিকের সঙ্গে বিরোধের পর যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তাও শক্তিশালী হতে পারে।

কিন্তু যদি পূর্ণাঙ্গ শাসনব্যবস্থার পতন না ঘটে, আর যদি পাল্টা বিপ্লবের বদলে দমন-পীড়ন শুরু হয়, তাহলে ইরানের জনগণকে চড়া মূল্য দিতে হতে পারে। আর যদি ট্রাম্পের যুদ্ধ ইরানি রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ভেঙে দেয় এবং গৃহযুদ্ধের সূত্রপাত ঘটায়, তাহলে শরণার্থী সংকট বা গভীর অর্থনৈতিক অভিঘাত বিশ্বকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।

এই যুদ্ধ পশ্চিমা ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর জন্য এক নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করেছে। তারা ট্রাম্পকে নিয়ে চলতেও পারে না, আবার ট্রাম্প ছাড়াও চলতে পারে না। আসলে ইউরোপ ও উপসাগরীয় অঞ্চলের মিত্ররা কেন এটি আগে বুঝতে পারেনি, তা বোঝা কঠিন। এই যুদ্ধ নতুন ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির এক শক্তিশালী প্রকাশ। যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিকে ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থের এক নতুন ব্যাখ্যা চাপিয়ে দেওয়ার কৌশল এটি।

ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার মার্কিন পদক্ষেপের মতোই, এটিও ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী স্টিফেন মিলারের সেই বক্তব্যের প্রতিফলন—তিনি গত বছর সিএনএনকে বলেছিলেন, ‘বিশ্বের লৌহকঠিন নিয়ম হলো, শক্তিশালী দেশগুলো বলপ্রয়োগ করে শাসন করতে পারে।’

এই যুদ্ধ ট্রাম্পের বিস্ফোরক মেজাজ, বিশাল ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা, দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের প্রতি অনীহা এবং অবারিত ক্ষমতার প্রতি তাঁর আকর্ষণের প্রতিচ্ছবি। আধুনিক যুগের সবচেয়ে অনিশ্চিত প্রেসিডেন্ট এখন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রটিকেই বৈশ্বিক অস্থিরতার সবচেয়ে বড় উৎসে পরিণত করেছেন। এক ইউরোপীয় কূটনীতিক বলেন, সংঘাতে সামরিকভাবে অবদান রাখার প্রধান উদ্দেশ্য হলো ‘জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা।’

অন্যরা বলছেন, ট্রাম্পকে সামলানোও এখন জাতীয় স্বার্থের অংশ হয়ে গেছে। অপর এক ইউরোপীয় কূটনীতিক বলেন, ‘এখন আমরা শান্ত থাকার চেষ্টা করছি এবং তাদের অপমান না করার চেষ্টা করছি।’ তিনি ব্যাখ্যা করেন, প্রকাশ্য শত্রুতা উল্টো ফল দিতে পারে।

ইউরোপীয় কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের মধ্যপ্রাচ্য কর্মসূচির পরিচালক জুলিয়েন বার্নস-ডেসি বলেন, ইউরোপীয়রা পুরো ঘটনায় ‘সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত অবস্থায় ধরা পড়েছে।’ তিনি বলেন, ‘এখন তারা এমন এক মার্কিন প্রেসিডেন্টের দৈনন্দিন খেয়ালের প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে, যিনি বৈশ্বিক ব্যবস্থায় বিপুল অস্থিরতা সৃষ্টি করছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘তারা যেন পাহাড় আর খাদ—এই দুইয়ের মাঝখানে আটকে আছে। একদিকে তারা আন্তর্জাতিক আইন বা নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থার কিছু ধারণা ধরে রাখতে চায়। অন্যদিকে মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছে ট্রাম্পের কাছে নিজেদের গ্রহণযোগ্য রাখতে।’

আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি ট্রাম্পের অবজ্ঞায় ইউরোপীয়রা যতই বিস্মিত হোক, তাদের নিজস্ব সামরিক দুর্বলতা তাদের বাধ্য করছে সাবধানে চলতে। কারণ, তাদের নিরাপত্তার জন্য ট্রাম্প এখনো গুরুত্বপূর্ণ। হেগভিত্তিক কৌশলগত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কগিটোপ্র্যাক্সিসের প্রধান নির্বাহী নিকোলাস ডানগান বলেন, ‘ইউরোপীয়রা নিঃশর্তভাবে আন্তর্জাতিক আইনের চ্যাম্পিয়ন—এভাবে বলা খুবই সরলীকরণ হবে। বাস্তবে বেশির ভাগ ইউরোপীয় দেশের অবস্থান হলো—আমরা তোমাদের পদ্ধতির সমালোচনা করব, কিন্তু উদ্দেশ্যকে মেনে নেব।’

তিনি বলেন, ‘ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যখন শুরু করা যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে, তখন ইউরোপীয়রা এমন এক কৌশল নিচ্ছে—যেখানে তারা জড়িত থেকেও পুরোপুরি জড়িত নয়, আর প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থেকেও পুরোপুরি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নয়।’ তবে ভয়ংকর মার্কিন সামরিক শক্তির ওপর ভর করে ট্রাম্প যেন ইউরোপীয়দের এই সমন্বয় প্রচেষ্টার দিকে খুব একটা তাকাচ্ছেন না। শনিবার সিবিএসকে তিনি বলেন, ‘আমি মোটেও পরোয়া করি না। তারা যা খুশি করতে পারে।’

ইরান যুদ্ধের এই ধাক্কা ট্রান্সআটলান্টিক জোট ন্যাটোকে আরও নাড়া দিয়েছে। এর আগেই জানুয়ারিতে ট্রাম্পের নতুন দাবি—গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত করার প্রস্তাব—এই জোটকে অস্থির করে তুলেছিল। যুক্তরাজ্যের সঙ্গে তথাকথিত ‘বিশেষ সম্পর্ক’ এখন সংকটে। কারণ, ব্রিটেন প্রথমে তাদের ঘাঁটি থেকে মার্কিন পাইলটদের যুদ্ধ মিশন চালানোর অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানালে ট্রাম্প ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখান।

চাপের মুখে থাকা প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ‘আসমান থেকে শাসন পরিবর্তন’ নীতির নিন্দা জানান। একই সঙ্গে তিনি এমন এক জাতির অনুভূতি প্রকাশ করেন, যা ইরাক যুদ্ধের স্মৃতিতে এখনো আঘাতপ্রাপ্ত এবং ৯ / ১১—পরবর্তী যুদ্ধে মিত্রদের হতাহতের প্রতি ট্রাম্পের সাম্প্রতিক অবজ্ঞায় ক্ষুব্ধ। অন্যদিকে ইউরোপের কিছু দেশ আরও দক্ষতার সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা করেছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ বলেন, আন্তর্জাতিক আইনের বাইরে চালানো হামলাকে তিনি ‘সমর্থন’ করতে পারেন না। তবে একই সঙ্গে তিনি ফ্রান্সের স্বার্থ রক্ষায় দেশটির বিমানবাহী রণতরী পাঠিয়ে ট্রাম্পের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ ম্যার্ৎজ ওভাল অফিস সফরের সময় সতর্ক কূটনীতি দেখান। তিনি ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানের হুমকির নিন্দা জানান। অন্যদিকে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সম্পর্কের ঝুঁকি নিয়েই যুক্তরাষ্ট্রকে স্পেনের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করে ইরানে হামলা চালাতে দেননি। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে অভিযুক্ত করেন ‘লাখো মানুষের ভাগ্য নিয়ে রুশ রুলেট (এক ধরনের জুয়া) খেলার’ জন্য।

ইউরোপ যখন কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়ার ধাক্কা সামাল দিতে দৌড়ঝাঁপ করছিল, তখন উপসাগরীয় অঞ্চলে পরিস্থিতি ছিল অনেক বেশি সহিংস ও দ্রুত পরিবর্তনশীল। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঢেউ কুয়েত, সৌদি আরব, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও বাহরাইনে এক অস্বস্তিকর দৃশ্য তৈরি করেছে। এসব দেশের অনেকগুলোই ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের ধনী প্রবাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছিল। কাতারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে পড়ায় অর্থনৈতিক অস্থিরতা দ্রুত বাড়ছে।

তবু অবাক করার মতো বিষয় হলো, ইরানের পাল্টা হামলায় হোয়াইট হাউস বিস্মিত হয়েছে বলে মনে হয়েছে। এটি যুদ্ধ নিয়ে হোয়াইট হাউসের পরিকল্পনার অগভীরতাকেই সামনে এনেছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতের জন্য এটিকে অশুভ ইঙ্গিত বলেও মনে করা হচ্ছে। এক ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তা জানান, যুদ্ধ শুরুর আগেই ধারণা করা হয়েছিল যে সংঘাত শুরু হলে ‘এই অঞ্চলে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলো লক্ষ্যবস্তু হওয়ার সম্ভাবনা খুবই বেশি।’ তবে তিনি স্বীকার করেন, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি অনুমান করতে পারেনি যে ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোর বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুর ওপর এত ব্যাপক হামলা চালাবে। তিনি বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে এটি এখন তাদের কৌশলের অংশ হয়ে গেছে।’

কাতারভিত্তিক জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক পল মাসগ্রেভও মনে করেন, ইরানের প্রতিক্রিয়া ট্রাম্প প্রশাসন কম করে দেখেছিল। তিনি বলেন, এই অভিযানের ফলাফল ভেনেজুয়েলায় নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার মতো দ্রুত হবে না—এ নিয়ে প্রশাসনের যে ‘বিস্ময়’, তা দেখেই মনে হয়েছে তারা সত্যিই ভেবেছিল ইরান হয়তো ব্লাফ দিচ্ছে।

মাসগ্রেভ বলেন, ‘ইরান এখানে স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত করেছে। তারা দোহা বা দুবাই ধ্বংস করে দেয়নি, কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে তারা যে হুমকি বারবার স্পষ্ট করে দিয়েছিল, সেগুলো বাস্তবায়ন করেছে।’

যদিও উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার তীব্রতা কিছুটা কমেছে, তবু ইসলামি প্রজাতন্ত্রের অস্ত্রভান্ডার রাজনৈতিকভাবে এখনো শক্তিশালী, যদিও সামরিকভাবে তা নির্ণায়ক নাও হতে পারে। রোববার কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের জ্বালানি সংরক্ষণাগারে হামলা চালানো হয়। এর কয়েক ঘণ্টা আগে একটি ড্রোন হামলায় দেশটির পাবলিক ইনস্টিটিউশন ফর সোশ্যাল সিকিউরিটি ভবনে আগুন লাগে।

সৌদি আরবে একটি সামরিক প্রজেক্টাইল আবাসিক স্থাপনায় আঘাত হানলে দুজন নিহত এবং আরও ১২ জন আহত হন। এই ঘটনাগুলোই আঞ্চলিক উদ্বেগ বাড়ার কারণ ব্যাখ্যা করে। শনিবার কাতারের আমির তামিম বিন হাম্মাদ আল থানি ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনালাপে বলেন, সংকট নিয়ন্ত্রণে আনা এবং তা শেষ করতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা বাড়ানো জরুরি।

অন্যদিকে, ইরান–যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী ওমানও উদ্বিগ্ন। এই আলোচনা ট্রাম্প ভেঙে দিয়েছিলেন। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আল বুসাইদি গতকাল রোববার সতর্ক করে বলেন, অঞ্চলটি এখন ‘একটি বিপজ্জনক মোড়ে’ দাঁড়িয়ে আছে। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত তিনটি সূত্র জানিয়েছে, উপসাগরীয় কয়েকটি দেশের সরকার ও সামরিক কর্মকর্তারা ট্রাম্প প্রশাসনের আক্রমণাত্মক ভাষা নিয়ে ক্রমশ বিরক্ত হয়ে উঠছেন।

বর্তমানে এই অঞ্চলে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ‘ওয়াশিংটন থেকে যে বার্তা আসছে তা প্রায় অশ্লীল পর্যায়ের। মনে হচ্ছে নেতারা যেন রক্তপাত উপভোগ করছেন, অথচ যুদ্ধের শেষ কোথায়—তা নিয়ে কোনো পরিষ্কার পরিকল্পনা নেই। এদিকে উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থা—জিসিসি দেশগুলোর অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’

এই যুদ্ধের শেষ পরিণতিও যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের জন্য একটি বিপজ্জনক ধাঁধায় পরিণত হতে পারে। ইরানে যদি নতুনভাবে সাজানো ধর্মতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা গড়ে ওঠে—নতুন ঘোষিত সর্বোচ্চ নেতা মুজতবা খামেনি যদি টিকে যান—তাহলে সেটি বাইরের বিশ্বের জন্য তুলনামূলক কম হুমকি হতে পারে। কিন্তু তাঁকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিয়মিত সামরিক হামলার প্রয়োজন হতে পারে।

ভবিষ্যতে যদি সরকার পরিচালনা করে বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) তাহলে তারা অভ্যন্তরীণ দমন-পীড়নকে অগ্রাধিকার দিতে পারে, এবং একই সঙ্গে অঞ্চলটির জন্যও হুমকি তৈরি করতে পারে। কেউই চায় না ইরানে সামাজিক কাঠামোর সম্পূর্ণ ভেঙে পড়া ঘটুক। এবং সবাই জানে, ট্রাম্প তার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কৌশলের মতোই হয়তো হঠাৎ বিজয় ঘোষণা করে সরে যেতে পারেন, আর বাকি সবাইকে পরিণতি সামলাতে ছেড়ে যেতে পারেন।

ট্রাম্প প্রশাসন ইউরোপের দুর্বলতা নিয়ে যেন প্রায় আবিষ্ট। উদাহরণ হিসেবে, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ মিত্রদের সমালোচনা করে বলেছেন, তারা ‘হাত কচলায় এবং আতঙ্কে মুক্তোর মালা আঁকড়ে ধরে থাকে’, আর ‘শক্তি প্রয়োগ করা উচিত কি না তা নিয়ে ভাবনায় ঘুরপাক খায়।’

ইউরোপ যদি নীতিগত অবস্থান ছাড়াই সম্পর্ক মেরামত করতে চায়, তাহলে একটি উপায় হতে পারে নিজেদের শক্তিশালী করে তোলা। লন্ডনের কিংস কলেজের যুদ্ধবিদ্যা বিভাগের জ্যেষ্ঠ গবেষক সোফিয়া গাসটন বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটেনের সঙ্গে তার জোট থেকে তিনটি বিষয় প্রত্যাশা করে—কৌশলগত সামঞ্জস্য, সাংস্কৃতিক সামঞ্জস্য এবং অসাধারণ সক্ষমতা। তাঁর মতে, শক্তিশালী প্রতিরক্ষা সক্ষমতার প্রদর্শন ওয়াশিংটনের কাছে কৌশল ও সংস্কৃতির মতপার্থক্যকে কিছুটা গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারে।

গাসটন বলেন, ‘ব্রিটেনের মতো কোনো দেশ যত বেশি তার নিজস্ব শক্তি, সমৃদ্ধি ও সক্ষমতায় বিনিয়োগ করবে, তত বেশি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তা আকর্ষণীয় অংশীদার হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে এমন জোটের অস্থিরতার মধ্যেও তারা নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে পারবে।’

উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি নির্ভর করবে যুদ্ধের পরিণতি এবং ইরানের আচরণের ওপর। পল মাসগ্রেভ বলেন, ‘উপসাগরের একজন সাধারণ বাসিন্দা হিসেবে যদি ভাবেন, তাহলে বলা যায় অন্তত ক্ষুব্ধ থেকে বিরক্ত—এই অনুভূতিটা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আছে, আর ইসরায়েলের প্রতি তো আরও বেশি।’

তিনি আরও বলেন, ‘কিন্তু আমাদের দিকে যে গুলি ছোড়া হচ্ছে তা আমেরিকা বা ইসরায়েল করছে না। ইরান হয়তো এমন একটি কৌশল নিয়েছে যাতে উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর চাপ বাড়ে এবং তাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের মধ্যে ফাটল তৈরি হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত গুলি ছুড়ছে ইরানই।’

কিছু পর্যবেক্ষক মনে করছেন, ইরানের প্রতি ক্ষোভ হয়তো উপসাগরীয় কিছু দেশকে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার দিকে আরও ইতিবাচকভাবে তাকাতে বাধ্য করতে পারে। এটি ট্রাম্পের অন্যতম অগ্রাধিকার। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গত সপ্তাহে বলেন, তিনি মনে করেন—এই যুদ্ধ সৌদি আরবের সঙ্গে ‘শান্তির পথের দ্বার’ খুলে দিতে পারে।

তবে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রক্ষা করা ইসরায়েলের সাবেক দুই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, তারা ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের কথা শুনছেন। এক কর্মকর্তা বলেন, ‘গত আড়াই বছরে ইসরায়েল যুদ্ধ করেছে এবং সিরিয়া, লেবানন ও গাজার কিছু অংশ দখল করেছে, এমনকি কাতারেও হামলা চালিয়েছে। আর ইসরায়েলি সরকারের কিছু চরমপন্থী মন্ত্রী প্রকাশ্যে বলেছেন তারা ইউফ্রেটিস ও টাইগ্রিস (দজলা ও ফোরাত নদীর অববাহিকা) পর্যন্ত ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করতে চান।’

তিনি ইরাকের দজলা (টাইগ্রিস) ও ইউফ্রেটিসের (ফোরাত) প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, ‘তাই কিছু দেশ প্রশ্ন করছে—ইরানকে সরিয়ে দেওয়া কি শুধু এ জন্য যে এরপর ইসরায়েলই নতুন আঞ্চলিক আধিপত্যশালী শক্তি হয়ে উঠবে?’

ইরান যুদ্ধের পরিণতি গভীর এবং ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে। এটি বিশ্বকে বদলে দেবে। ট্রাম্পের রাজনৈতিক স্বাক্ষরধর্মী কৌশল হলো প্রতিষ্ঠিত কাঠামো ভেঙে ফেলা, তারপর কোথায় কী পড়ে থাকে তা দেখে কোনোভাবে বিজয় ঘোষণা করা। মধ্যপ্রাচ্যে এই কৌশল প্রয়োগ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং মিত্রদের পক্ষে এর পরিণতি অনুমান করা প্রায় অসম্ভব। গত এপ্রিলে দ্য আটলান্টিককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছিলেন, প্রথম মেয়াদে তাঁর ‘দুটি কাজ ছিল—দেশ চালানো এবং টিকে থাকা।’ তিনি যোগ করেছিলেন, ‘আর দ্বিতীয়বারে আমি দেশ শাসন করব এবং দুনিয়া শাসন করব।’

এই যুদ্ধই বাকি বিশ্বকে দেখিয়ে দিচ্ছে, এমন অবস্থান কতটা অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।

সিএনএন থেকে অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

নৌ-পুলিশপ্রধানসহ পুলিশের ৫ অতিরিক্ত আইজিপিকে বাধ্যতামূলক অবসর

ইরানি তেলের ডিপোতে হামলার পর ইসরায়েলকে ‘হোয়াট দ্য ফা**’ বার্তা পাঠায় যুক্তরাষ্ট্র

জঙ্গল সলিমপুরে অভিযান: ড্রোন-হেলিকপ্টার থেকে নজরদারি, আটক ও অস্ত্র উদ্ধার

ফরিদপুরে আওয়ামী লীগ নেতাকে জেলগেটে বরণ করলেন বিএনপির এমপি

নেসকোর প্রধান কার্যালয় বগুড়ায় চান প্রতিমন্ত্রী, সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে কমিটি

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত