Ajker Patrika

ইতিহাসের বাঁকবদল: যুক্তরাষ্ট্রের তেলসংকট ও নিক্সনের অন্য রকম যুদ্ধ

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০৬ জানুয়ারি ২০২৬, ১৯: ৩৫
সরবরাহ সংকটে একের পর এক বন্ধ হয়ে গিয়েছিল ফিলিং স্টেশন। ছবি: সংগৃহীত
সরবরাহ সংকটে একের পর এক বন্ধ হয়ে গিয়েছিল ফিলিং স্টেশন। ছবি: সংগৃহীত

‘আমেরিকান জীবনযাত্রার ধরন বদলে যেতে চলেছে’—১৯৭৩ সালে বিবিসির তৎকালীন মার্কিন সংবাদদাতা জন হামফ্রিসের এই একটি বাক্যই কাঁপিয়ে দিয়েছিল পশ্চিমা বিশ্বকে। আজ যখন জ্বালানি সংকট নিয়ে আলোচনা হয়, তখন ১৯৭৩ সালের সেই ভয়াবহ অক্টোবর ও তার পরবর্তী ঘটনাবলি এক জ্বলন্ত উদাহরণ হয়ে সামনে আসে। মধ্যপ্রাচ্যে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধকে কেন্দ্র করে তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর (ওপেক) নিষেধাজ্ঞা কীভাবে বিশ্বের ক্ষমতাধর রাষ্ট্র আমেরিকাকে তাদের ঘড়ির কাঁটা পর্যন্ত বদলে দিতে বাধ্য করেছিল, তা এক বিস্ময়কর ইতিহাস।

সংকটের প্রেক্ষাপট: অস্ত্র যখন জ্বালানি তেল

১৯৫০-এর দশক থেকে পশ্চিমা বিশ্বের অভাবনীয় সমৃদ্ধির মূলে ছিল সস্তা তেলের অবাধ সরবরাহ। কিন্তু ১৯৭৩ সালের অক্টোবরে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় তেল রপ্তানিকারক দেশগুলো জ্বালানিকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার শুরু করে। ইসরায়েলের মিত্র দেশগুলোর ওপর, বিশেষ করে আমেরিকার ওপর তেল নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। সৌদি আরবের তৎকালীন তেল মন্ত্রী শেখ আহমেদ জাকি ইয়ামানি তখন বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রূঢ় সত্যটি উচ্চারণ করেছিলেন: ‘খুব সস্তা জ্বালানির যুগ শেষ হয়ে গেছে, এটি এক নতুন যুগ।’

নিক্সনের সময় পরিবর্তনের জুয়া

১৯৭৩ সালের নভেম্বরে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন যখন টেলিভিশনে ভাষণ দিচ্ছিলেন, তখন আমেরিকার তথাকথিত ‘জন্মগত অধিকার’ অর্থাৎ সস্তা গ্যাস বিপন্ন হয়ে পড়েছে। জ্বালানি সাশ্রয়ে তিনি এক চরমপন্থী ও বিতর্কিত ঘোষণা দেন—সারা বছর ‘ডেলাইট সেভিং টাইম’ (ডিএসিটি) চালু করা।

সাধারণত বসন্তে ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা এগিয়ে নেওয়া হয়, কিন্তু নিক্সন ১৯৭৪ সালের ৬ জানুয়ারিতে মাঝশীতের হাড়কাঁপানো অন্ধকারেই দেশবাসীকে ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে নিতে বাধ্য করেন। উদ্দেশ্য ছিল দিনের আলো বেশি ব্যবহার করে বিদ্যুতের চাহিদা কমানো। কিন্তু এর ফলাফল ছিল ভয়াবহ। নিউইয়র্ক টাইমস একে ‘দ্বিতীয় অন্ধকার যুগ’ বলে আখ্যা দেয়। শীতের সকালে যখন সূর্য ওঠার কথা ছিল সকাল সাড়ে ৮টা বা ৯টায়, তখন অন্ধকারেই স্কুলবাসের জন্য অপেক্ষা করতে হতো শিশুদের। কানেকটিকাটে স্কুলে যাওয়ার পথে গাড়ি দুর্ঘটনায় চার কিশোর আহত হওয়ার পর জনরোষ তুঙ্গে ওঠে।

