
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানে যৌথ হামলা শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এর বিপরীতে তেহরানও দ্রুত ও কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে আসছে। কেবল ইসরায়েল অভিমুখে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছোড়াই নয়, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী মার্কিন সামরিক শক্তিতে সরাসরি আঘাত হেনে সংঘাতের পরিধি বিস্তৃত করেছে ইরান।
এর মধ্যে গত শুক্রবার (২৭ মার্চ) সৌদি আরবের রিয়াদ থেকে ৯৬ কিলোমিটার (৬০ মাইল) দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটিতে ইরানের একটি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ঝাঁক আঘাত হানে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ও এয়ার অ্যান্ড স্পেস ফোর্সেস ম্যাগাজিনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ঘাঁটিতে হামলায় অন্তত ১৫ জন মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৫ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। সৌদি বিমানবাহিনীর এই ঘাঁটিটি মার্কিন বাহিনীও নিয়মিত ব্যবহার করে থাকে।
তবে এসব ক্ষয়ক্ষতির চেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে ওই ঘাঁটিতে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর একটি অত্যাধুনিক নজরদারি উড়োজাহাজ ধ্বংসের খবর।
ইরানের খাতাম আল-আনবিয়া সেন্ট্রাল কমান্ডের মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাগারি একটি ভিডিও বার্তায় দাবি করেছেন, শুক্রবারের এই হামলায় একটি রিফুয়েলিং বিমান সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে এবং অন্য তিনটি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
এয়ার অ্যান্ড স্পেস ফোর্সেস ম্যাগাজিন জানিয়েছে, হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত ব্যয়বহুল ‘ই-৩ সেন্ট্রি’ নজরদারি বিমান এবং একাধিক ‘কেসি-১৩৫’ রিফুয়েলিং ট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরানের ইংরেজি সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভি প্রকাশিত স্যাটেলাইট চিত্রেও এই ধ্বংসযজ্ঞের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
কেন ই-৩ হারানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় আঘাত
ই-৩ সেন্ট্রিতে ইরানের হামলাকে একটি বড় ঘটনা হিসেবে অভিহিত করেছেন সাবেক মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা। কিন্তু কেন এটি এত গুরুত্বপূর্ণ?
অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল জন ভেনাবল বলেন, ‘একটি ই-৩ হারানোয় পারস্য উপসাগরে কী ঘটছে তা দেখার এবং পরিস্থিতি বোঝার সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কমে গেল।’
সাবেক এফ-১৬ পাইলট হিদার পেনি বলেন, আকাশপথের জট কমানো, লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ এবং পুরো বাহিনীকে তথ্য দেওয়ার জন্য এই বিমানগুলো ‘ক্রুশিয়াল ব্যাটল ম্যানেজার’ হিসেবে কাজ করে। এটি হারানো সত্যিই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভয়ানক।
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ কেলি গ্রিকো মনে করেন, স্বল্পমেয়াদে এটি যুদ্ধের জন্য একটি বড় ক্ষতি এবং এর ফলে নজরদারিতে বিশাল শূন্যতা তৈরি হবে।
‘ই-৩জি সেন্ট্রি’ উড়োজাহাজ আসলে কী
ই-৩ সেন্ট্রি মূলত বোয়িং ৭০৭/৩২০-এর একটি পরিবর্তিত সংস্করণ, যার ওপরে একটি ঘূর্ণায়মান রাডার ডোম থাকে। এর রাডারের ক্ষেত্র ৩৭৫ কিলোমিটারের বেশি। এটি আকাশযুদ্ধের কমান্ড ও কন্ট্রোল সেন্টার হিসেবে কাজ করে এবং বিরতিহীনভাবে ৮ ঘণ্টা উড়তে পারে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে ১৬টি ই-৩ সেন্ট্রি রয়েছে, যার মধ্যে ৬টি ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছিল। প্রতিটি ই–৩ বিমানের মূল্য ৫৩৭ থেকে ৫৯৬ মিলিয়ন ডলার।
এক মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও আর্থিক ক্ষতি
গত ৩০ দিনে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটিতে (সৌদি আরব, আমিরাত, বাহরাইন, জর্ডান, কুয়েত ও কাতার) হামলা চালিয়ে ব্যাপক ক্ষতি করেছে। এর মধ্যে জর্ডানে একটি থাড মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেমের রাডার এবং স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থা ধ্বংস হয়েছে।
এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ১২টি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন হারিয়েছে। ইরান একটি এফ-৩৫ এবং একটি এফ-১৫ ভূপাতিত করার দাবি করলেও যুক্তরাষ্ট্র তা অস্বীকার করে জানিয়েছে, তাদের কোনো ফাইটার জেট ধ্বংস হয়নি। তবে গত ১ মার্চ কুয়েতি বিমানের সঙ্গে সংঘর্ষে ৩টি মার্কিন এফ-১৫ই বিধ্বস্ত হয়।
এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের ঘাঁটিগুলোতে ইরানি হামলায় এ পর্যন্ত প্রায় ৮০ কোটি (৮০০ মিলিয়ন) ডলারের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
অসম যুদ্ধ ও তেলের বাজার
ইরান সস্তা ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র এবং সাইবার অপারেশনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান শক্তিকে দুর্বল করার এক ‘অ্যাসিমেট্রিক ওয়ারফেয়ার’ বা অসম যুদ্ধের কৌশল নিয়েছে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে, যা যুদ্ধের আগের তুলনায় ৪০ শতাংশ বেশি।
ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের টমাহক মিসাইলের মজুত প্রায় শেষ করে এনেছে। এ পর্যন্ত ৮৫০টি টমাহক ছোড়া হয়েছে। প্রতিটি টমাহক মিসাইলের দাম প্রায় ২০ লাখ ডলার। পেন্টাগন এখন ক্ষতিগ্রস্ত সরঞ্জাম প্রতিস্থাপনের জন্য ২০০ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত বাজেটের আবেদন করেছে।
এদিকে, পেন্টাগন ইরানে কয়েক সপ্তাহের স্থল অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলেও খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র খারগ দ্বীপ দখলের পরিকল্পনাও থাকতে পারে। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট জানিয়েছেন, পেন্টাগন সব ধরনের প্রস্তুতি রাখছে যাতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সর্বোচ্চ বিকল্প হাতে পান, তবে স্থল অভিযানের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি।
সংঘাতের প্রথম মাসে এ পর্যন্ত অন্তত ১৩ জন মার্কিন সামরিক সদস্য নিহত এবং প্রায় ২০০ জন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে, ইরানি স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের মতে, ইরানে অন্তত ১ হাজার ৯০০ জন নিহত এবং ১৮ হাজারেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের আর্থিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব অনেকটাই নির্ভর করবে যুদ্ধের স্থায়িত্বের ওপর। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, তত বেশি সময় ধরে তেল, গ্যাস, সার, হিলিয়ামসহ অন্যান্য পণ্যের দাম চড়া থাকবে। পারস্য উপসাগরের তেল উৎপাদন ও রপ্তানি অবকাঠামো যত বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে...
১১ ঘণ্টা আগে
১৯৬২ সালের ২৭ অক্টোবর। মানব সভ্যতার ৩ লাখ বছরের ইতিহাসে সম্ভবত এটিই ছিল সবচেয়ে বিপজ্জনক দিন। ১০ কোটি ৯ লাখ দিনের ইতিহাসে এমন মুহূর্ত আর দ্বিতীয়টি আসেনি যখন আমাদের প্রজাতি নিজেদের অস্তিত্ব মুছে ফেলার এত কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল।
১২ ঘণ্টা আগে
ভিক্টোরিয়ান অ্যাডমিরাল স্যার জ্যাকি ফিশার একসময় বলেছিলেন, পাঁচটি কৌশলগত ‘চাবি’ দিয়ে পুরো বিশ্বকে আটকে রাখা সম্ভব। সিঙ্গাপুর, কেপ টাউন, আলেকজান্দ্রিয়া, জিব্রাল্টার এবং ডোভার—এই পাঁচটি জলপথই ছিল বিশ্ব শাসনের মূল চাবিকাঠি। বর্তমান ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সেই তালিকায় আরেকটি নাম যোগ করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
১ দিন আগে
গত তিন সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমানবাহিনী ইরানের আকাশে অনবরত বোমাবর্ষণ করে চলেছে। পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বছরের পর বছর ইসলামিক রিপাবলিককে ভেতর থেকে দুর্বল করার চেষ্টা করেছে। এত কিছুর পরও আশ্চর্যজনক শোনালেও সত্য যে ইরানের বর্তমান নেতৃত্বের সামনে এই যুদ্ধে ‘বিজয়ী’ হওয়ার...
১ দিন আগে