জ্বালানি বাঁচাতে যখন সবাই এক কাতারে

সংকট সামাল দিতে সরকার এতটাই মরিয়া ছিল যে, কিংবদন্তি কান্ট্রি শিল্পী জনি ক্যাশ তেলের বিজ্ঞাপনে এসে দেশবাসীকে গাড়ি আস্তে চালানোর অনুরোধ জানান। নিক্সন মহাসড়কে গাড়ির গতিসীমা কমিয়ে ঘণ্টায় মাত্র ৫০ মাইল নির্ধারণ করেন। এয়ারলাইনসগুলোর তেল সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ায় ১০ শতাংশ ফ্লাইট বাতিল করা হয়। পরিবেশ দূষণবিরোধী আইন শিথিল করে শিল্পকারখানায় কয়লার ব্যবহার বাড়ানো হয়।

এমনকি ঘরের হিটারের তাপমাত্রা ৬৬-৬৮ ডিগ্রি ফারেনহাইটে (১৮-২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) নামিয়ে আনার জন্য নিক্সন ব্যক্তিগতভাবে আবেদন জানান। মানুষকে আশ্বস্ত করতে তিনি কৌতুক করে বলেছিলেন, ‘আমার ডাক্তার বলেছে, ৭৫ ডিগ্রির চেয়ে ৬৬ ডিগ্রিতে মানুষ বেশি সুস্থ থাকে!’ যদিও শীতের প্রকোপে কাঁপতে থাকা আমেরিকানদের কাছে এটি খুব একটা সান্ত্বনাদায়ক ছিল না।

অর্থনৈতিক ধাক্কা

নিষেধাজ্ঞার ফলে শীতের কয়েক মাসে আমেরিকায় তেলের দাম ৫০ শতাংশ বেড়ে যায়। প্রতি গ্যালন তেলের দাম ৬০ সেন্টে পৌঁছানো তখন আমেরিকানদের জন্য ছিল এক বিশাল মানসিক ও অর্থনৈতিক ধাক্কা। ঐতিহাসিক ডেভিড রেনল্ডসের মতে, এটি কেবল তেলের সংকট ছিল না, এটি ছিল একটি জাতির আত্মবিশ্বাসে ফাটল ধরা। এই সংকট থেকেই জন্ম নেয় ‘স্ট্যাগফ্লেশন’—যেখানে মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্ব পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে, পুরো সত্তরের দশককে গ্রাস করেছিল এই সংকট।

ব্যর্থ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও নিক্সনের বিদায়

১৯৭৩ সালের ডিসেম্বরে যেখানে ৭৯ শতাংশ মানুষ সময় পরিবর্তনের পক্ষে ছিল, ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তা নেমে আসে ৪২ শতাংশে। কৃষিপ্রধান এলাকার খামারিরা অভিযোগ করেন, ঘড়ির কাঁটা ঘুরলেও তাঁদের গরুগুলো সময় চেনে না, ফলে ভোরের কাজ করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে। শেষ পর্যন্ত ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারিতে জর্জরিত নিক্সন পদত্যাগ করার কয়েক সপ্তাহ পরেই তাঁর উত্তরসূরি জেরাল্ড ফোর্ড এই ‘অন্ধকার’ আইন বাতিল করতে বাধ্য হন।

বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রভাব

১৯৭৩ সালের সেই সংকট কেবল তেলের দাম বাড়ায়নি, বরং বিশ্বকে জ্বালানি দক্ষতার গুরুত্ব শিখিয়েছিল। সেই সংকট থেকেই পশ্চিমে বড় ও তেলখেকো গাড়ির বদলে ছোট ও সাশ্রয়ী গাড়ির জনপ্রিয়তা শুরু হয়। ইউরোপ ও আমেরিকা তেলের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে বিকল্প বাজারের সন্ধান শুরু করে।

আজকের বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যখন এলপিজি বা বিদ্যুৎ সংকট ও সিন্ডিকেটের কারসাজি নিয়ে আলোচনা হয়, তখন ১৯৭৩-এর ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—জ্বালানি নিরাপত্তা কেবল অর্থনীতি নয়, এটি একটি জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। নিক্সনের সেই ‘অন্ধকার শীতকাল’ প্রমাণ করেছিল, সংকটে উদ্ভাবনী সমাধান প্রয়োজন ঠিকই, কিন্তু তা যেন জনজীবনের স্বস্তিকে কেড়ে না নেয়।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

তারেক রহমানের অনুরোধে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালেন হাসনা মওদুদ

‘চাইলে বাংলাদেশে ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পের আচরণ অনুসরণ করুন, কিন্তু খেলোয়াড় কেন বলির পাঁঠা’

ঢাকায় স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকে গুলি করে হত্যা

রুশ পতাকাবাহী ট্যাংকারটি ধরেই ফেলল মার্কিন বাহিনী, আটলান্টিকে টানটান উত্তেজনা

ঘুষের লাখ টাকাসহ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আটক

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত